অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্মদিন, কেন জরুরি মননবোধে

ভারতের সাম্প্রদায়িক চরিত্র কী হতে পারে ভবিষ্যতে, আগাম বার্তা ছিল তাঁর লেখায়

‘না পড়ে, না জেনে, না ভেবে কিছু লিখি না। লিখতে সময় লাগে। ছোট লেখাও সময় নিয়ে লিখি।’ লিখেছেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তাঁর ছোট লেখায়, হোক তা রাজনৈতিক বিষয়, স্বল্প পরিসরে মূল বক্তব্য প্রকাশই আসল লক্ষ্য। ইনিয়ে-বিনিয়ে-ফেনিয়ে লেখা বড় করলেই পাঠক আগ্রহী হবেন, পড়বেন, আদৌ নয়, জানতেন অন্নদাশঙ্কর। তীক্ষ্ণ, সুচারু, বুদ্ধিদীপ্ত লেখাই সাধারণ পাