থিয়েটারের মাধ্যমে জেলবন্দিদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনছেন প্রদীপ ভট্টাচার্য

তিনি এই রাজ্যের অন্য ধারার থিয়েটারের এক অন্যতম প্রাণপুরুষ

প্রদীপ ভট্টাচার্য আজ আর শুধু বহরমপুর রেপার্টরির  নন তিনি এই রাজ্যের অন্য ধারার থিয়েটারের  এক অন্যতম প্রাণপুরুষ।  রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ গত প্রায় দু’দশক ধরে নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। সরকারি কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও নাটকই তাঁর জীবনের আনন্দের অন্যতম উৎস। 

নাট্যচর্চার ক্ষেত্রে তিনি যে কোনও চ্যালেঞ্জকে বরাবর গ্রহণ করে এসেছেন। তাই কারা দপ্তর থেকে যখন তাঁর কাছে প্রস্তাব আসে জেলের কয়েদিদের নিয়ে নাটক মঞ্চস্থ করাবার, তিনি তা গ্রহণ করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। কেননা কাজটা ছিল আলাদা এবং খুব এক্সপেরিমেন্টাল। আর প্রদীপের নাটকের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় উৎসাহ ছিল আকৈশোর। ফলে এ সুযোগ তিনি হাতছাড়া করেননি। আর আজ এই এক্সপেরিমেন্টাল কাজই তাঁকে অন্যধারার নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে।

জেলের বন্দিদের জন্যে তিনি নাটক নির্বাচন করতে যথারীতি রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হন। বেছে নেওয়া হয় ‘তাসের দেশ’ নাটকটিকে। শুরু হয় মহড়া। তালিম নিতে থাকে সমাজের মূল স্রোতের বাইরের ‘আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত এমন কিছু মানুষ যাঁরা প্রত্যেকেই কোনও না কোনও ভাবে অপরাধ জগতের সঙ্গে যুক্ত। ২০০৬ সালের ২৬ নভেম্বর মঞ্চস্থ হয় ‘তাসের দেশ’। জেলের মধ্যে। প্রথমবার। খোলা আকাশের নিচে। জেলের নিয়মানুযায়ী বন্দিদের সাধারণত সন্ধ্যার পরপরই গারদের আড়ালে চলে যেতে হয়। সেইবারই প্রথম বহরমপুর জেলে নিয়মের ব্যাত্যয় ঘটে। 
সেই হেমন্তের সন্ধ্যায় যে নাট্যযাত্রার শুরু হয়, তার রথের চাকা এগিয়েছে বহুদূর। ঠিক পরের বছরই অর্থাৎ, ২০০৭ সালের মে মাসে দলটি কলকাতায় আসে। ১৭ মে রবীন্দ্রসদনে মঞ্চস্থ করা হয় ‘তাসের দেশ’। জেলের চৌহদ্দির বাইরে এসে এটা ছিল বন্দিদের প্রথম পারফরম্যান্স। এখান থেকেই উড়তে শুরু করে স্বীকৃতির নিশান। মিডিয়া তো বটেই, সমাজের প্রায় সমস্ত মহল থেকে আসতে থাকে সাধুবাদ। স্তুতি ও শুভেছা। নাম হয় প্রোডাকশনটির ।

নাট্যাচার্য হিসাবে প্রদীপ ভট্টাচার্যের সুনাম পৌঁছে যায় সুদূর রাজধানীতেও। ডাক আসে দিল্লি থেকে। ২৬ জন কয়েদিকে নিয়ে দিল্লি যান তিনি। এদের মধ্যে নারী এবং পুরুষ উভয়েই ছিলেন। দীর্ঘ এই রেল সফরে কিন্তু এঁদের সঙ্গে তেমন ভাবে কোনও কারারক্ষী ছিলেন না। কেবল জনাকয়েক রেলের অফিসার ছিলেন। দিল্লিতে তিনটি শো করেন এঁরা। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রথম শো’টি উদ্বোধন করেন। কারাবন্দিদের করা এই নাটক দেশের সাংস্কৃতিক মহলে হইচই ফেলে দেয়। এরপর ‘রক্তকরবী’র মহড়া শুরু হয়েও নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়। আসে ‘তোতাকাহিনি’। বেশ কয়েকবার মঞ্চে ‘তোতাকাহিনি’ অভিনীত হওয়ার পর আবার ফিরিয়ে আনা হয় ‘রক্তকরবী’কে, ‘যক্ষপুরী’ নাম দিয়ে। গুণীমহলের প্রশংসা লাভ করে এই নাটকও। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে নাটকের সঙ্গে যুক্ত যে সব বন্দি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, তাঁরা কিন্তু কেউই আর অপরাধ জগতে ফিরে যাননি । সমাজের মূল স্রোতে মিশে জীবনযাপন করছেন । পরিচালক প্রদীপ ভট্টাচার্যের কথায় এইটাই তাঁর আসল  সাফল্য। তাই তিনি দল নিয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছেন রাজ্যের নানা জায়গায় এবং দেশের অন্যত্র। এই মুহূর্তে রাজ্যের এমন কোনও জেলা পাওয়া ভার, যেখানে এঁদের নাটক মঞ্চস্থ হয়নি। প্রদীপের মতো মানুষ আছেন বলে আবার প্রমাণিত হল যে, শিল্পই সেই শুদ্ধতা, যার স্পর্শে মানব অন্তরের অন্ধকারতম কোণও আলোকিত হয়ে ওঠে ।

Developed by DXDasia