
পাখির চোখ পঞ্চকেদার – সপ্তম পর্ব
রুদ্রনাথ মন্দির
সাগরের হোমস্টেতে রাতের বিশ্রাম পর্যাপ্ত হলে উত্তেজনায় অবধারিত ঘুম ভাঙবে অ্যালার্ম বাজার আগেই। অতএব, ভোর হতেই সামান্য কিছু জলযোগ সেরে রুকস্যাক নিয়ে স্থানীয় গাড়োয়ালি পোর্টার কাম গাইডের সঙ্গে শুরু হোক রুদ্রনাথের লম্বা ট্রেক। জনবিরল এলাকা ধরে দীর্ঘ হাঁটাপথ, কষ্টসাধ্যও বটে, তাই প্রথম থেকেই ছক কষে নির্দিষ্ট ছন্দে হাঁটা শুরু করলেই ভালো। সাগর গ্রাম পেরিয়ে, ঘাস জমিকে নিচে রেখে, পাহাড়ি পথ ধরে উপরে উঠতে শুরু করলে প্রথমেই আসে চন্দ্রকোঠি। এখানকার দু-একটা ঝুপড়ি দোকান থেকে সামান্য চা বিস্কুট খেতে খেতে মিনিট পনেরোর বিরতি নেওয়াই যায়। এরপর হালকা জঙ্গল ছুঁয়ে ছুঁয়ে নিস্তব্ধ বনপথ। তবে চড়াই ক্রমশ বাড়বে। পাহাড়ি পথের দু-পাশে আদিমতার গন্ধ মেখে দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে অজস্র ফার্ন, আছে বিরাট বিরাট ওক, মাঝারি আকারের ব্রাস সঙ্গে ঝিঁঝির একটানা ডাক। যেন নেশা ধরে যায়। এরকম পরিবেশে নিজেকে চাঁদের পাহাড়ের শঙ্কর ভেবে নিলেও তা অত্যুক্তি হয় না। পথ চলতে চলতে একসময় হঠাৎই জঙ্গল হারিয়ে হাজির হয় তিনদিক পাহাড় ঘেরা পুঙ্গ বুগিয়াল। এখানেও কয়েকটা ঝুপড়িতে চা, জল, বিস্কুটের সামান্য আয়োজন।

পানার বুগিয়াল
এরকম পরিবেশে নিজেকে চাঁদের পাহাড়ের শঙ্কর ভেবে নিলেও তা অত্যুক্তি হয় না। পথ চলতে চলতে একসময় হঠাৎই জঙ্গল হারিয়ে হাজির হয় তিনদিক পাহাড় ঘেরা পুঙ্গ বুগিয়াল। এখানেও কয়েকটা ঝুপড়িতে চা, জল, বিস্কুটের সামান্য আয়োজন।
একটু বিরতি নিয়ে এরপর আবার উঠে পড়া। এবারের চড়াই কিন্তু আরও কঠিন। পথে পড়বে খরস্রোতা ঝরনার ওপর তৈরি ছোট্ট একটা পুল। আর আবারও হাজির স্যাঁতসেঁতে গাছের গায়ে মসের মায়াময় নিবিড় জঙ্গল আর জঙ্গল। পরবর্তী গন্তব্য মৌলি খড়ক পেরিয়ে লিউটি বুগিয়াল। নানা রংয়ের প্রজাপতি, ঘন জঙ্গলের মধ্যে নেমে আসা মেঘ, দূর থেকে ভেসে আসা ঝরনার গর্জনকে সঙ্গী করেই ভয়ংকর চড়াই ভেঙে লিউটি বুগিয়াল পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে যাবে। পা যদি আর না চলে, তবে সেদিনকার মতো এই বুগিয়ালের ছোটো ছোটো ঝুপড়ির যে কোনও একটায় রাত কাটিয়ে দেওয়া যায়৷ আর পায়ে জোর থাকলে সেদিনই আলো থাকতে থাকতে পৌঁছানো যায় পানার বুগিয়াল। এই পথের সবচেয়ে বড়ো ও সুন্দরী এই পানার বুগিয়াল পৃথিবীর সেরা বুগিয়ালগুলির অন্যতম। গিরিরাজের কোলে সে যেন এক স্বর্গরাজ্য! ঘন সবুজ প্রকৃতির বুক চিরে দাঁড়িয়ে আছে দুধসাদা সব পর্বতশৃঙ্গ। পানারেও আছে ছোটোখাটো কয়েকটা ঝুপড়ির মতো থাকার জায়গা। রাতটা ওখানেও কাটানো যায়৷

