
ধুপি, ম্যাগনোলিয়া, রডোড্রেনডনে ফুলে ঘেরা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম বাতাসি
বাতাসি – ধুপি, ম্যাগনোলিয়া, রডোড্রেনডনে ঘেরা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। দার্জিলিং জেলার মানেভঞ্জন থেকে পথ গিয়েছে বাতাসি হয়ে ধোতরে। দার্জিলিং বন বিভাগের অফিস থেকে অনুমতি পেলাম বাতাসি বন বাংলোতে তিন রাত কাটানোর। সময়টা মার্চ মাস-শীতের কনকনানি যথেষ্ট,সাথে আছে মার্চের হিমেল হাওয়া। কিন্তু তবুও এ সময়টা বেছে নিয়েছি,কারণ এ সময়টাই তো ফুলের সময়। দার্জিলিং শহরও নানা ফুলের সাজে সেজে বসে আছে,আর বাতাসির সিঙ্গালিলা জঙ্গলের না জানি কি রূপ হয়েছে।
নিউ-জলপাইগুড়ি থেকে সোনাদা, ঘুম হয়ে মানেভঞ্জন, সেখান থেকে ধোতরের পথে দশ কিলোমিটার আগে বাতাসি। নিউ-জলপাইগুড়ি থেকে গাড়ি নিয়ে নেওয়া যায়। মানেভঞ্জন অবধি শেয়ারের গাড়িতেও আসা যায়। আবার মানেভঞ্জন থেকে ধোতরের শেয়ার গাড়িতে বাতাসি যাওয়া যায়। দার্জিলিং থেকেও সরাসরি ধোতরের গাড়ি মেলে। বাতাসির বনবাংলোর বুকিং পাওয়া যায় দার্জিলিং-এর বড় কাকঝোরার বনবিভাগের অফিস থেকে। তবে যদি বিভাগের অফিসারদের কোনও বুকিং না থাকে। ধোতরেতে আছে নানারকম হোমস্টে, তবে খুব উচ্চমানের নয়। পালমাজুয়াও খুব সুন্দর, এখানে আছে সিংগালিলা জঙ্গল রিসর্ট, ব্যবস্থা বেশ ভাল। বুকিং-এর জন্য ফোন করতে হবে ০৯৬৩৫১০৯২০১/০৯৬৪১৬৭৮০০৬ নম্বরে
আশা ভঙ্গ করেনি বাতাসি। বন বাংলোয় অভ্যর্থনা করল ‘উদ্ধত যত শাখার শিখরে রডোড্রেনডন গুচ্ছ’ – এই অঞ্চলের ভাষায় গুরাস। দু’কামরার বনবাংলো, সামনে খোলা চত্বর থেকে দেখা যাচ্ছে দূরের শহর। শুনলাম এখান থেকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘা, কিন্তু এ সময়ে চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা। একটু মনখারাপ হল, কিন্তু কুয়াশায় ঘেরা জঙ্গলের মধ্যে বন বাংলোয় থাকার রোমাঞ্চই বা কম কী?
