
তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে বাংলা গানের পালাবদল
বাঙালি জাতির মনের আগল খোলা; কুণ্ঠাহীন, মুক্তমনে বিভিন্ন শিল্প-সংস্কৃতি-ভাষাকে সে বন্ধু করেছে। দিয়েছে যেমন, গ্রহণও করেছে। শুধুমাত্র বাংলার সাংগীতিক ধারাবাহিকতা অনুসন্ধান করলেই তা ধরা পড়বে। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় সেরেনাড (serenade) হতো অন্যরকম। সন্ধে নামলেই টপ্পা, ঠুংরি, খেয়াল, হিন্দুস্তানি ধ্রুপদের মজলিসে মিলেমিশে যেত সাহেব সুবোদের সুরঝংকার। সেই কবে থেকে হারমোনিয়াম, ঢাকঢোল, খোল-করতাল, মৃদঙ্গ, তবলা-বাঁয়া, সানাই, সেতার, সরোদের পাশাপাশি দিব্যি বেজে চলেছে পিয়ানো, ভায়োলিন, স্যাক্সোফোন, গিটার, ড্রামস, হার্প, চেলো। সংগীতে যাহা ‘সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি-সা’, তাহাই তো ‘ডো-রে-মি-ফা-সো-লা-তি-ডো’ -এই সারকথাটি আত্মস্থ করে ফেলেছিলেন বাঙালি সংগীতকাররা। সকলে নয়, কেউ কেউ। মিশ্ররীতির প্রভাব নিয়ে তাঁদের হাত ধরেই বাংলা সংগীতের নিজস্বতা নব নব রূপে প্রাণ পেয়েছে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর আগে ও পরে, কারা—কীভাবে ধীরে ধীরে বাংলা সংগীতে এনেছিলেন নবজাগরণের ধারা, যা প্রবাহিত হয়ে চলেছে এই প্রজন্মের মধ্যেও, ৫৬ মিনিট দৈর্ঘ্যের ‘নবজাগরণের গান’ (Music of Rejuvenation) শীর্ষক তথ্যচিত্রের মাধ্যমে এর অনুসন্ধান করেছেন শুভা দাস মল্লিক। এর আগেও সংগীত-নির্ভর দুটি তথ্যচিত্র বানিয়েছেন চলচ্চিত্র বিদ্যা এবং গণমাধ্যমের অধ্যাপক তথা তথ্যচিত্র-পরিচালক। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ শুরু করার নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। “২০১৫ সালে City Symphony নাম দিয়ে এই ছবিটার জন্য ফিল্ম ডিভিশনের কাছে প্রস্তাব পাঠাই। ফাইনাল অ্যাপ্রুভাল আসে ২০২১ সালের মার্চ-এ। ছবিটাকে আমি ‘মেটেরিয়ালাইজড’ করতে চাইনি কিন্তু ওরা চাইলো। যেকারনে ছবিটাকে দু’ভাগে ভাগ করে লন্ডনে বেশ বড়ো একটা অংশ শ্যুট করতে হয়। ছবিটা দুটো অংশে ভাগ হওয়ার পর ফিল্ম ডিভিশন বললো, আপনার সঙ্গে আমাদের একটা ছবিরই কন্ট্রাক্ট হয়েছিল, তাই আমরা যে কোনও একটা অংশ নেবো। ওরা নিল প্রথম অংশটা, আর একটা অংশ রয়ে গেল আমার কাছে। যেটা আমি নাম দিলাম ‘নবজাগরণের গান’ এবং সেটা আমার নিজের প্রযোজনা হয়েই রইলো।” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন শুভা দাস মল্লিক।
সংগ্রাহক সুশান্ত চ্যাটার্জি’র সঙ্গে শ্যুটিং-টিম নিয়ে শুভা দাস মল্লিক
বাংলায় সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানের মুক্তধারার কথাই এ তথ্যচিত্রে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। ‘বাঙালি ও হিন্দুস্তানি জবানে জৈবিক উত্তম বাঙালি গান বিলিতি নানা যন্ত্রের সহিত’ ইউক্রেনের বাসিন্দা গেরাসিম স্টেপানোভিচ লেবেদেফ পরিচালিত নাটক ‘কাল্পনিক সংবদল’ মঞ্চস্থ হওয়ার আগে দেখা গিয়েছিল এমনই একটি বিজ্ঞাপন। লেবেদেফ তাঁর নাটকে দর্শক টানতে কবি ভারতচন্দ্র রায়ের লেখা গানের ব্যবহার করেছিলেন। মঞ্চে গানটির সঙ্গে পিয়ানোর একটা ইন্টারলিউড বা অন্তরা ছিল।