পুঙ্গ বুগিয়াল
ট্রেকিংয়ের দ্বিতীয় দিনে পানার থেকেই যাত্রা শুরু করলে পরবর্তী গন্তব্য তিন কিলোমিটার দূরের পিত্রাধর টপ। এ-ও এক অসাধারণ জায়গা। ত্রিশূল, দ্রোণাগিরি, হাতি, ঘোড়া, পালকি রেঞ্জ, নন্দাদেবী, নন্দাঘুণ্টি এখান থেকে এক্কেবারে স্পষ্ট দেখা যায়। এরপর বুগিয়াল পেরোলে আবার পথ ঢুকবে জঙ্গলে। পিত্রাধার থেকে পরবর্তী গন্তব্য পঞ্চগঙ্গা বুগিয়াল। এই পঞ্চগঙ্গাকে বলা হয় মাউন্টেন জাংশান, এখান থেকেই তিন চারটি দিকে, তিন চারটি পথ গেছে। ‘পঞ্চগঙ্গা’ থেকে রুদ্রনাথের দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার। এবারের পথ উতরাইয়ে। দু-পাশে তখন শুধু রডোডেনড্রনের বন। তবে পথ এখানে আর আগের মতো কঠিন নয়৷ হঠাৎই দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে এরপর নজরে আসে রুদ্রনাথ মন্দিরের আধ কিলোমিটার আগের ‘যাত্রী নিবাস’। তারপর আর একটু এগোলেই রুদ্রনাথ মন্দির। প্রতীক্ষার অবসান। দু-দিনের টানা হাঁটাপথের সমস্ত ক্লান্তি দূর হয় এখানে এসেই।

অত্রি গুহা
ট্রেকিংয়ের দ্বিতীয় দিনে পানার থেকেই যাত্রা শুরু করলে পরবর্তী গন্তব্য তিন কিলোমিটার দূরের পিত্রাধর টপ। এ-ও এক অসাধারণ জায়গা। ত্রিশূল, দ্রোণাগিরি, হাতি, ঘোড়া, পালকি রেঞ্জ, নন্দাদেবী, নন্দাঘুণ্টি এখান থেকে এক্কেবারে স্পষ্ট দেখা যায়। এরপর বুগিয়াল পেরোলে আবার পথ ঢুকবে জঙ্গলে।
মন্দির দুপুরে বন্ধ থাকে, খোলে বিকেল সাড়ে চারটেয়। মন্দিরের কাছাকাছি রয়েছে কয়েকটি জলধারা- সূর্য কুণ্ড, চন্দ্র কুণ্ড, তারা কুণ্ড, মানা কুণ্ড, যোধা কুণ্ড বা সরস্বতী কুণ্ড। মন্দিরের কিছুটা নীচ থেকে বয়ে চলেছে বৈতরণী নদী, যার অন্য নাম রুদ্রগঙ্গা। আর তার ওপরেই আবারও সার দিয়ে ত্রিশূল, নন্দাদেবী, নন্দাঘুণ্টির গৌরবময় উপস্থিতি। মন্দিরের একপাশে রয়েছে পাঁচ পাণ্ডবের পাঁচটি ছোটো ছোটো মন্দির, তবে এখানে সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। একসময় সন্ধ্যারতি শুরু হয় মন্দিরে। গুহামন্দিরের সঙ্গে যুক্ত ঘরের ছাদ থেকে ঝোলে বিভিন্ন আকারের ঘণ্টা। পূজারি গাড়োয়ালেরই পুরোহিত। আরতি শেষে, স্বয়ম্ভূ শিবলিঙ্গ থেকে ধীরে ধীরে তিনি খুলে নেন মালা ও রাজ (রুদ্র) বেশ। উন্মোচিত হন চতুর্থ কেদার, তাঁর শান্ত ক্ষমাশীল, সমাহিত রূপে। মহাদেবের বাঁ পাশে পিতলের সাপ, ডান পাশে পিতলের কমণ্ডলু ও ত্রিশূল। আরতি শেষ হলেও সমবেত মন্ত্রোচ্চারণে ঘোর লেগে যায় এমন পরিবেশে। ওইদিন রুদ্রনাথ যাত্রীনিবাসেই কাটবে রাত।

অনসূয়া মাতা মন্দির
পরদিন অর্থাৎ তৃতীয়দিন সকালে দিনের আলোয় মন্দির এবং চারপাশের অনবদ্য সৌন্দর্য দর্শন, আদিদেবের রুদ্ররূপে অভিষেক এবং পুজো দেখে ফেরার পথ নিতেই হবে, কারণ এই পর্বের ট্রেকিংয়ে আরও কিছু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা বাকি আছে তখনও। এবারের গন্তব্য অনসূয়া মাতা মন্দির। দেবী অনসূয়া ছিলেন মহাঋষি অত্রির স্ত্রী। মাতৃস্নেহ, ত্যাগ, তিতিক্ষা, তপস্যার অভূতপূর্ব মিশেলে এক অনন্য চরিত্র এই অনসূয়া মা। গাড়োয়াল হিমালয়ের মানুষের কাছে এই দেবীর সাধনস্থল তাই সতীপীঠের সমান। রুদ্রনাথ ট্রেকিংয়ে যাওয়ার পথে বা ফেরার সময় মাতা অনসূয়া ট্রেক, ট্রেকারসদের তাই অবশ্য দ্রষ্টব্য। আমরা ফেরার পথেই এই ট্রেকটি রেখেছি তাই সেই মতো সকাল সকাল রুদ্রনাথ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হবে লম্বা পথ।

পঞ্চপাণ্ডব মন্দির
পঞ্চগঙ্গা পর্যন্ত সেই একই পথ, তারপরেই ডানদিকে সুউচ্চ নওলা পাসের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ভীষণ চড়াই, খুবই কঠিন ট্রেক এই পথটুকু, আর তারপর ভয়ংকর বাঁক ঘুরে জঙ্গল পথে কেবল নামা। এ পথে বুনো ভাল্লুকের ভয় প্রতি মুহূর্তে, পথও ভুল হতে পারে যে কোনও সময়। তাই উচিত দলবদ্ধ ভাবে, গাইডকে অনুসরণ করে এই ঘন জঙ্গল পেরোনো। পাশে ভয়ংকর খাদ আর বুনো জঙ্গল পথ চলতে চলতেই মাঝে পড়ে হংস বুগিয়াল, কান্দাই বুগিয়াল, সেখানে প্রয়োজন মতো সামান্য জল, বিস্কুট বা শুকনো খাবার খেয়ে সাময়িক বিরতি নেওয়া যেতেই পারে। দূর থেকে দেখা যায় অনসূয়া গ্রাম, সারাদিনের পরিশ্রমে একটু তৃপ্তির ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগে। কিন্তু তা বলে এখানেই বেশি দেরি করে ফেললে জঙ্গল পথে আলো নিভে যাওয়ার প্রবল সম্ভবনা। তাই কান্দাই বুগিয়াল থেকে নতুন উদ্যমে হাঁটা শুরু করতে হবে আবার। পাঁচ কিলোমিটার দূর থেকে এখানে শোনা যায় এক নদীর গর্জন, সেই শব্দকে অনুসরণ করতে করতে ঘন জঙ্গল পথে এগিয়ে গেলে একসময় সামনে আসে সেই খরস্রোতা, যার একদিকে চলে গেছে পাহাড়ের গুহায় অত্রিমুণির আশ্রম যাওয়ার পথ। আর একদিকে অনসূয়া মন্দির যাওয়ার নিশানা।

রুদ্রনাথ
বিশাল জলপ্রপাতকে সাক্ষী রেখে অত্রিমুণির আশ্রমে যাওয়ার পথ খুবই বিপদসংকুল। কখনও বুকে হেঁটে পথ চলা, কখনও লোহার শিকল ধরে চড়াই পেরোনো সবরকম কসরতই আছে সে পথে। তাই অনেকেই পাহাড় থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়া অত্রিগঙ্গার বিপুল জলধারার সামনে এসে মহর্ষির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে একই পথে সাবধানে ফিরে যান খরস্রোতার অন্য পাড়ে। জঙ্গল পথে