
১৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার ‘মহীন অন্তহীন’ আয়োজন করেছে প্রেসিডেন্সি
২০২২ সালের বড়োদিনের সন্ধে, উৎসবমুখর কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে দেশপ্রিয় পার্ক সেদিন দেখেছিল প্রাণশক্তি কাকে বলে! মঞ্চে তখন এক ৬৮ বছরের ‘তরুণ’ নাকে রাইলস্ টিউব নিয়ে, চেয়ারে বসে তাঁরই লেখা “ভালোবাসি জোৎস্নায় কাশবনে ছুটতে” গানে গলা মেলাচ্ছেন নবীন প্রজন্মের সঙ্গে। সকলকে যেন বুঝিয়ে দিচ্ছেন অসুস্থতাটার গণ্ডিটা ওই শরীর অবধিই, কর্কট রোগ কোনোভাবেই ছুঁতে পারেনি তাঁর মনকে; যৌবনে দিন বদলের স্বপ্ন দেখলে সেই স্বপ্নকে আজীবন বুকে আগলে রাখা যায়, চোখে চোখ রেখে চ্যালেঞ্জ জানানো যায় কঠিনতম অসুখকেও।
কে এই আশ্চর্য তরুণ? সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আধুনিক বাংলা গানের ধারাকে যাঁরা প্রতিবাদের ভাষা, মত প্রকাশের মাধ্যম হিসাবে ভেবেছিলেন, তিনি সেই ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-র অন্যতম আদি ঘোড়া তাপস বাপি দাস। ফুসফুসে ক্যান্সার আক্রান্ত হলেও তাঁর জীবনীশক্তিই ক্রমাগত অক্সিজেন জুগিয়ে চলেছে তাঁর সমসাময়িক এবং পরবর্তী প্রজন্মকে। সেই অক্সিজেন বুকে নিয়েই, তাঁর চিকিৎসার আর্থিক সুবিধার্থে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি শনিবারের দুপুরে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইকন’ (ICON) আয়োজন করেছে ‘মহীন অন্তহীন’। যেখানে তাপস বাপি দাসের চিকিৎসার জন্য একই মঞ্চে মিলিত হবেন বিভিন্ন সময়ের শিল্পীরা।
‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র আরও এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় অর্থাৎ বুলাদা, আশির দশকের ব্যান্ড ‘নগর ফিলোমেল’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইন্দ্রজিৎ সেন, প্রবুদ্ধ বন্দোপাধ্যায়ের পাশাপাশি ‘চন্দ্রবিন্দু’র অনিন্দ্য-উপল, ‘ক্যাকটাস’ এর সিধু, সাম্প্রতিক সময়ের গানের দল ‘বর্ণ অনন্য’ এবং আব্রাহাম মজুমদার, পরমা, রূপঙ্কর, গাবু, দেবদীপ, পরশপাথর ব্যান্ড উপস্থিত থাকবেন। থাকবেন বাপিদার হাতে গড়া দল ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’র সদস্যরা। এছাড়া আরও অনেক শিল্পীরা মঞ্চে উঠবেন গানকে ভালোবেসে-বাপিদা-কে ভালোবেসে। সংগীত শিল্পীদের পাশাপাশি ১৮ তারিখ উপস্থিত থাকবেন লেখিকা হৃষিতা দে। যিনি লিখেছেন বাপিদার জীবনী ‘Reincarnation of the Dark Stallion’। বইটি ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। এছাড়াও লাইভ পেইন্টিং করবেন শিল্পী হিরণ মিত্র।
তাঁর চিকিৎসার আর্থিক সুবিধার্থে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি শনিবারের দুপুরে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘আইকন’ (ICON) আয়োজন করেছে ‘মহীন অন্তহীন’। যেখানে তাপস বাপি দাসের চিকিৎসার জন্য একই মঞ্চে মিলিত হবেন বিভিন্ন সময়ের শিল্পীরা।

এই অনুষ্ঠানের বিষয়ে বঙ্গদর্শন.কমের পক্ষ থেকে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম ‘নগর ফিলোমেল’ ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক প্রবুদ্ধ বন্দোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছেন, “বাপিদার জন্য প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাই এই বিরাট কনসার্ট আয়োজন করেছে, তিনটি স্লটে বিভিন্ন সময়ের শিল্পীরা সেদিন মঞ্চে পারফর্ম করবেন।” তিনি আরও জানিয়েছেন, তাঁদের স্লটের দায়িত্ব নিয়েছেন সিধু, সিধুর সঙ্গে আছেন তাঁরই ‘জার্নি উইথ সিধু’র তরুণ সদস্যরা। প্রবুদ্ধবাবু আরও জানিয়েছেন, এদিন মঞ্চে নতুন প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের পাশাপাশি অনেকবছর তিনি পারফর্ম করবেন ‘নগর ফিলোমেল’ ব্যান্ডের আরও এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ইন্দ্রজিৎ সেনের সঙ্গে। এবং এত বছর পর যখন এই জুটি মঞ্চে পারফর্ম করবেন, তখন সেই যুগলবন্দির শরিক হতে এই সময়ের অনেক জনপ্রিয় শিল্পীরা স্বতস্ফূর্তভাবে মঞ্চে গলা মেলাতে চেয়েছেন, শিল্পীদের এই স্বতস্ফূর্ততা তাঁকে আপ্লুত করেছে।
