
‘প্রোটোটাইপ’ বা গতানুগতিক ছাঁচের সিনেমা প্রদর্শিত হওয়ার জায়গা ‘পকেটমানি ফিল্মস’ নয়
২০২০-তে আমরা অনেক কিছুরই সাক্ষী থেকেছি। দেখেছি, কীভাবে ইঁদুর দৌড়ের পৃথিবী এক লহমায় থমকে গিয়েছিল ‘COVID-19’-এর প্রকোপে। আকস্মিক এবং ঐতিহাসিক গৃহবন্দি অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল একবিংশ শতাব্দি। আমরা দেখেছি, ভাইরাস আর সামাজিক দুরত্বের এই নব্য সভ্যতায় গৃহবন্দি হয়ে, খাওয়া-ঘুম-অফিসের কাজ-বাড়ির কাজ বাদে বাড়িতে বসে কম-বেশি সকলে একটু বেশিই ‘ভার্চুয়ালি সোশাল’ হয়ে উঠেছিলেন। সকলেই নিজেদের মতো করে বিনোদন খুঁজে নিচ্ছিলেন ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, টেলিগ্রাম –এগুলির মতো বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম থেকে। লকডাউনের প্রাক্কালে যাঁরা ইন্টারনেট বা সোশাল মিডিয়া ভালো কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ‘পকেটমানি ফিল্মস’(Pocketmoney Films)-এর উদ্যোক্তারা। কী করেছিলেন তাঁরা?
‘পকেটমানি ফিল্মস’ মূলত একটি ওয়েবসাইট, নামেই বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি সিনেমা সম্পর্কিত। সিনেমা তো এখন হাজারটা ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্ম’-এ দেখানো হয়, ‘পকেটমানি ফিল্মস’ নিয়ে আলাদা করে আলোচনা করার কী প্রয়োজন? ‘প্রোটোটাইপ’ বা গতানুগতিক ছাঁচের সিনেমা প্রদর্শিত হওয়ার জায়গা ‘পকেটমানি ফিল্মস’ নয়। ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ বা স্বতন্ত্র সিনেমা বানাচ্ছেন যাঁরা, কম পুঁজিতে বা কোনও পুঁজি ছাড়াই ভালো কাজ করছেন, তাঁদেরকে একটা ‘অনলাইন প্ল্যাটফর্ম’ দেওয়ার চেষ্টা করছে ‘পকেটমানি ফিল্মস’ এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে(এখনও পর্যন্ত)। এইমুহূর্তে যাঁরা অল্প টাকায় ছবি বানাচ্ছেন এবং আগে যাঁরা এইধরনের কাজ করেছেন, মূলত সেইসব কাজগুলোই ‘শোকেস’ করার চেষ্টা করে চলেছে ‘পকেটমানি ফিল্মস’। সময় গড়িয়ে একবছর হতে চললো এর বয়স। শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত অভিজ্ঞতা কেমন? সাক্ষাৎকারে ‘পকেটমানি ফিল্মস’-এর মূল উদ্যোক্তা ঋতম চক্রবর্তী।

‘পকেটমানি ফিল্মস’ নামটা মাথায় এলো কীভাবে?
‘পকেটমানি’ যা সাধারণভাবে আমরা ‘হাত খরচ’ বলেই জানি, অর্থাৎ অল্প টাকার গল্প। মূলত এই ভাবনাটাই কাজ করেছিলো।
উদ্যোগটা মূলত কার বা কাদের?
আমি আর আমার এক বন্ধু আকাশদীপ মুখোপাধ্যায়, মূলত আমরা দু’জন মিলেই বিষয়টা শুরু করি। ‘টেকনিক্যাল’ আর ‘ফিনান্স’, খুব গুরুত্বপূর্ণ দু’টো বিষয় দেখাশোনা করে আকাশদীপ। ‘পকেটমানি ফিল্মস’ চালানোর জন্য যা খরচ হয়, পুরোটাই ও ব্যয় করে। ভালো সিনেমার প্রতি ভালোবাসা থেকেই আমাদের এই উদ্যোগ।
এখনও পর্যন্ত ‘পকেটমানি ফিল্মস’-এ যা যা ছবি দেখানো হয়েছে সবটাই বিনামূল্যে। অন্যদিকে, স্বতন্ত্র সিনেমা নির্মাতাদের থেকে তোমরা কোনও অর্থ-সাহায্যও নিচ্ছ না। এক্ষেত্রে উপার্জনের বিষয়টা তোমরা কীভাবে দেখছো?
