বাংলাদেশের ৫০ বছরের স্বাধীনতায় যে গৌরব, তাতে ধর্ম ও দ্বিজাতি তত্ত্ব গৌণ
কংগ্রেসের অন্যতম নেতা মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে সাংবাদিক শোরিশ কাশ্মীরিকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “মিঃ জিন্নাহর (মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ, জন্ম ২৫ ডিসেম্বর ১৮৭৬, করাচি, মৃত্যু করাচিতে, ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা) পাকিস্তান দাবির মধ্যে গভীর বিপদ নিহিত। আরও একটি বিষয় গুরুতর। অবশ্যই মিঃ জিন্নাহর নজর এড়িয়ে গেছে, বঙ্গদেশ। তাঁর অজানা, বঙ্গদেশ অন্যের তথা বাইরের নেতাগিরি, নেতৃত্ব মেনে নেয় না। অস্বীকার করবে। আজ হোক কাল হোক। আমার বিশ্বাস, পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে পশ্চিম পাকিস্তানের দাপট অসহনীয়, একসঙ্গে থাকা আদৌ সম্ভব নয়। দুই পাকিস্তানের ধর্ম ভিন্ন অন্য কোনো বাঁধন নেই। আমরা মুসলমান, এই বোধে স্থায়ী রাজনৈতিক মহব্বত, ঐক্য গড়ে ওঠা অসম্ভব।”
প্রায় একই কথা বলেছিলেন খান আব্দুল গফফার খান (যিনি ‘সীমান্ত গান্ধি’ নামে অধিক পরিচিত) এবং একদা কংগ্রেসের শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবির। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ করেও বঙ্গকে তফাৎ করতে পারেননি (রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’, যে গান বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরে জাতীয় সঙ্গীত)। জিন্নাহ শিক্ষা নেননি মওলানা আজাদের কথায়, কানেও তোলেননি। পশ্চিম পাকিস্তান শোষণ করছে পূর্ব পাকিস্তানকে। বঞ্চিত করছে সবদিক থেকে। পাট তৈরি হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানে, দাম নির্ধারিত পশ্চিম পাকিস্তানে, বাকি ফসলের দামও। এবং দামের অর্ধেক পাচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান। পশ্চিম পাকিস্তানের আপেল, আঙুর, পশমের পোশাক ইত্যাদির দাম পূর্ব পাকিস্তানে দশগুণ। পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রকাশিত পত্রপত্রিকার আয়েরও ভাগীদার পশ্চিম পাকিস্তানের সরকার। বৈষম্য, ব্যবধান এতটাই, কেউ প্রতিবাদ করলে রাষ্ট্রদ্রোহী, পাকিস্তান-বিরোধী, ইসলাম-বিরোধী। অত্যাচার, গ্রেফতার, জেল-জুলুম।
ফরিদপুরে রাইফেল হাতে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ
ঢাকায় ১৯০৬ সালে ‘আহসান মঞ্জিলে’ প্রতিষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ, অল ইন্ডিয়া কংগ্রেসের দেখাদেখি। লক্ষণীয়, ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগে উত্তর ভারতের বা অখণ্ড ভারতের (পূর্ব ছাড়া) অন্য কোনো রাজ্যের মুসলিম নেতা নেই। না থাকলেও পরবর্তী সময়ের নেতৃত্বে উত্তর ভারতের মুসলিম বুদ্ধিজীবীকুল। আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ যেমন একজন, ১৯৩০ সালে। মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ কংগ্রেসেরই সক্রিয় সদস্য দুই দশক, বলতেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা।
তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক অর্থাৎ আবুল কাশেম ফজলুল হক বঙ্গীয় মহলে ‘শের-এ-বাংলা’ নামে খ্যাত। লাহোরে ১৯৪০ সালের ২২-২৪ মার্চ, তিনদিনের ‘পাকিস্তান রেজল্যুশন’ অধিবেশনে (‘ডেক্লারেশন অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ পাকিস্তান’ নামে পরিচিত) মোঃ জাফরউল্লাহ খানের প্রস্তাব, রচনাও তাঁর। পরের বছর সেই প্রস্তাব পাশ করার গুরুদায়িত্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী আবুল কাশেম ফজলুল হক, অর্থাৎ বাংলার বাঘের।
