চা বাগান থেকে লুপ্তপ্রায় মাদল ও ধামসার সুর সারা বাংলা পৌঁছে দিতে চান উত্তরবঙ্গের কন্যা

গুলমা চা বাগানের দিব্যাকিশোরী মুন্ডার থেমে না থাকার লড়াই

বাংলার লোকসংস্কৃতির অঙ্গ মাদল ও ধামসা। দক্ষিণবঙ্গ থেকে উত্তরবঙ্গ – কোনো জায়গাতেই কম নেই এই মাদল-ধামসার উচ্চাঙ্গ সুর। মিঠে তালে নেচে ওঠে আবিশ্ব প্রাণ। উত্তরবঙ্গের চা বাগানে আদিবাসীদের সংস্কৃতির মূল বাদ্যযন্ত্রই হল মাদল ও ধামসা। কিন্তু বিদেশি ডিজে সংস্কৃতির চাপে নতুন প্রজন্মের মধ্যে হারিয়ে যেতে বসেছে এই মাদল-সংস্কৃতি। এর মধ্যেই নিজস্ব সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলিতে। যেমন গুলমা চা বাগানের দিব্যাকিশোরী মুন্ডা।

শিলিগুড়ি শহর ছাড়িয়ে সুকনা পেরিয়ে দার্জিলিংয়ের রাস্তায় যেতে হয়। সেই সুকনা প্রবেশের আগেই রয়েছে পাহাড়ি উপত্যকার মাঝে সুন্দরী গুলমা চা বাগান। চা বাগান থেকে উত্তরে তাকালেই নজরে আসবে সুউচ্চ হিমালয়। চা বাগানের চারপাশে সবুজের ছড়াছড়ি। বাগানের শ্রমিক মহল্লায় আর্থিক অভাব। শিক্ষার আলো প্রায় নেই বললেই চলে। সন্ধের পর সেখানে অনেক শ্রমিকের ঘরে হাড়িয়া বা চোলাই মদের ফোয়ারা চলে। সেইরকম পরিবেশ থেকে কলেজে যাওয়াটা নিশ্চয়ই উল্লেখ করার মতো দিক।

দিব্যাকিশোরী তেমনই এক ব্যতিক্রমী ছাত্রী। ইগনুতে বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী দিব্যাকিশোরী। তার বাবা-মা চা শ্রমিক। মাঝেমাঝেই বাবার কাজ আবার বন্ধ থাকে। পরিবারে আরও ভাই রয়েছে। অভাব সবসময় কুড়েকুড়ে খায় দিব্যাকিশোরীকে। কিন্তু তারপরও হেরে না যাওয়ার মানসিকতা তৈরি করেছে সে।

অভাবের পরিবারে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ যেমন প্রতিবন্ধকতা, তেমনই নিজের সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া আরও বড়ো প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতা জয় করার জন্য যেন চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজে নেমেছে সে। চা বাগানে প্রায় হারিয়ে যেতে থাকা মাদল সে গলায় ঝুলিয়ে নিয়েছে। মাটিগাড়ার একটি সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রে সে নিয়মিত মাদল শিক্ষা গ্রহণ করতে যায়। আরও উল্লেখ করার বিষয় হল, মাদলের পাশাপাশি তবলা ও কত্থক নৃত্যশিক্ষা গ্রহণ করছে দিব্যাকিশোরী। ফাদার কল্যাণ কিশোর তির্কী তাকে নিয়মিত তবলা ও মাদল বাজানোর তালিম দিয়ে চলেছেন।

ঘরে অভাব থাকলেও দিব্যাকিশোরী এর ওর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিয়ে এসব শেখার জন্য ছুটছে। চা বাগানের ঐতিহ্যবাহী মাদল, ধামসা এই প্রজন্মের অনেক ছেলেমেয়ে শিখতে চায়। কিন্তু সবার সামর্থ্য নেই। দিব্যাকিশোরী জানায়, শ্রমিক মহল্লায় অভাব জয় করতে গিয়েই এসব সংস্কৃতিকে ধামাচাপা দিতে হয়। তাছাড়া বিদেশি ডিজে সংস্কৃতির দাপটও আদিবাসীদের এই প্রাচীন সংস্কৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছে। এসবের মধ্যেই মাদলচর্চা আগামীদিনে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বেশি বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখে দিব্যাকিশোরী। তার পাশাপাশি ডিজে সংস্কৃতির দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে চা বাগানের অভাবীদের ভারতীয় ধ্রুপদী সংস্কৃতির তবলা ও কত্থক নৃত্য শেখাতে আগ্রহী সে। তার এই অদম্য জেদের লড়াইয়ে সামিল হয়েছে বেশকিছু ছেলে-মেয়েও। 

Developed by DXDasia