এরপরই অবধারিত ভাবে এসে পড়ছে ঠাকুরবাড়ির প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ গান বাঁধার সময় আগে পিয়ানোতে সুর তুলতেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ক্লাসিকাল পিয়ানোতে বাজাতেন বিভিন্ন রাগ-রাগিনী। রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর একাধিক গানে গ্রামবাংলার লোকসংগীতের সুর ব্যবহার করেছিলেন। গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ যেভাবে হয়ে উঠেছিল ‘আমার সোনার বাংলা’। আগে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রচলিত ‘আকারমাত্রিক স্বরলিপি’ অনুযায়ীই গান গাওয়া হতো। ধীরে ধীরে তা পরিবর্তন হয়ে বাংলা গান হয়ে উঠলো কম্পোজারদের। শুরু হল গান নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা, যে ধারা এখনও চলছে।
ছবিতে গান গেয়েছেন সৌমেন্দ্র-সৌম্যজিৎ জুটি, দেবাশিষ রায়চৌধুরী, সর্বাণী, শতাব্দী রায়। তাঁরা শুধু নতুন আঙ্গিকে পুরোনো গানগুলি গেয়েছেন এমনটা নয়, শিকড় অনুসন্ধান করে প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। সৌমেন্দ্র-সৌম্যজিৎ পিয়ানোয় মেঘমল্লার বাজিয়েছেন, দেখিয়েছেন ‘আগুনের পরশমনি’ সহ একাধিক রবীন্দ্রগানে কোন কোন অপেরা বা পশ্চিমী সংগীতের সংযোগ ঘটেছে।
তথ্যচিত্রের একজন কথক
মুঘল সংস্কৃতি ও ইংরেজি সংস্কৃতির মধ্যে বাঙালি শেষত ইংরেজি সংস্কৃতিকেই প্রাধান্য দিয়েছিল, এই তথ্যচিত্র তারই প্রমাণ। ছবিতে একাধিক ন্যারেটর বা কথক আছেন, যাঁরা দৃশ্যায়ণ অনুযায়ী ধাপে ধাপে বর্ণনা করেছেন বা বিশেষ কোনও লেখা পাঠ করেছেন। পায়ে হেঁটে পুরোনো কলকাতা তরুণদের চোখে নতুন করে চেনাতে চায় এই ছবি। কখনও চোখের সামনে ভেসে উঠবে ৩৭ নম্বর এজরা স্ট্রিট, কখনও হুতোম পেঁচার নকশা বা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি। ছবিতে গান গেয়েছেন সৌমেন্দ্র-সৌম্যজিৎ জুটি, দেবাশিষ রায়চৌধুরী, সর্বাণী, শতাব্দী রায়। তাঁরা শুধু নতুন আঙ্গিকে পুরোনো গানগুলি গেয়েছেন এমনটা নয়, শিকড় অনুসন্ধান করে প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেছেন। সৌমেন্দ্র-সৌম্যজিৎ পিয়ানোয় মেঘমল্লার বাজিয়েছেন, দেখিয়েছেন ‘আগুনের পরশমনি’ সহ একাধিক রবীন্দ্রগানে কোন কোন অপেরা বা পশ্চিমী সংগীতের সংযোগ ঘটেছে। দেবাশিষ-সর্বাণী বলেছেন পঞ্চকবির গান, কলের গান, আধুনিক গান, প্রতিরোধের গান কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং এখনকার সময়ে তা কীভাবে উপস্থাপিত হয়ে চলেছে। সংগ্রাহক সুশান্ত চ্যাটার্জি’র সংগ্রহ থেকে বেশ কিছু দুর্লভ গ্রামোফোন রেকর্ড শোনার সুযোগ রয়েছে ছবিতে।
সৌমেন্দ্র-সৌম্যজিৎ
শুভা দাস মল্লিক পরিচালিত ‘নবজাগরণের গান’ তথ্যচিত্রটি দেখা যাবে ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। ১০ ডিসেম্বর, ১.৩০টায় শিশির মঞ্চে এবং ১১ ডিসেম্বর ৫টায় নন্দন ৩-এ।
ছবি ঋণ: শুভা দাস মল্লিক
