বিএসএফ কাশ্মীর ফুটবল টিম সামলাচ্ছেন বাংলার নবকুমার

পুলওয়ামা-লালচক থেকে ছয় কিলোমিটারের মধ্যে নবকুমার বসাকের বর্তমান কর্মস্থল

উঁচু সীমান্তে বরফ পড়ার সময় তিনি আর দশজন সহযোদ্ধার সঙ্গে কাজ করেন। জঙ্গিদের নিশানা যখন গোটা জম্মু-কাশ্মীর, তখনও ভয় না পেয়ে তিনি লড়ে যান। আসলে ছোটোবেলায় খেলাধূলা করতে মাঠে ছুটতেন বল নিয়ে। ফুটবলের জন্য একাধিক স্বীকৃতিও পেয়েছেন। তখন থেকেই ভাবতেন দেশের জন্য কাজ করবেন। তবে সে খেলা অন্য।

শিলিগুড়ি (Siliguri) সংহতি মোড়ের পূর্ব বিবেকানন্দ পল্লীতে বাড়ি ৩৭ বছর বয়সী নবকুমার বসাকের (Nabakumar Basak)। বাড়িতে বাবা, মা, স্ত্রী, কন্যা সবাই আছে। কিন্তু ৩৬৫ দিনের মধ্যে মেরেকেটে ৬০ দিনও ঠিকমতো পরিবারের সঙ্গে সময় দেওয়া হয়ে ওঠে না নবকুমারের। ২০১৮ সাল থেকে তাঁর সময় কাটছে জম্মু-কাশ্মীরে। শ্রীনগরের চক সেক্টরে বিএসএফ কাশ্মীর (BSF Kashmir) ফুটবল টিমের তিনি একজন প্রশিক্ষক। বিএসএফের স্পোর্টস ফিজিওর দায়িত্বও সামলান নবকুমার। সেখানে বিএসএফ পরিচালিত জিমের দায়িত্বেও রয়েছেন তিনি। সেখানকার অনেক আধিকারিক তাঁর তত্ত্বাবধানেই শরীর চর্চা করেন সেখানে। তাঁর প্রশিক্ষণে সর্বভারতীয় ফুটবল প্রতিযোগিতায় বিএসএফের অনেকে অংশ নিয়েছেন। দেশের প্রধান স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ জম্মু-কাশ্মীরে শরীর চাঙ্গা রাখা বিএসএফের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সেখানে সবসময় দেশের জন্য লড়াই, সবসময় দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মানসিকতা প্রাণপনে কাজ করে।

নবকুমার বসাক

এরকম স্থানে বিএসএফের শরীর চর্চা, ফুটবল খেলার অনুশীলন চালিয়ে নজির সৃষ্টি করেছেন বাংলার এই তরুণ। দরকার পড়লে জরুরি অবস্থায় অস্ত্র চালনাও করতে হতে পারে তাঁকে। তার জন্য অত্যাধুনিক অস্ত্র চালনার পাঠ সেরে রাখতে হয়েছে।

২০০৬ সালে ফুটবল খেলার জন্যই তিনি চাকরি পান বিএসএফে। প্রথম পোস্টিং হয় পঞ্জাবের জলন্ধরে। তারপর বিএসএফেরই মনিপুর ফ্রন্টিয়ার ফুটবলে যোগ দেন। সেখান থেকে শ্রীনগরে ২০১৮-তে। পুলওয়ামা এবং লালচক থেকে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে তাঁর বর্তমান কর্মস্থল। বিএসএফ কাশ্মীর ফুটবল টিমের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে স্পোর্টস ফিজিওর দায়িত্ব পান।

২০০৬ সালে ফুটবল খেলার জন্যই তিনি চাকরি পান বিএসএফে। প্রথম পোস্টিং হয় পঞ্জাবের জলন্ধরে। তারপর বিএসএফেরই মনিপুর ফ্রন্টিয়ার ফুটবলে যোগ দেন। সেখান থেকে শ্রীনগরে ২০১৮-তে। পুলওয়ামা এবং লালচক থেকে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে তাঁর বর্তমান কর্মস্থল। বিএসএফ কাশ্মীর ফুটবল টিমের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে স্পোর্টস ফিজিওর দায়িত্ব পান।

বিএসএফ কাশ্মীর ফুটবল টিম

তাঁর প্রিয় ফুটবলার দিয়েগো মারাদোনা। ফুটবল মাঠে মিডফিল্ডার হিসাবে অনেকেই ভালো চেনেন নবকুমারকে। স্কুল জীবন কেটেছে শিলিগুড়ি নীলনলিনী হাইস্কুলে। বাংলার অনুর্দ্ধ ১৭ স্কুল দলে তিনি খেলার সুযোগ পেয়েছেন, সুব্রত কাপেও খেলেছেন। স্কুলে পড়ার সময়ই ফুটবল মাঠে তাঁর ক্রীড়া শৈলী ঘর ভর্তি পুরস্কার এনে দিয়েছে। দিল্লিতে এলজি কাপ খেলতে গিয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সে। সেই সময় তাঁর খেলা দেখে বিএসএফের আধিকারিকরা খুশি হন এবং চাকরির প্রস্তাব দেন। তাঁকে পেয়ে বিএসএফ ফুটবল টিম আজ অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে, তা অনেকেই স্বীকার করেন।

বাইচুং ভুটিয়ার সঙ্গে নবকুমার

তবে শুধু খেলাধূলাই নয়, মানুষ হিসাবেও নবকুমার বিশেষ গুণের অধিকারী। ২০১৯ সালে শিলিগুড়ি এন্ড স্মাইলিং ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (End Smiling Welfare Society) নামে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গঠন করেছেন নিজের উদ্যোগে। একবার শিলিগুড়ির এক রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সময় এক কন্যাদায়গ্রস্ত অসহায় মা এসে তাঁর মেয়ের বিয়ের জন্য অর্থ সাহায্য চান। সেই মায়ের কান্না শুনে নবকুমার বন্ধু বান্ধবদের জন্য ওই মায়ের মেয়ের বিয়ের জন্য অর্থ সাহায্য তুলে দেন। এরপর নবকুমার স্থির করেন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গঠন করে মানুষের পাশে আরও বেশি করে দাঁড়ানো যায়। বিগত করোনার দিনগুলোতে জম্মুতে থাকলেও কাজের ফাঁকে শিলিগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে অসহায় গরিব মানুষের পাশে ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন এন্ড স্মাইলিং ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মাধ্যমে। নিজের বেতনের কিছু অংশ দিয়ে তিনি প্রতিমাসে কিছু না কিছু সামাজিক কাজ করেন এনজিওর মাধ্যমে। ভবিষ্যতে নবকুমার একটি বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করতে চান উত্তরবঙ্গে। আর তরুণদের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, নেশা হোক ভালো আড্ডার আর খেলার মাঠে যাওয়ার।

Post Tags
Developed by DXDasia