রবীন্দ্রসঙ্গীতে বাউলগানের প্রভাব

বাউল সুরের প্রয়োগ হচ্ছে একান্ত মানবিক প্রেমের গানে, ঋতুসঙ্গীতে, এমনকি গীতিনাট্যের গানেও

অনন্তকুমার চক্রবর্তী
রবীন্দ্রনাথের গানে দেশি আদর্শের সুস্পষ্ট ছাপ। তাঁর শিল্পীসত্ত্বা ও ব্যক্তিত্ব প্রায় অভিন্ন। জীবনের এক তীব্র মুহূর্তে হঠাৎ পেয়ে গেলেন আনুষ্ঠানিক সম্প্রদায়গত ধর্মাচরণের বাইরে এক সরল উদার আন্তরিকতার ধর্ম যা আত্মভোলা গানের সুরে নিজেকে অনায়াসে প্রকাশ করে। একে তিনি গ্রহণ করে আত্মস্থ করেছেন দীর্ঘ বছর দশেক কাল ধরে। তারপর হঠাৎ দেশব্যাপী প্রাণোচ্ছ্বাসের সঙ্গে একাত্মতাবোধের ঐকান্তিকতায় বাউল সুরাশ্রিত স্বদেশি গানের প্লাবনোচ্ছ্বাস। রবীন্দ্রনাথ যাকে তাঁর সাঙ্গীতিক ঐতিহ্য বলে গ্রহণ করেছিলেন তার ধারা প্রধানত দুটি মার্গ বা ক্ল্যাসিক্যাল সঙ্গীত এবং দেশ বা লোকসঙ্গীত। লোকসঙ্গীত সহজ ও সাবলীল। গানের ভাব প্রকাশিত হয় কথায়। সুর ও ছন্দ তাকে প্রাণবান করে তোলে। তাল সাধারণত সহজম সুর তিন থেকে সাতটি পর্দায় বিন্যস্ত। এর গায়কেরা পুঁথিগত বা সাঙ্গীতিক বিদ্যায় রীতিমত শিক্ষিত না-ও হতে পারেন। সাধারণত এঁরা যাকে বলে ‘গাইতে গাইতে গাইয়ে’।

বাউল সম্প্রদায়ের গান এক ধরনের আবেগময় একটানা সুর, মাঝে মাঝে বেশ ছন্দোবহুল সঙ্গে নৃত্যের আবেগ। বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলেছে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, সুফি ধর্ম। বৈষ্ণব সহজিয়া ধর্মের সঙ্গে মূল সাধনাঙ্গ এক হওয়ায় সহজিয়া মুসলমান ফকিরদের মিলনে ১৬২৫ খ্রীষ্টাব্দে তক বাউলধর্মের উদ্ভব। মুসলমান ফকিরাই বাউল সাধনার আদি প্রবর্তক বলে মনে করা হয়। অনেকের মতে বাউলসাধনা শিষ্টজন নিন্দিত ও ধর্মের নামে ইন্দ্রিয়সেবা মাত্র। কিন্তু উভয় বাংলায় বাউল গান ধর্মসঙ্গীত হিবাসেই পরিচিত। এই গানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। বিশিষ্ট বাউল কবি বা গীতিকারা হলেন লালন ফকির, মদন, পাগলা কানাই, ঈশান, গঙ্গারাম, দীনু, পাঞ্জু শাহ, যাদুবিন্দু। হাউড়ে বাউল, গগন, চণ্ডী বাউল, ফটিক, গোঁসাইচাঁদ, এরফান আলি, বাখের শাহ।

রবিঠাকুর মনে করতেন লোকসঙ্গীতের চেয়ে বাউল গান অনেক ছন্দবহুল। এর সুরের পার্থক্য দেখাযায় প্রথম কলির সঙ্গে দ্বিতীয় কলির। কীর্তন ও বাউলের সুর বৈঠকি গানের একেবারে গা ঘেঁষে গিয়েও তাকে স্পর্শ করে না। ওস্তাদের আইন অনুসারে এটা অপরাধ, কিন্তু বাউলের সুর যে একঘরে। রাগরাগিণী যতই চোখ রাঙাক, সে কীসের কেয়ার করে!

