‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র মতো ‘নগর ফিলোমেল’ও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তবে ভাঙেনি

মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি — পর্ব ৯

গত পর্বে

আহা! মফস্‌সল বলে করুণা করার মতো কিছুই নেই। কলকাতা আমাদের কাছে ওই একই প্রতিক্রিয়া দেখাত। আশেপাশের পাড়ার বাচ্চারা ঢিল ছুঁড়ে মারত। উস্কানি থাকত, কিন্তু অন্ধকারে লুকিয়ে। কিছু করার থাকত না। শুধু মাথার মধ্যে ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকত। বিশেষ করে আমার আর মণিদার, প্রায় কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল, একগান দাড়ি, হাঁটু ছেঁড়া জিনস…।

খবরের কাগজে রিভিউ বেরত, “বাঙালি যুবকদের বখে যাওয়ার চেষ্টা।”

পর্ব – ৯

‘স্টেটসম্যান’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী ইংরেজি দৈনিকে তখনকার নামজাদা ধরণী ঘোষ (নাটক, সংগীতের ধারক-বাহক) লিখলেন, অনুষ্ঠানে সানাইটা বেমানান লাগছিল। আসলে অনুষ্ঠানে সানাই যন্ত্রটার উপস্থিতিই ছিল না। আমি ওই অনুষ্ঠানে ক্ল্যারিনেট বাজিয়েছিলাম। সমালোচক প্রথম সারিতে বসেও যন্ত্রটা চিনে উঠতে পারেননি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি। ক্ল্যারিনেটে Key থাকে, সানাইতে ফুটো থাকে। এইসব দুষ্টের দমন করার জন্য আমাদের একটাই অস্ত্র ছিল, সেটা হল জেদ। তাই ইন্টারন্যাশনাল জ্যাজ ফেস্টিভ্যালে, ক্যালকাটা চ্যাপ্টারে একমাত্র মহীনের ঘোড়াগুলি আমন্ত্রিত হয়েছিল (১৯৭৯ বা ৮০ ঠিক মনে নেই)।

কলকাতায় যদিও তথাকথিত জ্যাজ প্লেয়াররা ছিল লুই ব্যাঙ্ক, কার্লটন কিটো আরও কেউ কেউ। আমাদের জ্যাজ ছিল বাউল জ্যাজ। বাউল জ্যাজ কেন? বা জ্যাজ মিউজিক বিষয়টা কী, সেটা নিয়ে বিশদ লেখার ইচ্ছে এই প্রবন্ধে নেই৷ কারণ বাঙালি শ্রোতাদের মাথার ত্রিশ হাজার ফুট উঁচু দিয়ে ব্যাপারটা উড়ে চলে গেছিল। বাক্যটা পড়ে ঔদ্ধত্যের কথা ভাববেন না, আমি এসব চল্লিশ বছর আগের কথা বলছিলাম। মূলত পেশাগত কারণেই মহীনের ঘোড়াগুলির আংশিক বিচ্ছিন্নতা (দল ভেঙে যাওয়া শব্দ/বাক্য ব্যবহার করলাম না)। ১৯৮২ সালে মহীনের ঘোড়াগুলির পরমপ্রেমে পড়ার পরে জিতি (অভিজিৎ অধিকারী) একটা গানের দল তৈরি করে, নাম ‘এক্কা’। বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেনি। এরপর ১৯৮৪ সালে দেবু (দেবজ্যোতি মিশ্র) মহীনের ঘোড়াদের গানে উৎসাহিত হয়ে একটা অসাধারণ ক্যাসেট প্রকাশ করে৷ নাম বাইসাইকেল। জনতা মোটেই কানে তুলল না। এরপর সদর্থে বাংলা ব্যান্ড বলতে যা বোঝায়, মহীনের ঘোড়াগুলির পর ১৯৮৬ সালে তেমনই একটা ব্যান্ড এল। নাম ‘নগর ফিলোমেল’।

বিজনের চায়ের কেবিন | নগর ফিলোমেল

এইচএমভি থেকে একটা ক্যাসেটও প্রকাশ পেল (অবশ্যই আমন্ত্রিত হয়ে)। ভয়ংকর প্রত্যাশা আমাদের মতো শ্রোতাদের। শুধু সমকালীনই নয়, অত্যাধুনিকও বটে৷ নিজেদের লেখা, সুর আর বেস গিটারটা সত্যিই ফিলোমেল। ওইরকম ব্যালেন্সড অ্যারেঞ্জমেন্ট আমি আজও খুব কম শুনেছি। রক মিউশিয়ানসদের বাদ দিয়ে বললা। প্রসঙ্গত, আমাদের ১৯৭৭ সালে যে টেকনিক্যাল পরিসরে রেকর্ড করতে হয়েছিল, সেদিক থেকে ওরা বোধকরি একটু প্রিভিলেজড।

নগর ফিলোমেল | আমরা গান গাই যে সুরে

মহীনের মতো ওরাও একইভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তবে ভাঙেনি। প্রবুদ্ধ (ব্যানার্জি) এখনও কলকাতার সেরা সংগীত পরিচালকদের একজন, নিয়মিত কাজ করে চলেছে। অমিত-ও (দত্ত) তাই। ইন্দ্রনীল সেন বলাই বাহুল্য আজও মূল স্রোতের একজন জনপ্রিয় গায়ক। সুরেলা মিষ্টি কণ্ঠস্বর। ওঁদের দলে ছিল গৌতম নাগ, ইন্দ্রজিৎ সেন, রিমলি সেনগুপ্ত, সৌগত ব্যানার্জি এবং আরও কেউ কেউ ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে আমার কখনও আলাপ হয়নি। যাই হোক, মহীনের ঘোড়াগুলির পর এই দ্বিতীয় ব্যান্ড (যারা অলিখিতভাবে শ্রোতাদের দীক্ষিত করতে পেরেছিল)। তারা কোথায় গেল? Where’re all those flowers gone?

 মণিদা এসেছিল চাকরি ছেড়ে দিয়ে। আমি এসেছিলাম চাকরি ছেড়ে দিয়ে। দু’জনেই বেচুবাবু। মণিদা মেডিক্যাল, আমি কনজিউমার গুডস। ও ভূপালে, আমি বম্বেতে। কিন্তু কোথায় ফিরে এসেছিলাম? ঘরে?

“আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে
দুয়ার কাঁপে ক্ষণে ক্ষণে
ঘরের বাঁধন যায় বুঝি আজ টুটে…”

কিন্তু কী হল? কিন্তু কী হল? কথাটা দুইবার লিখলাম— আবার এই কথাটা লিখতে বাধ্য হব ১৯৯৯ সালে মণিদার মৃত্যুর কিছু সময় পরে।

(চলবে…)

Developed by DXDasia