
দুই বাংলার মুর্শিদ সাধকরা এখনও নিজেদের মতো করে নিভৃতে সাধনা চালিয়ে যান
“ও তুমি আইসরে দয়াল আমার মুর্শিদরে।/ সবে বলে মুর্শিদ হাবে মুর্শিদ/ মুর্শিদ কেমন জনা।”
মুর্শিদ কেমন জনা, এ উত্তর সকলের জানার নয়। যারা এখনও বাংলার নিজস্ব সুর-ভাষার শিকড় সন্ধান করেন তাঁরা জানবেন। তা জানতে-বুঝতে পৌঁছাতে হয় আকারহীন আত্মজার কাছে। অবিভক্ত বাংলার বাতাসে ঘুরে বেড়াত এই সুর-ভাষা… মুর্শিদা গান। “এ যেন বোবার ভাষা— সব কথা স্পষ্ট হয়ে উঠে নাই। কিন্তু কথায় যাহা প্রকাশ পায় নাই সুরে তাহা প্রকাশ পাইয়াছে”। মুর্শিদা গানের এমন ভাবার্থই খুঁজে পেয়েছিলেন কবি জসীমউদ্দীন। এমনই কথা, এমনই সুর যা ঘুটঘুটে তমশার ভিতর মানুষের মনে আলো জ্বালিয়ে রাখত, জাগিয়ে রাখত। জনপ্রিয়তা বলতে আমরা এখন যা বুঝি, তা এ গানের নেই। এ গান ভিড়ের নয়, নিভৃতচারী। যে সব চরে হুট করে চলে যাওয়া যায় না। বাংলার অপার প্রকৃতির আনাচে কানাচে সেইসব চরে এখনও খুঁজলে পাওয়া যায় মুর্শিদ-সাধকদের আর মুর্শিদা গান।
কন্টেম্পোরারি গানের জগতে চর্চা এবং প্রচারের নিরিখে মুর্শিদা গানের প্রসঙ্গ খুবই সীমিত, সর্বসাধারণের কাছে তা পৌঁছায় না। অনেকে আবার মুর্শিদা গান আর বাউল গান এক করে ফেলেন। মুর্শিদা গান মুখের ফেরে মুর্শিদি গান নামেও পরিচিত। এই গান মুর্শিদকে ঘিরেই। মুর্শিদ মানে গুরু, পথপ্রদর্শক। যে গানে গুরুর প্রতি ভক্তের আত্মনিবেদন, প্রশংসা থাকে তা-ই মুর্শিদা গান। আর বাউল গান এক রকমের তত্ত্বমূলক গান। সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, নবীতত্ত্ব, নারীতত্ত্ব এসব নিয়েই বাউল গানের কারবার। তান্ত্রিক সহজিয়া এবং বৈষ্ণব সহজিয়াদের কাছ থেকে বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত তত্ত্ববস্তুর সঙ্গে সুফি তত্ত্ববস্তু মিলেমিশে বাউল গানে এক জটিল তত্ত্ববস্তুর সমন্বয় ঘটেছে। এইসব বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করে গুরুর উপদেশ অনুসারে বাউলরা সাধনা করে। আগে বাংলাদেশে বিচার গান, লাউয়া গান অথবা মারফতি গান নামেও পরিচিতি পেত বাউল গান। বস্তুতঃ পূর্ববাংলার বাউলেরা বা সাঁই দরবেশেরা মুর্শিদা ফকিরদের ঠাট্টা করে গান বাঁধত—
“যদি ভজবিরে লা সরিকালা/ কেন ঘুরে বেড়াও দরগাতলা/ বুঝি খাবিরে নৈবিদ্যি কলা/ করছাও এইটা ফিকিরি”।
মুর্শিদার আসর
কিন্তু এক জায়গায় বাউল ও মুর্শিদ ফকিরদের মত মিলে যেত। এই পৃথিবী যে অনিত্য, এখানে কিছুই যে চিরস্থায়ী নয় এ কথা বাউল ও মুর্শিদ ফকির দুই সম্প্রদায়ই বলে।
“দুবুলার শিষে যেমন নিহারের পানি/ কোনজনা বেঈমানে কইছে এই দেহ হাপনি।”
একথা মুর্শিদ ফকির যেমন বলে তেমনি বাউল কবির গান—
“সাধের ময়না যেদিন উড়ে যাবে/ খালি খাঁচা পড়ে রবে রে পড়ে রবে।”