দার্জিলিং থেকে তিনদিনের মত খাবার রসদ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, চৌকিদারকে দিতেই এক গাল হেসে জানাল – চিন্তার কোন কারণ নেই, সে সব রান্না করে দেবে। এমন নির্জন জায়গায় অতিথি পেলেই এরা খুশি হয়। পাহাড়ি মানুষেরা নাকি এমনই – সবসময়েই তো’ তাদের কাছ থেকে পেয়েছি নিবিড় আন্তরিকতা। তার কাছে শুনলাম গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সময়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল এই বাংলো। পরে আবার একই ধাঁচে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। বাংলোর একটু আগে যেখানে বড় রাস্তা থেকে বাংলোর পথ বাঁক নিয়েছে, সেখানে বাতাসি গ্রাম মানে একটা বা দুটো দোকান আর গোটা কয়েক বাড়ি। পায়ে পায়ে হেঁটে একটি দোকানে গিয়ে বসতেই দোকানি মহিলা নিয়ে বসালেন তার বাড়ির ভিতরে। আশেপাশের থেকেও অনেকে এসে জুটে গেলেন গল্প গুজব করতে। কিছুদিন দার্জিলিং থাকার সুবাদে নেপালি ভাষা খানিকটা বুঝি। কিন্তু তারা যখন অতিথি পেয়ে সবাই মিলে গল্প আড্ডা শুরু করলেন তখন ভাষা বোঝার হাল ছেড়ে দিয়ে হাসিমুখে বসে থাকা ছাড়া উপায় রইলনা। গুরাস দেখতে এসেছি শুনেই দু’জন মহিলা অনেক রডোড্রেনডন ফুল এনে দিলেন। সকাল বেলা বেড়িয়ে তারা সংগ্রহ করেন – এ থেকে তৈরি হয় একরকম পানীয়। আবার পেটের ওষুধও নাকি তৈরি হুয় গুরাস থেকে। অনেকে রান্না করেও গুরাস খান। আমার মনে পড়ল আমাদের লাল পাহাড়ির দেশের মহুয়ার কথা – তার ব্যবহারও ত’ অনেকটা এরকমই। জঙ্গলে খুব ভোরে আর সন্ধ্যাবেলা যেতে নিষেধ করলেন সবাই, কারণ চিতা ত’ আছেই, কখনও কখনও ‘ভালু’ও নাকি দেখা যায়। কাজ নেই বাবা ভালুর সাথে মোলাকাত করে, তার থেকে বাংলোর ফায়ার প্লেসের পাশে বসে আড্ডা মারাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই বাংলোর বিদ্যুৎ-ব্যবস্থাও অভিনব। বাংলোর পাশেই এক ঝরনার জলে তৈরি হয়েছে ছোট জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, তা থেকে শুধুমাত্র বাংলো চত্বরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা হয়-এটা আবিষ্কার করলাম সন্ধ্যা বেলা বাংলো ফিরে।
সকালবেলা ভালু আর চিতার ভয় কাটিয়ে আমাদের চলা শুরু সিঙ্গালিলা জঙ্গলের পথে। সরু পায়ে চলা পথ, আছে নানা রকমের গাছ – শুধু ধুপি আর পাইন নয়। ফুলে ফুলে ভরে আছে চারদিক। রডোড্রেনডনের থেকেও বেশি চোখে পড়ল ম্যাগনোলিয়া, সাদা হয়ে আছে চারপাশ। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পথ চলার পর কানে এল বাচ্চাদের গলার স্বর। ওরা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছে এই পথে। আমরা যে জঙ্গলের পথ হাঁটাকে প্রায় ‘অভিযান’ ভাবছিলাম সেটা তাদের নিত্যচলার রাস্তা।
বাতাসি থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে ধোতরে। সান্দাকফু থেকে ফেরার পথে ধোতরে হয়ে রিম্বিকের পথে যায় অনেকে। আবার ধোতরে থেকে সান্দাকফু যাত্রাও শুরু করা যায়। এখানে হোম-স্টের ব্যবস্থা আছে। স্থানীয় ছেলেরা প্রায় সবাই গাইড ও পোর্টারের কাজ করে। ধোতরেতে কিছুক্ষণের জন্য দেখা দিল কাঞ্চনজঙ্ঘা, আমাদের মান রাখল। ধোতরে থেকে একটা পথ গিয়েছে পালমাজুয়ার দিকে। পালমাজুয়ার একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিল আমাদের -বহু বছর আগে দার্জিলিং-এ চাকরি সূত্রে এসেছিলাম পালমাজুয়াতে, থেকেছিলাম এখানকার বনবাংলোয়। সে স্মৃতি মনে গেঁথে আছে। আবার যখন সুযোগ এল দেখে আসি সেই বাংলোকে। কিন্তু বাংলোর খবর দিতে পারলো না কেউ। রাস্তার উপর বোর্ড দেখে থমকে দাঁড়ালাম- পুড়ে যাওয়া এক বাংলোর কাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, চারপাশে আপনমনে ফুটে আছে গুরাস, ম্যাগনোলিয়ারা। প্রিয়বিয়োগের ব্যথায় ভরে উঠল মন। আমাদের ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকেরা সন্ধান দিলেন-সামনে একটা রিসর্ট আছে, ভেবেছেন রাত কাটাতে চাই বুঝি। কিন্তু পালমাজুয়াতে সময় কাটাতে আর মন চাইল না। ফিরে এলাম ভারি মন নিয়ে আমাদের বাতাসিতে।
