বোমারু বিমানের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে কালো রং করা হয়েছিল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে

আজ যেখানে ভিক্টোরিয়া অবস্থিত, সেই জায়গারও এক আশ্চর্য ইতিহাস আছে

“তিন শতকের শহর
তিন শতকের ধাঁধা,
সুতানুটির পাড়ে নেমে
এল সাহেবজাদা…”

আজ ২৪ আগস্ট। আজ থেকে ৩৩০ বছর আগে, ১৬৯০ সালে ঠিক এই তারিখেই শেষবারের জন্য সুতানুটিতে আসেন জোব চার্নক। আর ‘সাহেবজাদা’র এই ভূখণ্ডে পদার্পণের দিনকে মনে রেখেই বহুদিন ধরে তারিখটিকে কলকাতার জন্মদিন হিসাবে পালন করা হয়ে আসছে। তবে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট এক বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে এবং তাঁদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে ২০০৩ সালে মামলার রায় জানানো হয় যে, কলকাতার কোনো নির্দিষ্ট জন্মদিন নেই ও চার্নক মোটেই কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা নন। অথচ এরপরেও বিতর্ক থামেনি, সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনও এই দিনটায় কলকাতার জন্মদিন বিষয়ক নানা পোস্ট দেখাই যায়। তবে আদৌ এদিন কলকাতার জন্মদিন কিনা সেই বৃথা তর্কে সময় নষ্ট না করে আমরা বরং চোখ রাখব আমাদের খুব চেনা এই শহরের অজানা এক গল্পে।

‘কলকাতা’, এই শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখের সামনে যে ছবিগুলো ভেসে ওঠে, তাদের মধ্যে একদম প্রথম দিকেই আছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ময়দানের দক্ষিন প্রান্তে প্রায় ৬৪ একর জায়গা জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রানি ভিক্টোরিয়ার স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত বিশালাকার এই সৌধ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তখন চলছে পুরোদমে, জানুয়ারি ১৯০১-এ প্রয়াত হলেন সম্রাজ্ঞী ভিক্টোরিয়া। রানির স্মৃতি রক্ষার্থে ইংরেজ সরকার ঠিক করলো ভারতের বিভিন্ন শহরে ছোটো-ছোটো ভিক্টোরিয়া মেমেরিয়াল তৈরি করা হবে। তবে আপত্তি তুললেন গভর্নর-জেনারেল লর্ড কার্জন। ইংরেজদের কাছে ‘লিটল্‌ লন্ডন’ নামে পরিচিত, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী খোদ কলকাতায় কিনা রানির জন্য হবে ছোটো মেমোরিয়াল! কার্জন স্পষ্ট বলে দিলেন স্মারক হওয়া চাই সারা পৃথিবীর মানুষকে তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো, অন্যদিকে মুঘল স্থাপত্য তাজমহলকে টেক্কা দেওয়ার পরিকল্পনাও যে তাঁর ছিল একথাও অনুমান করাই যায়। তিনি আরও বলেন মেমোরিয়ালের নকশা হবে ধ্রুপদী বা রেনেসাঁ স্থাপত্য শৈলীর অনুসারী, এবং পুরোটাই হবে মার্বেলের, মার্বেল আনতে হবে মাকরানা থেকে, যে মাকরানা থেকে তাজমহলের মার্বেল সংগৃহীত হয়েছিল।

আমরা অনেকেই জানি, ভবনের নকশা এবং পরিকল্পনা করেন রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস্‌-এর প্রেসিডেন্ট স্যার উইলিয়াম এমারসন এবং মূল আর্কিটেক্ট হিসাবে এর নির্মাণকাজ তত্ত্বাবধান করেন ভিনসেন্ট জে এশ, যিনি ইতিমধ্যেই বেঙ্গল ক্লাব, গার্ডেনরিচে দক্ষিণ-পূর্ব রেলের সদর দফতর, ইত্যাদি তৈরি করে সরকারের যথেষ্ট আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। তবে সমস্ত ভাবনাকে বাস্তব রূপদানের কাজটা করে একটি আমাদের কলকাতারই সংস্থা মার্টিন অ্যান্ড কোং। স্যার টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিনের সঙ্গে শেয়ারে সংস্থাটি গড়ে তোলেন বাঙালি উদ্যোগপতি ও ইঞ্জিনিয়ার স্যার রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। মার্টিন সাহেব চেয়েছিলেন কোম্পানির নাম হোক ‘মার্টিন অ্যান্ড মুখার্জি’, তবে কোনো ভারতীয়র নাম থাকলে টেন্ডার পাওয়া সহজ হবে না বলে রাজেন্দ্রনাথ-ই নিজের নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তবে প্রথমে মার্টিন অ্যান্ড কোং-কে শুধুমাত্র মেমোরিয়ালের ভিত তৈরির বরাতই দেওয়া হয়েছিল, পরে তাদের কাজে খুশি হয়ে সরকার বাহাদুর সম্পূর্ণ ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গড়ার দায়িত্বই তাদের দেন। আসামান্য এই স্থাপত্যকীর্তির জন্য স্যার রাজেন নাইট উপাধিতেও ভূষিত হন। আজকের ডালহৌসি স্কোয়্যারের আর. এন. মুখার্জি রোড এই কৃতী বঙ্গসন্তানের নামেই।