সেকালে ফরিদপুরের পাগলা কানাই-এর গান শুনে জলধর সেন তাঁর ‘বাঙাল হরিনাথ’ গ্রন্থের প্রথম ভাগে বলেছিলেন, সবগুলো গানই অনিত্যতা বিষয়ক। বাউল গানের প্রধান উদ্দেশ্য নিজেদের গোষ্ঠীর গোপনতত্ত্ব আকারে ইঙ্গিতে প্রকাশ করা। যেখানে বাউলরা তর্ক করে, বিচার করে, সেখানে মুর্শিদ ফকিরেরা ভাবে বিভোর হয়ে গান গায়।
“তোর নাম ভরসা কইরা/ দইরাই দিলাম ঝাপ।”
রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বহু চিন্তাশীল মানুষই বাউলদের কবি বলে মানতেন, আবার অনেকের মতে বাউলরা কবি নন। তার্কিক, দার্শনিক, যুক্তিবাদী। কিন্তু মুর্শিদপন্থী ফকিরেরা প্রকৃত অর্থেই কবি, তাঁরা অত তত্ত্ববস্তু বোঝেন না। চোখের জলে নিজ মনের মানুষের সন্ধান করাই তাঁদের উদ্দেশ্য। গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে দেহতত্ত্বের ভেদ জেনে সাধনা করতে হয় বাউলদের। মুর্শিদ ফকিরদের সেরকম কোনও সাধনপ্রণালী নেই। চোখের জলে, আত্মার আকুতিতেই তাঁদের সাধনা। এই নিয়েই তাঁরা অন্তর দরদীর সন্ধানে ঘুরে বেড়ান। পৃথিবীতে ভাবুক লোকের সংখ্যা কম। যারা গানের মধ্যে বস্তু খোঁজে, সেইসব শ্রোতাদের জন্য মুর্শিদা গান নয়।
মন চল যাই আমার দরদীর তালাশে।/ কার বা মায়া তুমি কর?
বড় করিয়া ঘর বান্দিয়াছ বড় আশা করিয়া কিন্তু রজনী প্রভাতের কালে পাখি বাসা ছাড়িয়া চলিয়া যাইবে।
দুবুলার শীষে যেমন নিহারের পানি নিমেষেই শুকাইয়া যায় তেমনি তোমার জীবন।
কোনজন বেঈমানে বলিয়াছে তোমার এই দেহ আপন।
মন তুমি চল আমার দরদীর তালাশে।
সাধারণত রাতেই মুর্শিদা গানের বৈঠক বসে। বৈঠকে প্রথমে বন্দনা গান গাওয়া হয়। প্রথমে আল্লাজির চরণ তারপর রসুলুল্লার চরণ, ক্রমে হজরত আলির চরণ, মা ফতেমার চরণ, শ্মশানকালীর চরণ, চোঙ্গাই পীরের চরণ, শানাল পীরের চরণ, মা-বাবার চরণ এবং বৈঠকে উপস্থিত সকলের চরণ বন্দনা করে তারপর গান আরম্ভ হয়। অতীতে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ছিল হিন্দু। তাই বন্দনা গানে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের পীর পয়গম্বর ও দেব-দেবীদের নাম উল্লেখ করা হত। সেই কারণেই অধিকাংশ লোকগীতির আবেদন সার্বজনীন। কোনও ধর্মের বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, অথচ এখন মুর্শিদি গানের সঙ্গে অন্যান্য বেশ কিছু লোকসংগীতকে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের গান হিসেবে সহজেই দাগিয়ে দেওয়া হয়।
যাই হোক, যা নিয়ে কথা বলছিলাম, বন্দনা গানের শেষে শুরু হত মনার গান। ব্রাহ্মসমাজের উদ্বোধন প্রার্থনার মতন এই মনার গান। মনকে অসত্যের পথ থেকে সৎপথে নিয়ে যাওয়াই মনার গানের উদ্দেশ্য। রাখাল যেমন ভরা শস্যক্ষেত থেকে গরুকে ফিরিয়ে আনে, মনার গান তেমন করেই মনকে বাগে আনে।
“মনা বলে রে/ কিবা লইলাম কি বা না পাইলাম/ কী লয়া তোর ভবে আইলামরে;/ ও মনা কান্দেরে/ কী ধন লয়া যাবারে ভব পারে/ কী মনা বলেরে”।