প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটলে, বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নাগাদ এরপর সামনে আসে ছবির মতো সুন্দর গ্রাম অনসূয়া এবং অনসূয়া মন্দির। এখানে থাকা, খাওয়ার জন্য মন্দির কমিটির ধর্মশালা রয়েছে। মন্দিরের প্রধান পুরোহিতই সবটা দেখাশোনা করেন। দেবী অনসূয়ার অপূর্ব সুন্দর মূর্তি দর্শন করে ইচ্ছে হলে পুজো দিয়ে সেদিনকার মতো রাতটা কাটবে এখানেই। পরদিন সকালে তখনও পায়ে জোর থাকলে দেখে নেওয়া যায় ছোট্ট এই গ্রামের আরেক শান্ত সমাহিত জায়গা ঋষি দত্তাত্রেয়র মন্দির। এরপর, এবার সত্যিই ধরতে হবে ফেরার পথ। আমাদের গন্তব্য এখান থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মণ্ডল জনপদ। আবার সেই জঙ্গল পথ, মাঝে চোখে পড়বে ASI কর্তৃক রক্ষিত ষষ্ঠ শতাব্দীর এক প্রাচীন শিলালিপি। মাঝ সকালে অনসূয়া থেকে হাঁটা শুরু করলে বর্ধিঞ্চু গ্রাম মণ্ডলে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়৷ মণ্ডল থেকে আবার সাগর বা গোপেশ্বর যাওয়ার বাস, বা যে কোনও গাড়ি মেলে। অতএব, টানা তিন-চারদিনের রোমাঞ্চকর, রোমহর্ষক, দীর্ঘ রুদ্রনাথ ট্রেকের পরিসমাপ্তি এই মণ্ডলেই। পথের দুর্গমতা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু ট্রেকিং শেষের অনুভূতি এ পথে সত্যিই বিরাট আত্মবিশ্বাস ও যুদ্ধজয়ের তৃপ্তি দেয় নিশ্চিত ভাবেই।
কীভাবে যাবেন
হরিদ্বার বা ঋষিকেশ থেকে গোপেশ্বর পৌঁছে সেখান থেকে আরও ৫ কিলোমিটার দূরে সাগর গ্রাম। তারপর রুদ্রনাথের উদ্দেশ্যে সেই দীর্ঘ ট্রেকিং পথ অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।
কোথায় থাকবেন
এই ট্রেকিংয়ে, সঙ্গে নিজের টেন্ট থাকলে সবচেয়ে ভালো। যদিও, পুঙ্গ, পানার, হংস, কান্দাইয়ের মতো বুগিয়ালগুলিতে মাথা গোঁজার মতো অস্থায়ী ঝুপড়ি পাওয়া যায়। আর হোমস্টের পরিষেবা মেলে এ পথে ট্রেকিং শুরুর পয়েন্ট সাগরে বা ট্রেকিং শেষ পয়েন্ট মণ্ডলে। রুদ্রনাথে এবং অনসূয়াতে রাতে থাকার জন্য সেখানকার মন্দির কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
কখন যাবেন
জঙ্গল পথে যখন তখন এসে পড়া মেঘ বর্ষার সময় ছাড়াও যে কোনও সময় নামায় বৃষ্টি। তাই সবসময় এ পথে রেনকোট রাখা বাঞ্ছনীয়। ঘোর বর্ষায় এ পথ খুবই বিপজ্জনক। মে থেকে অক্টোবর সবচেয়ে সুন্দর সময় এই ট্রেকিংয়ের জন্য।
চলবে…
_____________________
*কেদারনাথ, মদমহেশ্বর, তুঙ্গনাথ, রুদ্রনাথ, কল্পেশ্বর – পঞ্চকেদারের রোমহর্ষক ভ্রমণকাহিনি এবার বঙ্গদর্শনে। পড়ুন পিয়ালী বসুর (Piyali Basu) ধারাবাহিক ‘পাখির চোখ পঞ্চকেদার’। প্রতি শুক্রবার, দুপুর ৩টেয়।
