
সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের অভিনব উদ্যোগ
পশ্চিমবঙ্গ বনদপ্তরের এক অভিনব উদ্যোগের ফলে সম্প্রতি সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পে পা রাখল ৯০টি চিতল হরিণ। হরিণগুলির জন্ম ও বেড়ে ওঠা উত্তর চব্বিশ পরগনার বিভূতিভূষণ ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে। কলকাতা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার এবং বনগাঁ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই স্যাংচুয়ারিটি আগে পারমাদন ফরেস্ট নামে পরিচিত ছিল। ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যটির বিস্তৃতি ৬৮ হেক্টর। ১৯৬৪ সালে মাত্র ১৪টি চিতল হরিণকে নিয়ে শুরু হয়েছিল পারমাদনের পথচলা। বর্তমানে হরিণ ছাড়াও নানান প্রজাতির পাখি, খরগোশ ও লেঙ্গুরেরা বাস করে এই অভয়ারণ্যটিতে। কাছেই রয়েছে একটি চিল্ড্রেন্স পার্ক, একটি ছোটো চিড়িয়াখানা এবং বনদপ্তরের জন্য সংরক্ষিত একটি ট্যুরিস্ট লজ।
পারমাদনের মতো ক্ষুদ্র অভয়ারণ্যের পক্ষে এতগুলি পূর্ণবয়স্ক হরিণের থাকবার জায়গা করে দেওয়া সম্ভব হয়নি। সুন্দরবন ব্যাঘ্র প্রকল্পের ফিল্ড ডিরেক্টর অজয় দাস বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “এই ঘটনা নতুন নয়। ছোটো অভয়ারণ্যগুলি থেকে নিয়মিতই প্রাণীদের নিয়ে যাওয়া হয় বড়ো অভয়ারণ্যগুলিতে। মূলত ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’র কথা মাথায় রেখে এই পদক্ষেপ নেয় বন কর্তৃপক্ষ।” ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’ বলতে বোঝায়, একটি বিশেষ স্থান (এ ক্ষেত্রে অভয়ারণ্য) ঠিক কী পরিমাণ মানুষ বা প্রাণীকে জায়গা করে দিতে পারে। পারমাদনের মতো অপেক্ষাকৃত ছোটো অভয়ারণ্যগুলির ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’ খুব দ্রুত উপচে পড়ে, যার ফলে বাড়তি প্রাণীগুলির জন্য খাদ্য ও স্থান সংকুলান করা কঠিন হয়ে যায়।
অজয় দাস আরও জানান, “অ্যাক্সিস ডিয়ার বা স্পটেড ডিয়ার বা চিতল হরিণদের সংখ্যা অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আর তাই জন্যই এইবার অতিরিক্ত ৯০টি হরিণকে পারমাদন থেকে পাঠানো হল সুন্দরবনে।”
অজয় দাস আরও জানান, “অ্যাক্সিস ডিয়ার বা স্পটেড ডিয়ার বা চিতল হরিণদের সংখ্যা অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আর তাই জন্যই এইবার অতিরিক্ত ৯০টি হরিণকে পারমাদন থেকে পাঠানো হল সুন্দরবনে।” তবে শুধুমাত্র এই একটি বিষয়ই নয়। ‘ক্যারিং ক্যাপাসিটি’র পাশাপাশিই মাথায় রাখা হয়েছে ‘প্রে বেস অগমেন্টেশন’-এর উদ্দেশ্যটিকে। একটি বিশেষ অভয়ারণ্যের ‘প্রে বেস’ কতটা শক্তিশালী, তার উপর নির্ভর করে সেই অরণ্যে বসবাসকারী মাংসাশী প্রাণীরা কী পরিমাণে শিকার পাবে। অভয়ারণ্যটির মাংসাশী প্রাণীদের সংখ্যা কী হারে বৃদ্ধি পাবে, তা মূলত নির্ভর করে সেখানের ‘প্রে বেস’-এর উপরেই।
তাদের আতঙ্কিত না করে স্বাভাবিক পদ্ধতি অবলম্বন করেই হরিণগুলিকে বন্দি করা হয় প্রাথমিক ভাবে, তারপর টানেল-সদৃশ ঘেরাটোপের সাহায্যে তোলা হয় ট্রাকে। খেয়াল রাখা হয়, ট্রাকে করে পরিবহনের সময়ে যাতে কোনোরকম শারীরিক ক্ষতি না হয় এই প্রাণীদের।
এই কাজের জন্য পারমাদনকেই কেন বেছে নেওয়া হল, তার পিছনে কী বিশেষ কোনো কারণ রয়েছে? অজয়বাবু জানান, “শুধুমাত্র পারমাদন নয়। বেথুয়াডহরি ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি, গড়চুমুক ডিয়ার পার্ক এবং বল্লভপুর ডিয়ার পার্ক থেকেও প্রায়ই বাড়তি সংখ্যক হরিণদের বড়ো রিজার্ভ ফরেস্টগুলিতে পাঠানো হয়। কয়েক মাস আগে নদিয়ার বেথুয়াডহরি থেকে বেশ কিছু সংখ্যক হরিণকে উত্তরবঙ্গের মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারিতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। সম্প্রতিই আবার ৮৬টি চিতল হরিণ বীরভূমের বল্লভপুর ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারী থেকে যাত্রা করে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের উদ্দেশে।”
তাদের আতঙ্কিত না করে স্বাভাবিক পদ্ধতি অবলম্বন করেই হরিণগুলিকে বন্দি করা হয় প্রাথমিক ভাবে, তারপর টানেল-সদৃশ ঘেরাটোপের সাহায্যে তোলা হয় ট্রাকে। খেয়াল রাখা হয়, ট্রাকে করে পরিবহনের সময়ে যাতে কোনোরকম শারীরিক ক্ষতি না হয় এই প্রাণীদের। তাছাড়াও, সুন্দরবনের আবহাওয়া পারমাদনের চাইতে খানিকটা আলাদা, ফলে এই নতুন জলবায়ুতে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় দরকার হবে হরিণগুলির। তাই আনা মাত্র রিজার্ভ সংলগ্ন জঙ্গলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়নি। আপাতত তাদের জায়গা হয়েছে দোবাঁকিতে অবস্থিত একটি ঘেরা এলাকার মধ্যে। আশা করা যায়, আগামী তিন মাসের মধ্যে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে হরিণগুলি। তারপরই তাদের মুক্ত করা হবে সুন্দরবনের ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্যে।