রবীন্দ্রনাথের গান প্রথম থেকেই কিছুটা কাব্যপ্রভাবিত এবং ওস্তাদিগানের তানকর্তব বা লয়বৈচিত্র্য তিনি প্রায় সজ্ঞানে পরিহার করেছেন। অর্থাৎ তাঁর গান প্রথম থেকেই অনেকটা দেশি আদর্শ অনুসারী। বাউল গান সম্পর্কে লিখিতভাবে রবীন্দ্রনাথের প্রথম আগ্রহের প্রকাশ দেখি ১২৯০ সালে(১৮৮৩-৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) ভারতী পত্রিকায় যখন তাঁর বয়স মাত্র ২২ বছর। বাউল গানের একটি সংগ্রহ পুস্তক সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি দেশবাসীর দৃষ্টি এদিকে আকর্ষণ করেন। তার আহ্বানে ভারতীতে কিছু গান ছাপাও হয়। কিন্তু তা শুধুই কথা, সুর ছাড়া। সাতাশ বছর বয়সের মধ্যে তার প্রায় ৪০০ গান রচনা হয়ে গেছে। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটি দেশি সুরে অর্থাৎ কীর্তনের ও রামপ্রসাদী সুরে, যা তৎকালে কলকাতা অঞ্চলে যথেষ্ট পরিমাণে প্রচলিত বাউল সুর একটিও নেই। তারপর ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত দেশি সুরে যে সমস্ত গান রচিত হল তার মধ্যেও দেখি প্রধানত কীর্তন, রামপ্রসাদী ও বাংলাদেশে প্রচলিত বিভাস বা যোগীয়া বিভাস। বাউল সুর মাত্র দুটি গানে – ১) “তোমরা সবাই ভালো”, এবং ২) “খেপা, তুই আছিস আপন খেয়াল ধরে”। অন্য একটি সাক্ষ্য অনুসারে তাঁর প্রথম বাউল সুরের রচনা ‘বিসর্জন’ নাটকের (রচনা- পৌষ, ১২৯৬ সাল) “আমারে কে নিবি ভাই”।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেছেন, এই সময় আকস্মিক বন্যার ন্যায় কয়েকদিনের জন্য কূল ছাপাইয়া গীতধারা উৎসারিত হইল এবং স্বদেশি যুগের এই গানগুলি অধিকাংশই হইতেছে বাউল সুরে বাঁধা। সাতাশ বছর বয়স পর্যন্ত কোনও বাউল সুরের গান নেই, তিরিশ থেকে চল্লিশ বছর পর্যন্ত মাত্র খান দুয়েক গান রচনা, তারপর বঙ্গভঙ্গের সময় বয়স যখন চুয়াল্লিশ বছর হঠাৎ অকস্মাৎ বন্যা – রহস্যটা কী? আমাদের ধারণা, ব্যাপারটা দেখতে যতোই আকস্মিক হোক, এর পিছনে অনেকগুলি ঘটনা ক্রিয়াশীল যার কিছুটা বিশ্লেষণ ছাড়া রহস্যের ব্যাখা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের অন্তজীবন ও বহির্জগতের ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়া সব কিছুই এর সঙ্গে জড়িত।

প্রথমত, স্বদেশের জীবন ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটা সদাজাগ্রত ঔৎসুক্য থেকেই প্রথম যৌবনে বাউল গান বিষয়ে আগ্রহ- একথা ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতামালায় ‘Religion of Man’ এর একটি স্থানে তাঁর অতীত অভিজ্ঞতায় বাউল সম্প্রদায় ও গান সম্পর্কে যে উল্লেখ পাচ্ছি, অত্যাশ্চর্য স্বীকারোক্তি হিসেবে এবং আমাদের প্রসঙ্গের দিক থেকেও তা অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি বলছেন, পিতা কর্তৃক ব্রহ্মসমাজের সম্পাদক পদে নিযুক্ত হয়ে প্রধানত গান রচনা দ্বারা তিনি সমাজের উপাসনা পরিচালনা করছিলেন কিন্তু তৃপ্ত হচ্ছিলেন না । After a long struggle with the feeling that I was using a mask to hide  the living face of truth, I gave up my connection with our church. About this time one day I chanced to hear a song from a beggar belonging to the Baul sect of Bengal… it was alive with an emotional sincerity… Since then I have often tried to meet these people and sought to understand them through their songs’. বাউল সুরের গান “তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে”, “যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক”, “নিশিদিন ভরসা রাখিস”। বাউল সুরের গানগুলিতে প্রধানত পূর্ববঙ্গের বাউলদের প্রভাব স্পষ্ট। সাধারণ লোকসংগীতের মতো তিন চার বা পাঁচ সুরের গান এগুলি নয়। এতে পুরো সাতটি সুরই খেলা করছে এবং মধ্যে কোমল সুরেরো ব্যবহার দেখা যায়। স্বদেশি আন্দোলনের প্রেরণাতেই গানের সুরে বাউলের ব্যপক প্রয়োগ। কিন্তু সুরে বাউল হলেও কথায় আছে জাতীয় উদ্দীপনার বাণী, যা বাউল আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত। কেবল মিলটুকু আছে সহজ সরল আন্তরিকতায়। তেমনি বাউল সুরের প্রয়োগ হচ্ছে একান্ত মানবিক প্রেমের গানে, ঋতুসঙ্গীতে, এমনকি গীতিনাট্যেরও গানে। আবার খাঁটি বাউল তত্ত্বাদর্শে রচিত গানও আছে। যেমন- “আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে”, “আমি তারেই খুঁজে বেড়াই”, “আমি কান পেতে রই”। এমনকি, আছে দেহতত্ত্ব-ভাবানুসারী গান। যথা- “নিত্য তোমার যে-ফুল ফোটে ফুল বনে”। বাউল গানের আর একটা বিষয়গত বৈশিষ্ট্য হল ‘মনের মানুষ’, যাকে ‘মনোবেড়ি’ দিয়ে বাঁধতে হয়, যথা ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’ অথবা ‘আমি কোথায় পাবো তার আমার মনের মানুষ যে রে।” রবীন্দ্রনাথের গানেও আছে- “আমার মন যখন জাগিল নারে, তোর মনের মানুষ এলো দ্বারে”। বাউলের ভাষায় দেখি- “তাই তুমিও বাঁধা, আমিও বাঁধা মুক্তি কোথায় পাই।” আড় রবীন্দ্রনাথে কবিতায় – “মুক্তি? ওরে মুক্তি কোথায় পাবি? মুক্তি কোথায় আছে? আপনি প্রভু সৃষ্টিবাঁধন পরে বাধা সবার কাছে।“ ভষায় বক্তব্য অসামান্য মিল। আর একটি বিখ্যাত বাউল গানে পাচ্ছি কবির যিনি পরমগুরু তিনি “যুগযুগান্তে ফুটায় মুকুল তাড়াহুড়া নাই।” এযেন রবীন্দ্রনাথেরই কথা , তাঁরই প্রতিধ্বনি। কবি নিজেকে বলতেন ‘কবি-বাউল’। তাঁর নানা নাটকে বাউল বারবার অবতীর্ণ নিজেই বাউলের অভিনয় করতে ভালো বাসতেন। বিভিন্ন প্রবন্ধে বাউলের অসংখ্য উল্লেখেও দেখি ঐ প্রভাবের উজ্জ্বল স্বাক্ষর।

