নট্ট কোম্পানির যাত্রাশিল্পী দয়াময় কর্মকার, বাকি জীবন কাটাতে চান সংগীত চর্চায়

যাত্রা তো এখন প্রায় নেই, ফলে সংগীতকেই তিনি আঁকড়ে ধরেছেন

কসময় তিনি বিখ্যাত যাত্রাশিল্পী বসন্ত চৌধুরী এবং স্বপনকুমারের সঙ্গে যাত্রা করেছেন। নট্ট কোম্পানির নিয়মিত যাত্রাশিল্পী ছিলেন। ‘নবাব সিরাজদৌল্লা’, ‘রক্তে রাঙা পলাশি’-সহ আরও অনেক যাত্রাপালায় তিনি অভিনয় করেছেন। বহু যাত্রায় তিনি বিবেকের অভিনয় করতে গিয়ে নিজের গলায় গান ধরেছেন, “ওগো ভগবান দাও গো আমায় শুকনো রুটি, ভিজিয়ে নেবো চোখের জলে…”। শিলিগুড়ি শহরের সেই যাত্রাশিল্পী দয়াময় কর্মকার এখন ৬৮ বছর বয়সে শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে সংগীত চর্চার প্রসারে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন।

শিলিগুড়ি শহরের পরেশ নগরে বাড়ি যাত্রা ও সংগীত শিল্পী দয়াময় কর্মকারের। যাত্রা তো এখন আর নেই। ফলে সংগীতকেই তিনি বেশি করে আঁকড়ে ধরেছেন। উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল লাগোয়া ছোটপথু গ্রামে তিনি এক চিলতে জমি নিয়েছেন। সেখানে গড়তে চান লোকনাথ বাবার মন্দির এবং অনাথ আশ্রম। আর সেই স্থানেই তিনি স্থানীয় রাজবংশী-সহ অন্যান্য সকলকে বিভিন্ন সংগীতের তালিম দিয়ে চলেছেন। মূলত ভক্তিমূলক সংগীতই তিনি বেশি পরিবেশন করেন। লোকনাথ বাবার ওপর বিশেষ নামগান তিনি তৈরি করেছেন। আর এজন্য মুম্বাইতে গিয়েও অনুষ্ঠান করে এসেছেন। দয়াময়বাবু বলেন, “বহু যাত্রা করেছি। এমনকি সিনেমাতেও অভিনয় করেছি। অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘গোলমাল’ ছবিতে সাইড রোলও করেছি। বেশ কিছু রাজবংশী সিনেমাতেও অভিনয় করেছি। সারা জীবন সংগীত চর্চা করেছি। শিলিগুড়িতে এখন বাড়িঘর পুত্র সন্তানদের হাতে তুলে দিয়ে গ্রামে চলে এসেছি। গ্রামের প্রতিভা এখন তৈরি করতে চাই।”

প্রকৃতপক্ষে রায়গঞ্জের বাসিন্দা দয়াময়বাবু। ছোটো থেকেই সংগীতের আবহে বড়ো হওয়া। ঠাকুরদা, বাবা সকলেই সংগীত চর্চা করতেন। সেই থেকেই তাঁর নেশা শুরু হয়। পরে নিজেই ভক্তিমূলক সংগীত রচনা করে তাতে সুর দিতে থাকেন। বিয়ের আগে ও পরে সেই সংগীতই হয়ে পড়ে তাঁর মূল পেশা ও নেশা। তার পাশাপাশি ১৯৬৯-১৯৭০ সালে যাত্রাপালাতে অভিনয় শুরু করেন। যাত্রাশিল্পী হিসাবেও বিশেষ সুনাম অর্জন করেন। 

দয়াময়বাবু বলেন, একটা সময় কালীপুজোর পরপর শীত আসতে আসতেই মফস্‌সল শহর থেকে গ্রামে যাত্রাগানের আসর বসতো। ত্রিপল, খড় বিছিয়ে দেওয়া হত যাত্রা মঞ্চের সামনে। তার মধ্যে বসে অনেক রাত পর্যন্ত যাত্রা দেখার উদ্দীপনা থাকতো। এখনকার ছেলেমেয়েরা সেসব চাক্ষুষ করেনি। তাঁর বক্তব্য, “যাত্রা চলাকালীন আমি বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করার সময় গান গাইলে দর্শকাসন থেকে বহু মানুষ মঞ্চে উঠে এসে জড়িয়ে ধরতো। সেটাই ছিল বড়ো পুরস্কার।”

এখন ছোটপথুর গ্রামে গান শেখানোর সময় চাষের ধানি জমিতে গিয়েও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাচ্ছেন তিনি। বলছেন, “আমার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে কিছুদিন আগে। ছেলেদের বড়ো করেছি। এখন গ্রামের মধ্যে সংগীত চর্চার প্রসারে সময় দিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চাই।” 

Developed by DXDasia