আবার একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক, স্মৃতিসৌধ তৈরির পরিকল্পনা তো কার্জন করলেন, কিন্তু বানাতে যে বিপুল অর্থ খরচ হবে তা আসবে কোথা থেকে! এ সমস্যার সমাধানের জন্যও ব্রিটিশরা হাত পাতলেন ভারতীয়দের কাছে। আর দেশীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজন্যবর্গ ও জমিদাররা ইংরেজদের চোখে স্নেহভাজন হয়ে ওঠার লোভে সাধারণ জনগণের থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ শোষণ করে স্বেচ্ছায় দান করলেন ভবন নির্মাণের কাজে। সংগৃহীত অর্থের সাহায্যে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তৈরি হতে প্রায় ষোলো বছর সময় লাগে এবং সমগ্র স্থাপত্যটি গড়ে তুলতে মোট ১,০৫,০০,০০০ টাকা খরচ হয়। অবশেষে ১৯২১ সালের ২৮ ডিসেম্বর এটি জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, ওই রকম একটি সময়ে যখন পরাধীন ভারতে অসংখ্য মানুষ না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছেন, তখন মৃত রানির স্মৃতির উদ্দেশ্যে ভবন নির্মাণে দেশীয় রাজাদের এই উদারতা কতখানি সঙ্গত ছিল। তবে আজকের ভারতেও যেখানে সাধারণ মানুষের প্রাথমিক সুবিধার কথা না ভেবে রাজনৈতিক দলগুলি সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই রেওয়াজ অব্যাহত রাখে, সেখানে এই প্রশ্ন নিতান্তই তুচ্ছ।

১৮৫২ সালের কলকাতার মানচিত্র (চিহ্নিত অংশে পুরানো প্রেসিডেন্সি জেল)

এ তো গেল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গড়ে ওঠার কাহিনি, তবে আজ যেখানে ভিক্টোরিয়া অবস্থিত সেই জায়গারও, এক অদ্ভুত ইতিহাস আছে। এখন তো জায়গাটার নাম ময়দান, কিন্তু একসময় এই জায়গার নাম ছিল ‘হরিণবাড়ি’। এবার কেন ‘হরিণবাড়ি’ নামকরণ তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও অনেকে মনে করেন এখানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার একটি শিকারের মাচা (hunting box) ছিল; আবার অনেকে বলেন এখানে জীবজন্তুদের চিড়িয়াখানার মত কিছু ছিল। এবিষয়ে নানা মত থাকলেও একদম স্পষ্টভাবে যা জানা যায় তা হল, এখনকার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের জায়গায় আগে ছিল বিশাল বড়ো একটি জেলখানা। ১৭৬৭ সালে কলকাতায় মোট দুটি জেল আমরা দেখতে পাই, প্রথমটি ছিল লালবাজারে এবং দ্বিতীয়টি ছিল বড়োবাজারে। ১৭৭৮ সালে নিউ প্রেসিডেন্সি জেল তৈরি করা হয়, ঠিক সেই জায়গায় যেখানে এখন মেমোরিয়াল দাঁড়িয়ে। এই জেলে থাকা বন্দিদের মধ্যে অন্যতম হলেন ভারতের প্রথম সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’-এর সম্পাদক জেমস অগাস্টাস হিকি। ব্রিটিশদের দুর্নীতির কথা তাঁর সংবাদপত্রে প্রকাশ করলে হেস্টিংসের কোপের মুখে পড়ে জেলবন্দি হতে হয় তাঁকে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের পরিকল্পনা হওয়ার সময় এই জেলটিকে ভেঙে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আলিপুরে, বর্তমানে যেখানে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগার রয়েছে।