রবীন্দ্রনাথের হাতে বাউল গানের ঢং অপেক্ষাকৃত বিচিত্র হয়ে উঠেছে। অস্থায়ী ও অন্তরা এবং তার পুনরাবৃত্তির বদলে মাঝে মাঝে দেখা দিয়েছে বাউল সুরে ধ্রুপদী আদর্শ অনুযায়ী চার ‘তুক’ বা অংশ বিভক্ত গান। অনেক বিশেষজ্ঞই স্বীকার করেছেন – রবীন্দ্রনাথের ‘সঞ্চারী’ এক অতুলনীয় সৃষ্টি। বাউলসুর-প্রধান গানের সঞ্চারীতে তিনি প্রাচীন রাগ-রাগিণী বা কীর্তনের সাহায্য নিয়েছেন। উদাহরস্বরূপ, “বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা’ গানটির সঞ্চারীতে পাওয়া যাচ্ছে ‘দেশ’ রাগের রূপ। বিপরীত দৃষ্টান্তে- “তুমি একলা ঘরে বসে বসে কী সুর বাজালে।” গানটির কাঠামো মোটামুটি ‘কেদার রাগে। কিন্তু এর দ্বিতীয় পদে ‘বাউলের সুর লেগেছে, এনে দিয়েছে উদাস ভাবের করুণ বিহ্বলতা’। “রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো এবার যাবার আগে” গানটি বাউল সুরের একটি বিশিষ্ট গান। এর মধ্যে লক্ষ্য করা যাবে- বাউলের সঙ্গে পিলু রাগিণী মিশ্রিত, আরম্ভে বাউল, গানের সুনির্দিষ্ট ভাগ নেই, সুরযোজনাও বাঁধাধরা নিয়মে হয়নি। কথা অনুযায়ী সুরের সন্নিবেশ প্রথম অংশ সুর বেদনা প্রকাশের অনুকূল, পরবর্তী অংশে উন্মাদনার ভা পরিস্ফুট। বাউলের মধ্যে ঝুমুরের প্রভাব- “ওরে বকুল পারুল।”

আর একটি গান “আমি কান পেতে রই” বাউল তত্ত্বাদর্শে রচিত। ভাষা ও সুরের অত্যাশ্চর্য সম্মিলন। সুরের দিক থেকেও বাউল ও সারির মিশ্রণ। 

(অনন্তকুমার চক্রবর্তী-র গ্রন্থ ‘গানের ভেলায় বেলা অবেলায়’-এর অন্তর্গত ‘বাউল, রবীন্দ্রনাথ, আমরা’ শীর্ষক প্রবন্ধের নির্বাচিত অংশ)

Developed by DXDasia