তিনি চলে যাওয়ার পর ভারতীয় রাজনীতি সম্ভবত শেষ মোহিকানকে হারাল

১৯৬০-এর দশকে কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষকতা থেকে ২০১২ সালে ভারতের ১৩তম রাষ্ট্রপতির পদে শপথ গ্রহণ – এই দীর্ঘ যাত্রা কিন্তু মোটেও সাধারণ নয়। এরই মধ্যে তিনি সামলেছেন কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ (যখন তিনি মাত্র ৪৭), বাণিজ্য, বিদেশ, প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত আমৃত্যু ইন্দিরা গান্ধির বিপদে আপদে প্রধান সহায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে তিনি একজন ‘না হওয়া প্রধানমন্ত্রী’, তাঁর বন্ধু জ্যোতি বসুর মতোই। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার থেকে মাত্র একটি কদম দূরে থাকা বাঙালি তিনি। 
    
প্রণব মুখোপাধ্যায় ছিলেন পিছন থেকে পরামর্শ দেওয়া অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। দল কখনই তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদে পাঠায়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর থেকে কোনোভাবেই কম ছিলেন কি? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে ‘ফাদার ফিগার’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এক দক্ষ কৌশলনির্মাতা। গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে অন্য প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করেছেন, যদিও নিজের গণভিত্তি সেইভাবে ছিল না। প্রভাবে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রায় সমকক্ষ, কিন্তু ২০০৪ সাল পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে জেতেননি। ‘প্রণব বাবু’-র কেরিয়ার এরকমই বৈপরীত্যে ভরা, যেটাকে তিনি নিপুণভাবে সহজ করে নিয়েছেন। 

বিপরীত মতাদর্শের আশ্চর্য সংগতিবিধানের এই যে কেরামতি, তা অবশ্যই শিক্ষণীয়। ভারতীয় রাজনীতির প্রধান ধারার ঘোলা জলে তিনি যেভাবে নিজের স্বচ্ছতা বজায় রেখেছেন, সেটিরও উল্লেখ করা দরকার। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় হাজির থাকার রহস্যময় ক্ষমতা ছিল তাঁর। 

তাঁর এই উজ্জ্বল কেরিয়ারেও বাধা এসেছিল কালের নিয়মে। ইন্দিরা গান্ধি নিহত হওয়ার কয়েক মাস পরই রাজীব গান্ধির সঙ্গে তাঁর মনোমালিন্য দেখা যায়। জনসমক্ষে কিছু বলা না হলেও কংগ্রেসের ভিতরে লক্ষ্য করা গিয়েছিল, ইন্দিরার চেয়ারটি পাওয়ার আশায় প্রণব কতটা ব্যাগ্র ছিলেন। তখন অর্থ মন্ত্রীর পাশাপাশি রাজ্যসভায় কংগ্রেসের নেতাও ছিলেন তিনি। বেশিরভাগ ভারতীয় তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদে দেখতে চেয়েছিলেন। 

সে সব বর্ষীয়ান নেতা রাজীব গান্ধির প্রধানমন্ত্রীত্বের বিরোধী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রণব অন্যতম। রাজীব প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রণব মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনে অনিশ্চয়তা ঘনিয়ে আসে। তিনি ছিলেন ক্যাবিনেটের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, বিশ্বের সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় অর্থমন্ত্রীদের অন্যতম। সেখান থেকে পাঠানো হল পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি পরিচালনা করতে। 

প্রণব বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে চলেছেন। ১৯৮৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে এক নতুন পার্টি তৈরি করলেন তিনি – রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস। ১৯৮৭ সালে নিজের বিধানসভা নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঝুঁকি নিলেন। সহায় ছিল দীর্ঘদিনের ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে খ্যাতি। রাজনৈতিক কেরিয়ারের শুরুতে ১৯৬৯ সালে তাঁর কঠোর পরিশ্রমে মেদিনীপুর উপনির্বাচনে জয়ী হন নির্দল প্রার্থী ভিকে কৃষ্ণ মেনন। তখনই ইন্দিরা গান্ধির নজর প্রণবের ওপর পরে। কিছুদিন পরে ইন্দিরাই তাঁকে কংগ্রেসে নিয়ে আসেন। 