আর ভিক্টোরিয়ার ব্যাপারে বলতে গিয়ে যে অধ্যায়ের কথা না বললেই নয় তা হল – ‘ব্ল্যাক ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল’। সেপ্টেম্বর ১৯৩৯, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, বেতার ভাষণের মধ্যে দিয়ে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন তাদের যুদ্ধে যোগদানের কথা। একদিকে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স; তাদের বিপক্ষে জার্মানি, জাপান, ইতালি। ১৯৪১-এ পার্ল হারবার আক্রমণ করেছে জাপান, এরপর তাদের টার্গেট ‘সেকেন্ড সিটি অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’, আমাদের কলকাতা। হাওড়া ব্রিজ, খিদিরপুর ডক সহ একাধিক জনবহুল এলাকায় বোমা ফেলার কথা ভাবে জাপানিরা। মানিকতলা বাজার, ডানলপ ফ্যাক্টরির মত জায়গায় তারা বোমা ফেলেও (তবে মানিকতলার বোমাটা ফাটেনি, সেটি এখন কলকাতা পুলিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত)। ছোটবেলায় শোনা ‘সা রে গা মা পা ধা নি, বোম ফেলেছে জাপানি’ ছড়ার জন্ম কোথা থেকে বোঝা যাচ্ছে তো! এদিকে তাদের সাধের ‘ক্যালকাটা’-কে বাঁচাতে ব্রিটিশরাও নানা উপায় বার করে – সন্ধের পরে একদম ব্ল্যাকআউট, বাড়ির আলো বন্ধ, রাস্তার আলো বন্ধ, গাড়ি নিয়ে বেরোলে হেডলাইটে অর্ধেক কালো রঙ করে রাখা, এককথায় যাতে আকাশে ঘুরতে থাকা জাপানি বোমারু বিমান থেকে নিচে কী আছে বুঝতে না পারা যায়।

তবে এরমধ্যে দেখা দিল একটা বড়ো সমস্যা, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। উজ্জ্বল সাদা মার্বেলে তৈরি এত বড়ো একটা স্থাপত্য, তাও আবার ময়দানের মতো বিশাল ফাঁকা মাঠের মাঝখানে। এ তো অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারেও দেখা যাবে, এখন কি করা যায়! ব্রিটিশরা ঠিক করল, কোনোভাবে গোটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে কালো রঙে ঢেকে দিতে হবে। যেমন ভাবা তেমনি কাজ, আপাদমস্তক কালো রং করে দেওয়া হল কলকাতা শহরের সবচেয়ে বড়ো আইকনে এবং এর সাথেই ভিক্টোরিয়া-সহ গোটা শহর জুড়ে লাগিয়ে দেওয়া হল ‘ফটোগ্রাফি প্রহিবিটেড’ লেখা বোর্ড। যাতে ব্রিটিশদের এই গোপন পরিকল্পনার কথা গুপ্তচরের মাধ্যমে কোনোভাবেই জাপানিরা জানতে না পারে। এই হল ‘ব্ল্যাক ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল’-এর কাহিনি, যা ১৯৪৩ সাল নাগাদ অল্প কিছু মাসের জন্য হলেও আমাদের এই শহরেই ছিল। তবে ছবি তোলা নিষেধ থাকায় সেই সময়ের কোনো প্রামান্য ছবি পাওয়া যায়না, শুধু তখনকার শহরবাসীর স্মৃতিতে আর দুই মলাটের মাঝের কিছু পাতায় ধরা আছে ফেলে আসা এইসব দিনের কথা। শোনা যায় শাহজাহানও একটি কালো তাজমহল বানানোর কথা ভেবেছিলেন, তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদই একে গুজব বলে উড়িয়ে দেন। আমাদের কলকাতায় কিন্তু ব্ল্যাক ভিক্টোরিয়া সত্যিই ছিল, তাই এই শহরের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা ‘আরেকটা কলকাতা’কে খুঁজে দেখার সময় হয়তো আজ এসে গিয়েছে।

তথ্যঋণ : 
The Concrete Paparazzi – Deepanjan Ghosh
Stones of Empire – Jan Morris
British Sculpture and the Company Raj – Barbara Groseclose

ছবিসূত্র : 
ব্ল্যাক ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল – http://oldcalcutta.blogspot.com/
পুরোনো কলকাতার ম্যাপ – ব্রিটিশ লাইব্রেরি

কৃতজ্ঞতা – কবীর সুমন

Post Tags
Developed by DXDasia