১৯৪০ সালে মার্চে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব। ১৯৬৬ সালে লাহোরেই পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলির সম্মেলন। ঐ সম্মেলনে আওয়ামি লিগের ছয় দফা উত্থাপন, “ছয় দফার আন্দোলনেই নিহিত শক্তিশালী পাকিস্তান গড়ার।” না বলেও উপায় ছিল না তখন। ছয় দফার মধ্যে যেমন শর্তাবলি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ লুক্কায়িত। পাকিস্তানের গোয়েন্দাকুল, পাকিস্তানের সামরিক ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ ঠিকই আঁচ করে দুই পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতার, বিভাজনের। শেখ মুজিবুর রহমান ঝানু রাজনীতিক। ছয় দফার প্রতিটি দফায় যে যুক্তি পরতে পরতে, দুই পাকিস্তানের সার্বভৌমের জন্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলা মুশকিল, কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ ছয় দফার মধ্যে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ভাঙন স্পষ্ট দেখতে পায়। ‘ছয় দফা আগরতলা ষড়যন্ত্র’ এই তকমায় আওয়ামি লিগ দোষী, অপরাধী। রেহাই নেই আওয়ামি লিগের, শেখ মুজিবুর রহমানের।
আরও পড়ুন: ভাষা আন্দোলন থেকে বাংলাদেশ
এখানে অবশ্য উল্লেখ্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে বহুমান্য কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মণি সিং বলেছেন, “১৯৫১ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন” খবর ‘দৈনিক সংবাদ’-এর, বঙ্গবন্ধুর ৫৩ তম জন্মদিনে প্রকাশিত মণি সিং এর ‘সংগ্রামের নোটবুক’ থেকে।
ছয় দফার পক্ষে ১৯৬৬ সালের মার্চ থেকে টানা বক্তৃতা জনসভা আওয়ামি লিগের, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, পাবনা, ফরিদপুরে বক্তৃতার পরে গ্রেফতার, জেলে। বেশিদিন আটকে রাখা মুশকিল, আইনের প্যাঁচে, ফাঁকফোকরে মুক্তি। যদিও তা সাময়িক। পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান বরদাস্ত করতে নারাজ ছয় দফা আন্দোলন, এবং যথারীতি তকমা এঁটে দিয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রের। আগরতলা ষড়যন্ত্রের ধুয়ো তুলে দেশরক্ষা আইনের নামে বারবার গ্রেফতার ৮ মে ১৯৬৬ সাল থেকে। তারপর থেকে গোটা বাংলাদেশ উত্তাল।
তৃতীয় সপ্তাহ থেকেই মূলত শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির জন্যে গোটা পূর্ব পাকিস্তান মরিয়া। আন্দোলন এতটাই তুঙ্গে, যে পাক নেতারা দিশেহারা। ১৪৪ ধারা জারি, কারফিউ, বুলেট, হত্যা। জনতা বেপরোয়া, পথে পথে, একাকার। এসে যায় বিখ্যাত ১৯৬৯ সাল, বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘উনসত্তরের আন্দোলন’ নামে খ্যাত। মনে পড়ছে সে সময়ের কিছু স্লোগান, ‘জয় বাংলা’; ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’; ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’; ‘ঢাকা না পিন্ডি (পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি তখন রাজধানী), ঢাকা ঢাকা’; ‘চটকাও পিন্ডি পাকিস্তানের পিন্ডি’; ‘পাঞ্জাব না বাংলা, বাংলা বাংলা’; ‘আমার দেশ তোমার দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ইত্যাদি। গোটা তিনেক স্লোগান এই লেখকের লেখা! লক্ষণীয়, প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন-স্লোগানে পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা নয়, সরাসরি বাংলাদেশ।
