যে বর্তমান আজও অতীতে সমাপতিত—তাই এবারের থিম

কলকাতার সবচাইতে পুরোনো বারোয়ারি পুজোয় একাল থেকে সেকালে যাত্রা

শ্যামপুকুর, উত্তর কলকাতার এই গলিতে ঢুকলেই পুরনো কলকাতার ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। পুরোনো বাড়ি, বেশিরভাগই দ্বিতল, চলটা ওঠা বড়ো বড়ো জানালা, তার সবুজ খড়খড়ি পাল্লা, কোথাও উঁচু রাস্তা, জানালা এসে রাস্তায় মিশেছে। বাড়ির সামনের দালান, রক পার হয়ে যখন ঠাকুর দালানে পৌঁছাই, সেই বেদি, যেখানে ১০৮ বছর আগে দুর্গাপূজার সূচনা করেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা। আমি নস্টালজিক হয়ে পড়ি। গলিতে ঢোকার পর বেদি পর্যন্ত যেতে যেতে আমার মনে হয়, সেই সময়ে পৌঁছে গেছি– যেখানে একচালার সেই প্রতিমা আজও একইভাবে বিরাজমান।

এবারের মণ্ডপে চাকার ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ

শ্যামপুকুর আদি সর্বজনীনের মণ্ডপ-তৈরির দায়িত্ব পাওয়ার পর ঠিক এই ঘোরটাই ঘিরে ধরেছিল আমাকে। কলকাতার সবচাইতে পুরোনো বারোয়ারি পুজো এটা। কত ইতিহাস একে ঘিরে। থিমপুজোর আবহেও নিজেদের ঐতিহ্যকে হারিয়ে যেতে দেননি উদ্যোক্তারা। বাইরের মণ্ডপ যেমনই হোক না কেন, এখানে প্রতিমা আজও সাবেকি। এখনও প্রতিমার গায়ের রং শিউলি ফুলের বোঁটার মতো। প্রতিমা ও বেদির উচ্চতার মাপজোখও এক রয়েছে সেই শুরু থেকেই। মূল বেদির উচ্চতা সাড়ে পাঁচ হাত। পুজো হয় বৈষ্ণব মতে। এই পুজোর প্রতিমার কাছে এসে দাঁড়ালেই যেন মনে হয়, সেই চলে যাওয়াটা সময়টা এখনও আছে চারপাশেই কোথাও একটা। আসলে যায়নি। আসলে একই কালখণ্ডের ভিতরেই বাস করছে অতীতের রেশ। এমন একটা পুজোয় মণ্ডপ-সজ্জার দায়িত্ব আসলে তাই গুরুভার। ঐতিহ্যকে, আমাদের প্রাচীনকে সম্মান জানানোর সুযোগও বটে। ফলে, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই মাথায় ঘুরছিল সেই চলে যাওয়া কালের কথা। সেখান থেকেই ভাবনায় আসে এবারের থিম—‘একাল থেকে সেকাল’।

ইন্সটলেশনের মধ্যে রয়েছে বোতলের ব্যবহারও

বর্তমান সময় পেরিয়ে এই যে সেই সময়ে পৌঁছে যাওয়া, সময়ের এই মেলবন্ধন– এটাই আমি এবারের পুজোমন্ডপ-সজ্জায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনে, জীবনবোধে সবেতেই পরিবর্তন এসেছে। সময়ের এই গতি, তার চলার ছন্দ– সবই আমার শিল্পসৃষ্টির অনুপ্রেরণা। আমাদের ঐতিহ্য, পরম্পরায় আমাদের বারে বারে ফিরে যেতেই হয়।

সরসী দাস রায়

এবারের মণ্ডপসজ্জায় তাই নানা সময়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে চাকা। সময় তো আসলে চাকারই মতো। মণ্ডপে ঢোকার মুখে দর্শনার্থীরা থাকবেন তাঁদের বর্তমানে। সেখানে বাইকের টায়ার বর্তমানেরই ইঙ্গিতবাহী। ক্রমে তাঁরা যত এগোবেন প্রতিমার দিকে ততই আসলে পিছোতে থাকবে সময়। চারপাশে তখন সেই সময়ের প্রতিনিধি হয়ে জড়ো হবে হাতে টানা রিক্সার চাকা, গরুর গাড়ির চাকা কিংবা পালকি। এইভাবে ক্রমশ সময়টা পিছোতে পিছোতে এসে থামবে প্রতিমার সামনে। যেখানে সবটাই এখনও সাবেকি, আগেরই মতো। বর্তমান যেখানে অতীতে সমাপতিত।

এই মণ্ডপ-সজ্জার মূল ভিত্তি ইন্সটলেশন। বিমূর্ত নানা মডেল, সমস্ত মডেলই মূলত নারী-শরীরের, ব্যবহৃত হচ্ছে মণ্ডপ জুড়ে। সেইসব মডেলদের পোশাক তৈরি হয়েছে বাতিল দুধের প্যাকেট ও অন্যান্য নানা প্যাকেট কেটে-কেটে। সমগ্র মণ্ডপসজ্জাতেই আমি এখনকার ব্যবহার্য এবং পরিতক্ত নানা উপকরণকে অন্য আঙ্গিকে ব্যবহার করেছি। এছাড়াও, দেওয়াল থেকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বোতল। সেই বোতলেই রয়েছে গাছ। ব্যবহৃত হয়েছে বাতিল টায়ার। সবটাই ইন্সটলেশনের স্বার্থে মিলে-মিশে-জড়িয়ে যাচ্ছে নিজেদের ভিতর।

চলছে মণ্ডপসজ্জার কাজ

সময়ের বদল ফুটিয়ে তুলতে সচেতনভাবে পরিকল্পনা হচ্ছে আলোর ব্যবহার নিয়েও। সময় যত পিছোচ্ছে ততই উজ্জ্বল রঙের জায়গা নিচ্ছে খানিক ডার্ক আলো। আর, প্রতিমার সামনে কেবল প্রদীপের আলো। এই আলোর বৈপরীত্যই আসলে নির্মাণ করছে সময়ের ব্যবধানকে। আর, সেটাই আমরা চাইছি।

এছাড়াও, থাকছে আলপনার ব্যবহার। রঙের নানা ভেরিয়েশন। ইন্সটলেশনের আরও খুঁটিনাটি। মণ্ডপ যত গড়ে ওঠে, ততই চোখ খুলতে থাকে শিল্পীরও। ফলে, শেষ মুহূর্তে যুক্তও হয় নানাকিছু। সেসব দেখতে-জানতে হলে তো সশরীরে আসতে হবে মণ্ডপেই।

আপাতত, বহমান কালকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে এভাবেই পিছিয়ে যেতে চাওয়া শিল্পের ভিতর দিয়ে। বিমূর্ত ইন্সটলেশন তারই মাধ্যম। বাকিটা কী দাঁড়ায়, দেখা যাক। 

Developed by DXDasia