
আমার আকাশ দুটি চোখে তুমি হয়ে গেলে তারা…
‘ওতোতা পাখি রে শিকল খুলে উড়িয়ে দেবো মাকে যদি এনে দাও’ নির্মলা মিশ্র’র কণ্ঠে এই গান শুনে কোনও বাঙালির মন সিক্ত হয়ে ওঠেনি, তা বললে মিথ্যে বলা হয়। শুধু এই বেদনাতুর গানটিই নয়, একটা সময়ে যখন বাংলার সাংস্কৃতিক-রুচিতে অবক্ষয় ধরা পড়েনি, বাংলার যেকোনও আনন্দ-উৎসব-অনুষ্ঠানে আবাহনী হয়ে বেজে উঠত ‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না, যাতে মুক্তো আছে’, ‘এই বাংলার মাটিতে মা গো জন্ম আমায় দিও’, ‘বলো তো আরশি তুমি মুখটি দেখে’ অথবা ‘কাগজের ফুল বলে আজও ঝরেনি’। একটা গান শুধু কথা আর সুরের নয়, বৃহত্তর আবেগের। গায়কীর মূল কাজটিই হল এই আবেগকে কণ্ঠে উজাড় করে দেওয়া, যাতে তা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যাতে একসঙ্গে অনেককে ছুঁয়ে ফেলা যায়। নির্মলা মিশ্র (Nirmala Mishra) এই কাজটি একটানা সুনিপুণ ভাবে করে গিয়েছিলেন।
কাজের মধ্যেই ডুবে থাকতে ভালোবাসতেন নির্মলা মিশ্র। এক জায়গার বেশিক্ষণ বসে থাকার মানুষ ছিলেন না। শান্ত, গুরুগম্ভীর নয় তাঁর স্বভাব ছিল ঠিক তার উল্টো। কিন্তু কখনই তাঁকে নিজের ঢাক নিজে পেটাতে দেখা যায়নি। গানেই তাঁর পরিচয়। প্রকৃত শিল্পীর মতো জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেই ধারাই অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন। সোনাঝরা দিনগুলির স্মৃতি সঙ্গে করে স্বামীর সঙ্গে কসবার এক চিলতে ফ্ল্যাটেই ছিলেন শেষ জীবন পর্যন্ত।
ওড়িয়া ছবিতে তাঁর গান এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল ওই রাজ্যে তিনি ‘ফিল্ম কুইন’ তকমা পেয়েছিলেন। পুরীর মন্দির থেকে পেয়েছিলেন ‘গান-গান্ধর্বী’ খেতাব। বাংলা থেকে পেয়েছেন ‘বঙ্গবিভূষণ’।
ছোটোবেলায় তাঁর বাবা, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্বনামধন্য পণ্ডিত মোহিনীমোহন মিশ্রের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম পেয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সব দিকপালই তাঁদের বাড়ি আসতেন। বড়ে গুলাম আলি খানের কোলে বসে ওঁর গান শুনতেন। উনি নির্মলাকে মেয়ে বলতেন। রবিশঙ্করের ‘কালামাটি’ ছবিতে গান গেয়েছেন। রবিশঙ্কর মজা করে তাঁকে ডাকতেন ‘স্যুইট গার্ল’। ছোটো বেলায় একবার টাইফয়েড হয়, চিকিৎসা করেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। ওঁর চিকিৎসাতে সুস্থ হয়ে উঠলেও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় ওই বয়সেই হৃদরোগে আক্রান্ত হন। বিধানবাবু উচ্চাঙ্গ সংগীত গাইতে নিষেধ করেছিলেন। সেই নিষেধ মেনে উচ্চাঙ্গ সংগীত আর গাননি কিন্তু গান গাওয়া ছেড়ে দেননি। ঝুঁকলেন আধুনিক গানের দিকে। মেয়ের জেদের কাছে নতি স্বীকার করলেন বাবাও। নির্মলা মিশ্রের প্রথম রেকর্ড বেরোয় ১৯৫৭-তে। সেই শুরু। তারপর একের পর এক কালজয়ী আধুনিক গানে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি গেয়েছেন সিনেমার গান। ওড়িয়া ছবিতে তাঁর গান এতটাই জনপ্রিয় হয়েছিল ওই রাজ্যে তিনি ‘ফিল্ম কুইন’ তকমা পেয়েছিলেন। পুরীর মন্দির থেকে পেয়েছিলেন ‘গান-গান্ধর্বী’ খেতাব। বাংলা থেকে পেয়েছেন ‘বঙ্গবিভূষণ’। আর যেটা উল্লেখ না করলেই নয়, ভালো তবলা বাদক হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছিলেন নির্মলা।