ঘটনার দ্রুত পট পরিবর্তন। বিস্তারিত ইতিহাস বহু বইয়ে উল্লেখিত। একটি ঘটনা চোখে উজ্জ্বল এখনও। ঢাকায় কারফিউ ঘোষিত ৩ মার্চ, ১৯৭১। মালিবাগ ট্রাফিক আইল্যান্ডে আমরা ব্যারিকেড তৈরি করছিলাম, মিলিটারির একটি ট্রাক ছুটে এসে এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়ে, ফারুক ইকবাল লুটিয়ে পড়ে চোখের সামনে। এক মিনিট আগেই ওর পাশ থেকে সরে এসেছিলেম, ইট-পাথর আনার জন্যে। ফারুক ইকবাল বাংলাদেশের স্বাধীনতায় প্রথম শহীদ।
এল ৭ মার্চ, রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেলা দু’টোয়। আমাদের মালিবাগের বাসা থেকে রেসকোর্সের ময়দান দুই মাইলও নয়, সকাল দশটায় হাজির, পাছে মঞ্চের সামনে জায়গা না পাই! রেসকোর্সে তিলধারণের জায়গা নেই, অনেকেই গাছে চড়ে, রেসকোর্সের আশেপাশের বিল্ডিং-এর ছাদেও, উনিশ মিনিটের বক্তৃতা বঙ্গবন্ধুর। “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” আর কোনো ঘোষণার দরকার নেই। এইদিনই মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা, পরের ইতিহাস রক্তক্ষয়ী। মুক্তিযুদ্ধ, ত্রিশ লাখ শহিদ, স্বাধীনতা।
পঁচিশে মার্চের রাত বারোটার পর থেকেই শুরু হয় পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞ। জেনোসাইড। সাতাশে মার্চ থেকে ভারতে উদ্বাস্তু, নভেম্বরের শেষেও। ভারতই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতার সহায়ক। ইন্দিরা গান্ধি বাংলাদেশের স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে। ইন্দিরার অবদান চিরস্মরণীয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীও, স্যালুট। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস ধার্য, কারণ ২৫ মার্চের বিগত রাত থেকেই পাকিস্তানের হত্যালীলা। পাকিস্তানের পতন, বাংলাদেশের অভ্যুদয়, জয় বাংলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর, পাকিস্তান আড়াই দশকও টেকেনি। ধর্ম, দ্বিজাতি তত্ত্ব, কোথায়?
ভারত দ্বিখণ্ডিত না হলে পাকিস্তান হয় না। পাকিস্তান না হলে পূর্ব পাকিস্তান হয় না। পূর্ব পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হয় না। বাংলাদেশের ইন্ধনদাতা স্বয়ং জিন্নাহ। পাকিস্তান জন্মের আট মাসও হয়নি, পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় এসে (মার্চ ১৯৪৮) রেসকোর্স ময়দানে জনসভায় এবং পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস কার্জন হলের চত্বরে, ছাত্রসমাবেশে তিনি ঘোষণা করলেন, দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। ভুলে গেলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ উর্দু বলেন না, জানেনও না, বাংলাই একমাত্র জবান। জিন্নাহর ঘোষণায় ভাষা আন্দোলন শুরু, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনও। ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন। ঐ দিনে, ঐ মাসে, ঐ বছরে, পশ্চিম পাকিস্তানের নামকরণ শুধুই পাকিস্তান। এক অর্থে নতুন পাকিস্তানেরও জন্ম, অর্থাৎ এ বছর পাকিস্তানেরও ৫০ বছর।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ এবং আওয়ামি লিগের নেত্রীরা ১৯৭০ সালে রেডিওতে নির্বাচনের ফলাফল জানছেন