ইন্দ্রজিৎ সেন অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে একটি ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে আমাদের (নগর ফিলোমেলের) শোয়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আবার ফিরছি। ৩৮ বছর পর। মহীনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বাপিদা এই মুহূর্তে পিজি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। কয়েকজন উদ্যমী এবং সহমর্মী পড়ুয়া রকস্টারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এক ফান্ডরেইজিং কনসার্টের আয়োজন করেছেন। তাঁদের আবেগ দেখে সত্যিই মুগ্ধ আমি।”
প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকন-এর সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী বরিষণ রায় ‘মহীন অন্তহীন’ সম্পর্কে বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “মহীনের ঘোড়াগুলির সূচনা হয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজে, কারণ দলের মুখ্য প্রতিষ্ঠাতা গৌতম চট্টোপাধ্যায় নিজেই ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র এবং সেজন্যই মহীনের ইতিহাসের সঙ্গে প্রেসিডেন্সি জড়িয়ে আছে। তাই মহীন বারবার ঘুরেফিরে এসেছে প্রেসিডেন্সিতে। এমনকি তাপস বাপি দাসের হাতেই গঠিত ‘মহীন এখন ও বন্ধুরা’ কোভিডের পরেও প্রেসিডেন্সি কলেজে এসে অনুষ্ঠান করে গেছে, যেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং বাপি দাস। সেই জায়গা থেকেই আমাদের মনে হয়েছে ওঁর জন্য কিছু করা আমাদের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা।”
শিল্পী তাপস বাপি দাসের স্ত্রী সুতপা ঘোষ জানিয়েছেন, “স্বেচ্ছায় এত মানুষ বাপির পাশে দাঁড়িয়েছেন দেখে বুঝতে পারছি ওঁকে কত মানুষ ভালোবাসেন। সকলে মিলে আমরা যেন বৃহৎ পরিবার, যারা একসঙ্গে ওর আরোগ্য কামনায় লড়াই করছি।”
আসলে সংবেদনশীল মনই শিল্পের উর্বর ভূমি। আর উর্বরতা পেরিয়ে যায় দেশ-কাল-সীমানার গণ্ডি। তাই সত্তরের দশকের সামাজিক অস্থিরতা নাড়া দিয়েছিল যে তরুণদের হৃদয়ে, যাঁরা তাঁদের অন্যরকম ভাবনা, লেখনী, কণ্ঠ আর বাদ্যযন্ত্রকে করে তুলেছিলেন বিপ্লবের হাতিয়ার, আজ সেই পথিকৃৎ দলেরই একজন যখন এসএসকেএম হাসপাতালের বেডে লড়াই করছেন মারণ রোগের সঙ্গে, তখন তাঁর সমসাময়িক এবং পরবর্তী প্রজন্ম গানকে সঙ্গী করেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত হয়েছে শিল্পীর সঙ্গে-শিল্পীর পরিবারের সঙ্গে। শিল্পী তাপস বাপি দাসের স্ত্রী সুতপা ঘোষ আমাদের জানিয়েছেন, “স্বেচ্ছায় এত মানুষ বাপির পাশে দাঁড়িয়েছেন দেখে বুঝতে পারছি ওঁকে কত মানুষ ভালোবাসেন। সকলে মিলে আমরা যেন বৃহৎ পরিবার, যারা একসঙ্গে ওর আরোগ্য কামনায় লড়াই করছি।”
আসলে সুদিনের অপেক্ষায় আমরা সকলেই। আমরা ভালোবাসি শিল্পীকে, তাঁর লড়াকু স্বভাবকে। তাই প্রবুদ্ধ বন্দোপাধ্যায় বলেছেন, “প্রেসিডেন্সির ছাত্রছাত্রীদের এই প্রয়াস মহৎ প্রয়াস, তবে এটাও সত্যি কার কাকে দরকার আমি জানি না, মানে বাপিদার আমাদের দরকার নাকি মনের জোরের জন্য আমাদের বাপিদাকে দরকার?”
তবে দরকার যার যাকেই থাক, শেষ পর্যন্ত জয়ী হোক সংগীত, জয় হোক মানবিকতার। সফল হোক এই বিশাল আয়োজন। কাছে আসুক সেই সুদিন, যেদিন হাসপাতালের বেডে নয়, এইরকম বিরাট অনুষ্ঠানে তাপস বাপি দাস আবার গান গাইবেন, ফিরবেন ভালোবাসার মঞ্চে। বঙ্গদর্শনের পক্ষ থেকে সকলেই তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।
