
একটা লোকগান সমান জনপ্রিয় হয়ে ৫০ বছর পথ হেঁটে এল, এটা খুব সহজ কথা নয়
একথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়। (‘সঙ্গিনী’, শঙ্খ ঘোষ)
একটা লোকগান (Folk Song) সমান জনপ্রিয় হয়ে ৫০ বছর পথ হেঁটে এল, এটা খুব সহজ কথা নয়। আমাদের জীবন আমাদের অস্তিত্ব প্রতি মুহূর্তে হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বেমানান হয়ে পড়ে, আমরা যে যার আপাত স্বস্থানে যেমন অত্যন্ত বেমানান। সেসব বিভ্রান্তির মুহূর্তগুলোয় জীবন যেন প্রশ্ন করে বসে, ‘তুই ইখানে কেনে, হেথাক তুকে মানাইছে নাই গো, ইক্কেবারেই…’।
অরুণ চক্রবর্তী (Arun Chakraborty)। আপনভোলা। স্বভাব বাউল। বরাবরই স্কুলে প্রথম। পেশায় উঁচু পদমর্যাদার ইঞ্জিয়ার ছিলেন। তাঁর বন্ধুরা ফুলওয়ালা, ফলওয়ালা, টিটি, কুলি, পুলিশ অফিসার, জি আর পি, মাস্টারমশাই, মদওয়ালা, আশ্রমিক, বাউল, চাষি, কবি, মাছওয়ালা, সন্ন্যাসী, মাতাল, চোর, আপাত পাগলের দল। চাকরির ফাঁকে ফাঁকে বেড়িয়ে পড়তেন এদিক-ওদিক। বিভিন্ন বাউলের আখড়ায়, লাল মাটির দেশে অথবা অজানা কোনও স্টেশনে। ১৯৭২ সালে শিবপুর বিই কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে অরুণবাবু তখন চাকরীপ্রার্থী। ট্রেকিংও চলছে পাহাড়ে, সমুদ্র সৈকতে আর জঙ্গলে। সেবছরই এপ্রিলের শেষাশেষি নাগাদ একদিন ভরদুপুরে নেমে পড়েছিলেন শ্রীরামপুর স্টেশনে (Serampore Station)। স্টেশন চত্বরে একটি গাছ দেখে থমকে গেলেন। গাছটির নাম মহুয়া। ইংরেজিতে Madhuka Latifolia—যা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা বা মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে পর্যাপ্ত দেখা যায়। এই গাছের সঙ্গে বনবাসী মানুষদের কোথায় যেন একটা আন্তরিক যোগাযোগ আছে। এর পাতার আগুনে ওরা শীত আড়াল করে। ফুলের গন্ধে ভেঙে পড়ে সাগরের ঢেউ, গানে গানে কল্লোলিত হয় অরণ্যনির্জন। এ গাছ ওদের বড়ো আদরের। ওর ফলও ওরা খায়। এই মহুয়া গাছই অরুণবাবুর মননে জন্ম দেয় একটি মাটির কবিতা, পরবর্তীতে যা ৫০ বছর ধরে লোকগান হিসেবে থেকে যাবে বাংলা-বাঙালির হৃদয়জুড়ে।
“এই রকম একটি গাছ শ্রীরামপুর স্টেশনে ঠায় দাঁড়িয়ে দেখেছি। যেখানে শব্দের অসহ্য দামামা। লক্ষ লক্ষ মানুষের তাৎক্ষণিক দাপট নিয়ত। ট্রেনের হাঁসফাঁস। হকারের দাপাদাপি, দূষিত ধুলোর থাবা। অসহ্য দুপুর। টোপা টোপা মহুয়া ফুলের ভারে অলংকৃত দেখে মুহূর্তের মধ্যে আমার অরণ্যের কথা মনে হল। অরণ্যবাসীদের কথা মনে পড়ে গেল।” বলেন অরুণবাবু। শ্রীরামপুর স্টেশনে মহুয়া গাছটি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল গাছটি এখানে ‘মিসফিট’। মনে হয়েছিল ইঁট, কাঠ, পাথরের এ শহরে লাল মাটির গাছ বড়োই বেমানান। সেই ভাবনাই যে একদিন আপামার বাঙালির মন ‘লাল পাহাড়ির দেশে’ টেনে নিয়ে যাবে এমনকি লোকসংগীত ঘরানার চিরকালীন উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে, তা তিনি টের পাননি।
মাথায় লাল ফেট্টি, পকেটে লজেন্স আর মুখে ‘জয় গুরু’। এটাই কবি অরুণ চক্রবর্তী। তিনি মানুষের জন্য কবিতা লেখেন। মনে করেন, কবিতার মধ্যে এমন একটা শক্তি আর সততা আছে যা পৃথিবীর মঙ্গল করে।
“আদিবাসী আঞ্চলিক মানুষের মুখ মনে করে, তাদের গান, নাচ, পায়ে পায়ে ভেঙে যাওয়া হাজার ঢেউ, তাদের সহজিয়া জীবন যাপন…সব মিলিয়ে একটা উচ্চারণ ‘হাই দ্যাখো গো…তুই এখানে কেনে, লাল পাহাড়ির দ্যেশে যা, রাঙা মাটির দ্যেশে যা’।” বলেন লালপাহাড়ি গানের গীতিকার-কবি।