আমরা কোথায় আছি? সিনিয়রদের সম্মান জানাতে জানেই না আজকের প্রজন্ম। উপরন্তু দেখা হলে কথা পর্যন্ত বলে না! কাউকে এখন ফোন করে যদি বলি তোমার গান শুনলাম, বেশ ভাল লাগল, তাতে যা হাবভাব নেয়! ধুর!… এসব থেকে সরে আসাই ভাল।”
সংগীতশিল্পীরা সাধারণত ঠান্ডা খাবার বা পানীয় এড়িয়ে চলেন। নির্মলা ছিলেন ব্যতিক্রমী। ঠান্ডা পানীয়, আইসক্রিম, চকোলেট খেতে খুবই ভালোবাসতেন। রেওয়াজ করতেন যখন-তখন। বেশ কয়েক বছর আগে ২০১৪ সালে আনন্দবাজার পত্রিকা-র একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, কোথাও গান গাইতে তাঁর আর ভালো লাগে না। অভিমান থেকেই এহেন ভাবনার সূত্রপাত। বলেছিলেন, “আমার একদম ভালো লাগছে না ভাই। সেদিন একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছি, হঠাৎ একজন শিল্পী এলেন। আমার থেকে অনেক ছো্টো। বললেন, তাঁকে আগে গাইতে দিতে হবে। অন্য অনুষ্ঠান আছে। পরে ওঁরই মিউজিশিয়ানদের কাছে শুনলাম অনুষ্ঠানের কোনও ব্যাপারই নেই! মিথ্যে বলে উনি আগে গেয়ে নিলেন।
ভাবুন তো! আমরা কোথায় আছি? সিনিয়রদের সম্মান জানাতে জানেই না আজকের প্রজন্ম। উপরন্তু দেখা হলে কথা পর্যন্ত বলে না! কাউকে এখন ফোন করে যদি বলি তোমার গান শুনলাম, বেশ ভাল লাগল, তাতে যা হাবভাব নেয়! ধুর!… এসব থেকে সরে আসাই ভাল।”
২০০৯-এ “বাংলা ও বাঙালির গান” (১৯০২-১৯৭২) বিষয়ে একটি তথ্যচিত্রের সূত্রে উত্তরপাড়া জীবনস্মৃতি ডিজিটাল আর্কাইভ-এর কর্ণধার এবং শিল্প-তত্ত্বাবধায়ক অরিন্দম সাহা সরদারের সঙ্গে যোগাযোগ ঘটেছিল নির্মলা মিশ্র’র। শুটিং-এর জন্য অরিন্দম গিয়েছিলেন গায়িকার বাড়ি। ‘স্মৃতি-মালার একটি মুক্ত’ অরিন্দম এভাবেই ব্যাখা করেন সেই দিনের অভিজ্ঞতা, ‘বঙ্গদর্শন’-কে তিনি বলেনঃ
“শুটিং শুরুর আগে বললেন,
তুই খালি হাতে এসেছিস?
আমি তো শুনে ঘাবড়ে গেলাম। ফোনে কথা হয়েছিল নিজের উদ্যোগে বাংলা গানের ইতিহাস নিয়ে একটা আর্কাইভ নির্মাণের কাজ করছি। ওরাল হিস্ট্রি তার একটা বিশেষ জায়গা জুড়ে থাকবে। কোনও সরকারি কিংবা বেসরকারি অর্থ সাহায্য ছাড়াই কাজটা করছি। অনেক কষ্ট করে প্রতিদিনের শুটিংয়ের টাকা জোগাড় করি। আমার কথা শুনে নির্মলার হাসি; বললেন, চাই দুই কাপ কোয়ালিটি-র আইসক্রিম, তবে গান যদি চাও রেকর্ড করতে। ‘টা’ না হলেও চলবে, কথা বলার জন্য কেবল সুন্দর সুন্দর প্রশ্ন চাই। এবার দেরি না করে কাজটা শুরু করে ফেলো।
সেদিন কথা হলো আর সবাই মিলে আইসক্রিমও খাওয়া হলো। সঙ্গে কত গান তৈরির গল্প। এমন মানুষ আর তো খুঁজে পাই না যাঁর জীবন মানেই গান আর গানে গানে জীবন লেখা আছে।”
অরিন্দম সাহা সরদারের সঙ্গে নির্মলা মিশ্র
তথ্যসূত্রঃ
অরিন্দম সাহা সরদার
আনন্দবাজার পত্রিকা