আমরা শুরু করেছিলাম ১ এপ্রিল, ২০২০ থেকে। লকডাউন চলাকালীন। কোভিড তো ছিলোই, তার উপর আমফানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা। সেইসময় তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ‘পকেটমানি ফিল্মস’-এ অর্থ সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলাম আমরা। যতটুকু সাড়া পেয়েছিলাম, সেটুকু দিয়েই ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছিলাম। এ ছাড়া এখনও পর্যন্ত ‘পকেটমানি ফিল্মস’-এর জন্য দর্শকদের কাছ থেকে কোনও অর্থ-সাহায্য আমরা চাইনি। আগামী এপ্রিল-এ একবছর পূর্ণ করতে চলেছে ‘পকেটমানি ফিল্মস’। এখনই সিদ্ধান্ত নিইনি, তবে এপ্রিল থেকে ‘প্রিমিয়াম’ চালু করার একটা পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের ‘প্রিমিয়াম’ ব্যবস্থাটা একটু আলাদা, এখানে মাসে মাসে ‘সাবস্ক্রিপশন’-এর ব্যাপার নেই, যাতে খুবই স্বল্প মূল্যে টিকিট কেটে সিনেমাগুলো দেখতে পারেন দর্শকরা, সেই ব্যবস্থাই নেওয়া হবে। এটুকু নাহলে, প্রতি মাসে খরচ চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হচ্ছে না। যে উদ্যোগ আমরা নিয়েছি, দর্শক-সাহায্য না পেলে তা একসময় বন্ধ করে দিতে আমরা বাধ্য হব। তা-ই ‘পকেটমানি ফিল্মস’ টিকিয়ে রাখতে এবং স্বতন্ত্র সিনেমা নির্মাতাদের অল্প হলেও কিছু অর্থ সাহায্য করার জন্য এই উদ্যোগ নিতে হচ্ছে আমাদের। তবে, এক্ষেত্রেও বিকল্প ভাবনা রয়েছে আমাদের। সব ছবিই যে টিকিট কেটে দেখতে হবে এমন নয়, নির্বাচিত কিছু কিছু ছবি বিনামূল্যে দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে।

(পকেটমানি ফিল্মস’-এর পাঠানো ত্রাণ)
এই যে তোমরা বিনামূল্যে সিনেমা দেখানোর জন্য একটা জায়গা দিচ্ছো, কীরকম সাড়া পাচ্ছো? মানে, ‘পকেটমানি ফিল্মস’ এখনও সে অর্থে লৌকিক হয়ে ওঠেনি, যেকারণে দর্শক সংখ্যাও সীমিত, এখানে সিনেমা দেখিয়ে রোজগার বা প্রচার পাওয়ার সম্ভাবনাও এইমুহূর্তে ক্ষীণ। যাঁরা সিনেমা দিচ্ছেন, কী ভেবে দিচ্ছেন? আর যাঁরা দিচ্ছেন না, তোমার মতে তার কারণ কী?
সিনেমার সঙ্গে লৌকিকতার সেরকম কোনও সম্বন্ধ নেই বলেই আমার ধারণা। সবাই সব সিনেমা দেখে না, এটা বাস্তব। সিনেমা অনেক ধরনের হয়, সবধরনের সিনেমা দেখানোর প্ল্যাটফর্ম ‘পকেটমানি ফিল্মস’ নয়। সেদিক দিয়ে ভেবে দেখলে, একটা স্পষ্ট ‘লিমিটেশন’ তো রয়েছেই। তা-ই টাকাপয়সা বা প্রচার আমরা হুট করে পেয়ে যাব, সেটা কখনোই সম্ভব নয়। অন্যদিকে, যাঁরা সিনেমাকে ব্যবসা এবং প্রচারসর্বস্ব ভাবেন, তাঁদের থেকে সিনেমা পাব, এ আশা আমরা করি না। এখনও পর্যন্ত, নতুন যাঁরা সিনেমা বানাচ্ছেন বা যাঁদের কাজ সেভাবে আগে কোথাও দেখানো হয়নি, মূলত তাঁদের ছবিই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে পেয়েছি আমরা। ‘পকেটমানি ফিল্মস’-এ যাঁরা সিনেমা দিয়েছেন, তাঁরা কেউ কেউ সিনেমার প্রতি নিখাত ভালোবাসা থেকে দিয়েছেন, কেউ কেউ খানিক অনিচ্ছা বশত ব্যক্তিগত পরিচিতি সূত্রে দিয়েছেন। তবে, হ্যাঁ, একবছরের এই সফরে বেশ কিছু মূল্যবান ‘সাড়া’ আমরা পেয়েছি, সিনেমা যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের ‘কদর’ পেয়েছি, যে কারণে একাধিক প্রতিকূলতা নিয়েই এগিয়ে চলার কথা ভাবতে পারছি আমরা।
১-এ পা দিতে চলেছে ‘পকেটমানি ফিল্মস’, নতুন কোনও পরিকল্পনা রয়েছে?
নতুন পরিকল্পনা বলতে, ‘অনলাইন’ এবং ‘অফলাইন’ দু’ভাবেই পকেটমানি ফিল্মস-এর তরফে ‘ফিল্ম-ফেস্টিভ্যাল’ বা ‘স্ক্রিনিং’-এর একটা ব্যবস্থা করা; বছরে একবার হলেও সেটা করতে চাইছি। এ ছাড়া ‘প্রিমিয়াম’ শুরু হলে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে একবার ‘রেট্রোস্পেক্টিভ’-এর ব্যবস্থা করতে চাই। মোটামুটি এইরকমই ভেবেছি আপাতত। সবটাই নির্ভর করছে দর্শকদের উপর। লকডাউনে যেভাবে সাড়া পেয়েছিলাম, এখন আর তেমন নেই। খুব বেশি প্রচারের মধ্যে না থাকাটাও এটার অন্যতম একটা কারণ বলে মনে হয়। যাই হোক, আমরা যে ভাবনা নিয়ে শুরু করেছিলাম, অর্থাৎ কম বাজেটে তৈরি স্বতন্ত্র, ভালো ছবি দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেব, সেই ভাবনায় আমরা বদ্ধপরিকর। সর্বোপরি, আমরা চাই, বড় বাজেটের ছবির আড়ালে অল্প বাজেটের ভালো কাজ হারিয়ে না যাক, এরকম আরও উদ্যোগ গড়ে উঠুক। ‘বাজেট’ নয়, সচেতনতা তৈরি হোক ভালো সিনেমা নিয়ে।