মাথায় লাল ফেট্টি, পকেটে লজেন্স আর মুখে ‘জয় গুরু’। এটাই কবি অরুণ চক্রবর্তী। তিনি মানুষের জন্য কবিতা লেখেন। মনে করেন, কবিতার মধ্যে এমন একটা শক্তি আর সততা আছে যা পৃথিবীর মঙ্গল করে। অরুণবাবুর কথায় “মানুষের জন্য লিখি। মানুষ ভালোবেসেছে ৫০ বছর ধরে। আরও বাসবে কারণ এর মধ্যে একটা কথা লুকিয়ে আছে—হেথাক তোকে মানাইছে নাই রে। যেখানে তোমার জায়গা নেই, সেই জায়গাটা তোমার জন্য নয়। সারা পৃথিবী জুড়ে এত অশান্তি, আতঙ্কবাদ, মারামারি, খুনোখুনি, অহংকার। যদি সত্যি সত্যিই মানবিকতার অধিকারি হতো মানুষ, সব মানুষের ভিতর যদি মানবিকতা প্রতিষ্ঠিত হতো তাহলে এসবের কোনও জায়গাই থাকতো না। তাই ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষের থাকাটা প্রয়োজন। মহাশ্বেতা দেবী কবিতা পড়তেন না কিন্তু আমার লাল পাহাড়ির দ্যেশে যা খুব পছন্দ করতেন। গুনগুন করে গাইতেনও।”
ভি বালসারার হাত ধরে গান হয়েছিল কবি অরুণ চক্রবর্তীর লালপাহাড়ি কবিতা। সুর করেছিলেন সুভাষ চক্রবর্তী। ১৯৭৩-৭৪ সালেই সুরারোপণের কাজ হয়ে যায়। তা মঞ্চে মঞ্চে গেয়ে বেড়ান সুভাষবাবু। খনি অঞ্চলে, সাঁওতাল পাড়ায়। ভি বালসারাজি তখন ইনরেকো (কলকাতার অক্রুর দত্ত লেন) কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। সুভাষবাবুর মুখে গান শুনে বেশ চমকে গিয়েছিলেন। নতুনত্বের স্বাদ পেয়েছিলেন। ফোকগানের একটা বাজার আছে, মানুষ শুনতে চায় তার উপর কোম্পানির খুব একটা ক্ষতি হবে না মনে করে তিনি রাজি হয়ে যান। Extended Play (E.P), 45 r.m.p সারা বাংলা, আসাম, ত্রিপুরায় হইচই পড়ে যায়। হু হু করে বিক্রি হতে থাকে রেকর্ড। দেশ-এ, আনন্দবাজারে, অমৃত পত্রিকায়, যুগান্তরে ভূয়সী প্রশংসা ছাপা হয়। আখড়ায়, সভায়, সমিতিতে, মাউন্টেনিয়ারিং ক্যাম্পে ক্যাম্পে, কবিতার আড্ডায় শোনা যেত এই গান।
লোকাল ট্রেন থেকে বাংলা ব্যান্ড এখনও এই সুরে মাতোয়ারা। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হতে চলেছে লালপাহাড়ি কবিতা।
অনেক সময় দেখা যায় কোনও লোকগান তুমুল জনপ্রিয় কিন্তু তার গীতিকারের নাম আমরা জানি না। লাল পাহাড়ি গানের সঙ্গেও এরকমটা ঘটেছিল। আমরা জানি বাংলা ব্যান্ড ‘ভূমি’ এই গানটি রেকর্ড করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গীতিকারের নাম উল্লেখ না করায় শুরু হয়েছিল বিতর্ক। ‘‘এক অনুষ্ঠানে বাসুদেব বাউল গাইছিলেন ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা’। আমরা ‘ভূমি’-র সবাই ওই অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। গানটা এত ভালো লেগেছিল, রেকর্ড করে নিই। এর পর কোচবিহার যাচ্ছিলাম অনুষ্ঠান করতে, ট্রেনে একজন বাউল উঠলেন। উনিও সে দিন 'লাল পাহাড়ি' গাইছিলেন, সঙ্গে ছিল ‘ও নাগর’। সে দিনই আমরা ঠিক করি, গানটা রেকর্ড করব। কিন্তু, তখন গীতিকারের নাম জানতাম না। তাই উল্লেখ করিনি। ভুল করেছিলাম। পরে অরুণদার কাছে ক্ষমাও চেয়েছি’’ গান নিয়ে বিতর্ক প্রসঙ্গে এক সংবাদপত্রে একথা জানিয়েছিলেন ‘ভূমি’র সৌমিত্র।
লোকাল ট্রেন থেকে বাংলা ব্যান্ড এখনও এই সুরে মাতোয়ারা। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হতে চলেছে লালপাহাড়ি কবিতা। ‘সহজিয়া ফাউন্ডেশন’ গত ৮ জুলাই রবীন্দ্র সদনে সম্মান জানায় ‘লালপাহাড়ি’র স্রষ্টাকে। ঝুমুর গায়ক সুভাষ চক্রবর্তীকেও সম্মান জানানো হয় ওই দিন। উপস্থিত ছিলেন সংগীত জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব।
তথ্যসূত্রঃ
অরুণকুমার চক্রবর্তীর অন্য ভাবনা কবিতার জন্মবিজ্ঞান, একটি কবিতার অনুষঙ্গ
অরুণ চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার (News 18 Bangla, TV9 Bangla)
আনন্দবাজার পত্রিকা
