কেন পান্ডুয়ার সেই রহস্যময় মিনার বানানো হয়েছিল?

সুলতানি যুগের সেই মিনারের গঠন তখনকার অন্যান্য স্থাপত্যের থেকে আলাদা

হুগলি জেলার এক প্রাচীন জনপদ পান্ডুয়া। মালদা জেলাতেও পান্ডুয়া নামের এক শহর আছে। যেটা গড়ে উঠেছিল সুলতানি আমলে। একই নামের দুটি জায়গাকে আলাদা করে চেনার জন্য হুগলির পান্ডুয়াকে অনেক সময়ে ‘ছোটো পান্ডুয়া’-ও বলা হয়ে থাকে। জনশ্রুতি আছে, এক সময়ে এখানে পাণ্ডু বা পাণ্ডুদাস নামের এক রাজা শাসন করতেন। তাঁর নাম থেকেই জায়গাটার নাম হয়েছে পান্ডুয়া। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের এক আত্মীয় শাহ সুফিউদ্দিন। সুফিউদ্দিন সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ বা দলিল দস্তাবেজ পাওয়া যায়নি। তবে পান্ডুয়াতে এমন কিছু স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, যেগুলো তুর্ক-আফগান ঘরানার বলেই ইতিহাসবেত্তারা মনে করেন। যেমন বড়ি মসজিদ, পান্ডুয়া মিনার, সুফিউদ্দিনের সমাধি কিংবা কারিয়া মসজিদ।

এদের মধ্যে পান্ডুয়া মিনারটি পর্যটক ও গবেষকদের কাছে সবথেকে আকর্ষণীয়, কারণ প্রায় অক্ষতভাবে তা এখনও খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। জিটি রোডের ধারে বড়ি মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব দিক এর অবস্থান। কোনো কোনো গবেষক মনে করেন যে সুফিউদ্দিন বিজয়স্মারক হিসেবে এটি তৈরি করিয়েছিলেন ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে। তবে সালটি নিয়ে মতভেদ আছে। আরেকটা মত অনুযায়ী, এটা ছিল বড়ি মসজিদের মিনার। বড়ি মসজিদ এখন ধ্বংসস্তূপ ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু পাঁচ তলা মিনার টিকে রয়েছে এখনও। মিনারের কাঠামো গোল। নিচ থেকে ওপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে প্রত্যেকটা তলা। ভেতর দিয়ে একটা প্যাঁচানো সিঁড়ি উঠে গেছে একেবারে ওপর পর্যন্ত। প্রত্যেক তলায় বারান্দা আছে, যেগুলো সেই তলার ভিত্তি ঘিরে তৈরি করা হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে এই বারান্দাগুলোতে পৌঁছনো সম্ভব। দেওয়ালগুলোতে আস্তর করা। এনামেলের টালিও পাওয়া গেছে দেওয়ালে। নিচের তিনটে তলার কাঠামোতে খাঁজ রয়েছে। সেগুলো গোল গোল নকশা দিয়ে সাজানো। মসজিদের দিকে মুখ করে এই মিনারের প্রবেশপথ আছে দক্ষিণে। প্রবেশপথে পাথরের কপাট দেখা যায়। কপাটের দু’দিকে আছে হিন্দু মন্দির থেকে আনা কারুকার্য করা স্তম্ভ। এখন মিনারে ঢোকা যায় না, কারণ দরজায় তালা লাগানো। 

সারা ভারতের একটি সৌধের সঙ্গেই পান্ডুয়া মিনারের সাদৃশ্য আছে, সেটি হল বিদরের চৌবারা মিনার। সেটিও তুর্ক-আফগান স্থাপত্য। সুলতানি আমলের অন্য কোনো সৌধের দেওয়ালে সাধারণত আস্তর করা থাকত না। তাই পান্ডুয়া মিনার সুলতানি স্থাপত্যরীতির থেকে অনেকটাই আলাদা। অনেকে কুতুব মিনারের সঙ্গে পান্ডুয়া মিনারের তুলনা করেন, তবে দু’টি মিনারের কাঠামোয় পার্থক্য রয়েছে যথেষ্ট। বরং, তুঘলকি স্থাপত্যের সঙ্গে পান্ডুয়া মিনারের প্রচুর মিল রয়েছে। দূর থেকে এই মিনারকে দেখতে অসাধারণ লাগে। যদি মিনারের ভেতরে ঢোকা যেত, তাহলে পাঁচ তলার বারান্দা থেকে নিচে তাকালে কতই না রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখা যেত, সেটা ভেবে শিহরিত হতে হয়। 

তথ্যসূত্র – এবিএম হোসেন, খবর ২৪ ঘণ্টা। 

Developed by DXDasia