কিন্তু ১৯৮৭ সালে খুব বড়ো বিপর্যয় ঘটে। এক সময়ে ক্ষমতার উচ্চসীমায় থাকা প্রণবকে কঠোর বাস্তবের সম্মুখীন হতে হয়। নির্বাচনে আরএসসি-র ভরাডুবি হয় গণভিত্তির অভাবে। প্রাদেশিক রাজনীতিতেও তাঁর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়। অবশেষে রাজীব গান্ধির সঙ্গে সমঝোতা করে ১৯৮৯ সালে ফিরে যান কংগ্রেসে। তার প্রায় ১৫ বছর পর ২০০৪ সালে প্রথমবার লোকসভা আসনে জয়ী হলেন, পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গীপুর থেকে। সেই পদে ছিলেন ২০০৯ পর্যন্ত। 

তবে ১৯৯১তে রাজীব নিহত হওয়া পর্যন্ত প্রণব পুরোনো অবস্থানে ফিরে যেতে পারেননি। সেটা পিভি নরসিমহা রাওয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বে সম্ভব হল। ইন্দিরা গান্ধির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তিনজন অনুগতের মধ্যে নরসিমহাও ছিলেন। বাকি দু’জন প্রণব এবং আরেক প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আর ভেঙ্কটরমন। 

১৯৯১ সালে প্রণবকে নিয়োগ করা হয় প্ল্যানিং কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে। ১৯৯৫ সালে আবার তিনি ক্যাবিনেটে ফিরে যান, বিদেশ মন্ত্রী হয়ে। ২০০৫-২০০৯ সালেও মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বে তিনি এই পদে ছিলেন। ১৯৮২ সালে তিনিই অর্থমন্ত্রী হিসেবে মনমোহনকে রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ করেছিলেন। 

মনমোহন সিংয়ের আমলেই প্রণবের রাজনৈতিক কেরিয়ারের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকগুলি তিনি সামলেছেন – প্রতিরক্ষা (২০০৪-০৬), বিদেশ (২০০৬-০৯) এবং অর্থ (২০০৯-১২)। দায়িত্ব পালন করেছেন লোকসভার নেতা হিসেবেও।

প্রবীণ এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ প্রণবই ছিলেন ১৯৯৮ সালে সোনিয়া গান্ধিকে কংগ্রেস সভানেত্রী বানানোর মূল কাণ্ডারী। প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতি বানানোর কথা উঠেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি। কারণ ক্যাবিনেটে তিনি ছিলেন অপরিহার্য।

তিনি চলে যাওয়ার পর ভারতীয় রাজনীতি সম্ভবত শেষ মোহিকানকে হারাল। স্বল্প দৈর্ঘ্যের মানুষটির প্রভাব ছিল পর্বতের মতো বিশাল। জীবনের গোধূলিবেলায় সর্বদা তাঁর মন পরে থাকত ঝাঁ-চকচকে রাজনীতি-যন্ত্রের দিকে, যেখানে তাঁর বেশিরভাগ কর্মজীবন অতিবাহিত হয়েছিল। তাঁর মস্তিষ্ক ছিল গণকযন্ত্রের মতো। স্মৃতিশক্তি ছিল প্রবাদপ্রতীম। যে কোনো সংকট থেকে দলকে উদ্ধার করার সামর্থ্য ছিল তাঁর। এখনও কংগ্রেসের অনেকেই বিশ্বাস করেন, সর্বদাই তিনি ছিলেন মুশকিল আসান। 

ভবিষ্যৎ কীভাবে তাঁকে মনে রাখবে? একজন ভারতরত্ন অথবা পদ্মবিভূষণ হিসেবে নয়। বাংলার এক ছোটো গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে ভারতের সাংবিধানিক প্রধান হওয়ার জন্যও নয়। সবার মনে ‘প্রণববাবু’ থেকে যাবেন দলীয় পরিচয় ছাড়িয়ে তাঁর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার কারণে – এমনকী জীবনের শেষ লগ্নে্ এই ভয়াবহ অসহিষ্ণু সময়েও। শেষ বিশ্লেষণে বলায় যায়, গ্রহণযোগ্যতা দিয়েই গড়া ছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। 
 

Developed by DXDasia