পাকিস্তানের একজন ঔপন্যাসিক (থাকেন করাচি), লন্ডনে পরিচয়, বলছিলেন রসিকতা করে, ‘মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলে।’ ধর্ম এক হলেও দেশ ও জাতি এক হয় না। জ্ঞানী মানুষ, জ্ঞানী রাজনীতিক সব কিছু জেনেও নির্বোধ হলে পরিণাম কী, দেখে যেতে পারলেন না। বললাম, ‘গোটা বিশ্বে আমাদের পরিচয় আজ বাংলাদেশের, মূলে বাঙালি।’
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত। সংবিধানের মূল চার নীতি – গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা (সেকুলারিজম), বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে চার নীতিই লোপাট। বহিরঙ্গে গণতন্ত্রের লেবাস, ভোট হয় বটে।
‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর বদলে বিএনপি’র সেনারাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ‘সৃষ্টি’ করলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। অর্থাৎ, ‘বাংলাদেশি’র মধ্যে মুসলিম জাতীয়তাবাদ, বাঙালি খারিজ। জিয়াউর রহমান স্বৈরশাসক, নিষিদ্ধ জামায়াত ইসলামকে ঘরে ডেকে এনে কোলে ঠাঁই দিলেন। পাকিস্তানের নাগরিক জামায়াত ইসলামের ‘আমির’ গোলাম আজমকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান। যুক্তি, তিনিও মূলত বাংলাদেশের। পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়ায় পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
আরেক স্বৈরাচারি শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আরও এক কাঠি সরেস। সংবিধান আগেই কাঁটাছেড়া হয়েছে, এবার সংবিধানে যোগ করলেন ‘বিসমিল্লাহ’, ‘রাষ্ট্রধর্ম’ ইসলাম। কোনো রাজনৈতিক দলই তীব্র প্রতিবাদ করল না, বিক্ষোভ, মিছিল করল না। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্ম কি বাংলাদেশ থেকে উধাও? তাঁরা কি বাংলাদেশের নাগরিক নন? হলে, দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?
সেই ট্রাডিশন এখনও। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এক দশকের বেশি বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, সংবিধানে পয়লা সংযোজন বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখেছেন। প্রথমবার ক্ষমতায় আসার আগে অঙ্গীকার করেছিলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূল নীতি ফিরিয়ে আনবেন। প্রথমবার করেননি, দ্বিতীয়বারও নয়, বরং ইসলামকে আরও বেশি আঁকড়ে ধরেছেন। ইসলামি দেশ ও ইসলামি দলগুলোর কাছে প্রায় জিম্মি। পাড়ায়-পাড়ায় অগুনতি মসজিদ। জেলা-উপজেলায়-থানায়-গ্রামে অজস্র মাদ্রাসা, সরকারি অর্থ-সাহায্যে পুষ্ট। বিজ্ঞানের স্কুল, কলেজ আতশকাঁচ দিয়ে খুঁজতে হয়। এও বাহুল্য। ফতোয়াবাজ ইসলামি মোল্লা-মৌলবি-হুজুরের দাপট ক্রমাগত বাড়ন্ত। সরকার ধরি মাছ না ছুঁই পানি, ইসলামি পেট্রোডলার দেশগুলির মুখাপেক্ষী। নিশ্চুপ, মৌন।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের নানা চেহারা। বঙ্গবন্ধু হত্যা, দুই সামরিক শাসক, দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে ‘সার্ক’ গঠন জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে, সামরিক অভ্যুত্থান, জিয়াউর রহমানকে হত্যা, তিনটি কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) সরকার, পরপর দুই মহিলা প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা ২০০৮ থেকে এখনও)। এরশাদের জাতীয় পার্টি সমেত একশ’র বেশি রাজনৈতিক দল (অধিকাংশই ইসলামি)। স্বাধীনতার পর থেকেই মালয়েশিয়া-সহ ইসলামি মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিক। বিদেশে এক মিলিয়নের বেশি বাংলাদেশের নাগরিক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, পড়ুয়া।