মনার গান গাইতে গাইতে যখন ভাব আসে তখন হৃদয়-দেবতার সঙ্গে মুখোমুখি সাধক নিজের মনের কথা বলে। এইটা হল ভজন গান। ভজন গানে আরও ভাব সমাবেশ হলে ফকিরেরা চালান গান ধরে। চালান গান অনেকটা বন্দনা গানের মতোই। কিন্তু চালান গানের সুর কিছুটা দ্রুত লয়ের। এই গান অনেকক্ষণ গাইলে নাকি বুকের মধ্যে একরকমের কম্পন হয়, ফকিরেরা একে সাত্ত্বিক লক্ষণ বলে। কোনও কোনও বৈঠকে বন্দনা গান গাইতে গাইতেই ভাব সমাবেশ হলে আর মনার গান গাইবার প্রয়োজন পড়ে না, গায়কেরা সরাসরি ভজন বা চালান গান আরম্ভ করে।
মুর্শিদা গানের সঙ্গে বাজাবার একমাত্র যন্ত্র সারিন্দা। তবে এসব ক্ষেত্রে মন সবসময় ব্যাকরণ মানে না, তাই কোনও কোনও ফকির মুর্শিদা গানের সঙ্গে দোতারাও বাজিয়ে থাকেন। তবে সাধকদের মতে বিলম্বিত লয়ের মুর্শিদা গানের সুর সারিন্দা যেমন বোঝে, তেমনটা আর কোনও বাদ্যযন্ত্র বোঝে না। সাধারণত কাঁঠাল গাছের কাঠেই তৈরি হয় সারিন্দা। বাদকেরা নিজেই তা বানিয়ে নেন। সারিন্দা কীভাবে বানানো হত তারও একটা আকর্ষনীয় ইতিহাস রয়েছে, এখানে আর তা লিখছি না।
সারিন্দা
পারস্যে জালালুদ্দীন রুমি, হাফেজ, জামী, পশ্চিম ভারতে কবীর, দাদু, মীরাবাই, রজ্জব প্রমুখ সাধকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে শ্রী চৈতন্য, নিত্যানন্দ, রূপ, সনাতন, চণ্ডীদাস, গোবিন্দ দাস, ফরিদপুরের ওড়াকান্দির হরিঠাকুরের দল, পাবনা জেলার ঠাকুর শম্ভুচান্দের সম্প্রদায় প্রমুখ কবি ও মহাপুরুষরা ভাববিলাসকে যে দার্শনিক মতবাদের উপর দাঁড় করেছিলেন, মুর্শিদপন্থী সাধকেরা তা করেননি। মুর্শিদা গানের বিধি বা ধাপগুলো এখনও একইভাবে অনুসরণ করা হয় এমনটা বলা যাবে না। বঙ্গভঙ্গের আগে যে মুর্শিদা গান শোনা যেত তার অস্তিস্ত্ব আর নেই বলা চলে। এখন দুই বাংলার মুর্শিদ সাধকরা নিজেদের মতো করে নিভৃতে সাধনা চালিয়ে যান, অনেকক্ষেত্রেই তাদের রীতিনীতি আলাদা।
মুর্শিদ ফকির জটিল অসুখ সারিয়ে দিতে পারে, আগে গ্রামবাংলার মানুষের এমন অন্ধবিশ্বাসও ছিল। তারা ডাক্তারের বদলে মুর্শিদ ফকিরকে বিশ্বাস করতো কারণ তাদের ধারনা ছিল মুর্শিদা গান সরাসরি আল্লাতালা বা ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত; এ গানের সঙ্গে তাদের ভাষা-সুর লীন হয়ে যেত।
গ্রাম-বাংলার পরাধীন মানুষদের বিভিন্ন দুঃখের কাহিনিতে ভরা ছিল মুর্শিদা গান। এই গান কান্নার গান, আশা জোগানোর গান ছিল। ‘our sweetest songs are those/ that tell the saddest thoughts’ মুর্শিদা গান অনেকটাই শেলি’র এই কবিতার মতো। জমিদার মহাজনে নিপীড়িত, নানা রোগ শোক অভাব দুর্ভিক্ষে জর্জরিত বাংলার জনসাধারণের কাছে এই গানগুলোই ছিল জীবনের মধু। এপার অথবা ওপার, গ্রামবাংলার দুর্ভাগ্যের ছবি এখনও রয়ে গিয়েছে, শুধু সেই ছবি থেকে হারিয়ে গিয়েছে ‘ম্যাজিকাল’ মুর্শিদা গান।
তথ্যসূত্রঃ
মুর্শিদা গান- জসীমউদ্দীন
নুরে দুনিয়া- রমেশচন্দ্র সেন
History of Indian Philosophy