মুহম্মদ ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাংক। শান্তির তকমায় মুহম্মদ ইউনুস নোবেল জয়ী। ফজলে হাসান আবেদের ব্র্যাক (বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও, ৫০টির বেশি দেশে), নারী শিক্ষা – ৯২ ভাগ স্কুলে ছাত্রী, নারীর অধিকার, সংগঠন জোরালো। গার্মেন্টস শিল্পে ৮০ ভাগের বেশি নারী কর্মী। বিদেশে শ্রমিক এবং গার্মেন্টস থেকেই মুখ্য আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা, ক্রমাগত বাড়ন্ত। দুই দলের কাছে (আওয়ামি লিগ/ বিএনপি), দুই নেত্রীর (আওয়ামি লিগের শেখ হাসিনা এবং বিএনপি’র বেগম জিয়া) চক্রে আবদ্ধ। ইসলামিক দলগুলোর কাছেও। ইসলামিক দলের হরেক শর্ত, দাবিদাওয়া থেকে বেরোতে পারছে না, বরং মেনে নিচ্ছে। বাংলাদেশে ইসলামিক দল যত সোচ্চার, মাথা চাড়া দিচ্ছে, অন্য প্রগতিশীল দলগুলি অতলে। একদা কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আদর্শ, বহুমান্য। এখন প্রায় অস্তিত্বহীন, মাঝেমধ্যে সংবাদ মাধ্যমে।
আরও পড়ুন: অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্মদিন, কেন জরুরি মননবোধে
পঞ্চাশ বছরের স্বাধীনতায় বাংলাদেশের পতন ও উত্থান লক্ষণীয়। এখন আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ (নিক্সন আমলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বিখ্যাত উক্তি) নয়। বছর ১৫ আগে ওঁর সাথে দেখা, বার্লিনের ‘হাউসজের কুলটুরেন জের ভেল্ট’ (বিশ্ব সাংস্কৃতিক কেন্দ্র) আয়োজিত ‘উদ্বাস্ত ও বিশ্ব সংস্কৃতি’ অনুষ্ঠানে। অনেকের সঙ্গেই হাত মিলিয়ে পরিচিত হলেন। হাত বাড়িয়েছিলুম, তিনিও। দুই হাত মিলনের আগে জিজ্ঞেস করেন, “ফ্রম হুইচ কান্ট্রি আর য়্যু?” ভেবেছিলেন ভারতীয় বা পাকিস্তানের। বললাম, বাংলাদেশের। হাত সরিয়ে নেন। নিলেও, কিসিঞ্জারকে প্রশ্ন করলুম, “সো, য়্যু আর দ্য ম্যান হু সেইড বাংলাদেশ ইজ আ বাস্কেট কেস?” উত্তর দেননি। দেওয়ার মুখ ছিল না।
নিক্সন, কিসিঞ্জারের পেয়ারের পাকিস্তানের (মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রেম উথলে ওঠে, যুদ্ধজাহাজ সপ্তম নৌবহর পাঠায়) পতনে, ভারতের ‘সাম্রাজ্যবাদিতায়’ সোচ্চার। স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতেও দ্বিধাগ্রস্ত।
আমেরিকা আজ তাকিয়ে দেখুক পাকিস্তান, বাংলাদেশকে। বিশ্ব ব্যাংক বলছে: (চলতি বছরের মার্চের রিপোর্ট) “বাংলাদেশ হ্যাজ লেফট বিহাইন্ড পাকিস্তান ইন এভরি আসপেক্ট (Bangladesh has left behind Pakistan in every aspect)।” পার ক্যাপিটা ইনকাম ২,০৬৪ মার্কিন ডলার, জি ডি পি ৫২, ব্যাঙ্ক রিজার্ভ ৪২ বিলিয়ন ডলার, প্রাথমিক শিক্ষা ৯৮টি স্কুলে। পাকিস্তানের ২০ বিলিয়ন ডলারও নয়, স্কুল শিক্ষায় আরও নিম্নে। বাংলাদেশের ৫০ বছরের স্বাধীনতায় যে গৌরব, পাকিস্তান তুচ্ছ। ধর্ম ও দ্বিজাতি তত্ত্ব গৌণ।
বাংলাদেশ স্বাধীন, ৫০ বছরে বাংলাদেশ বৈশ্বিক, গরীয়ান। বাংলাদেশ ও বাঙালির মাথা সর্বত্র উঁচু। জয় বাংলা, বাংলাদেশ।
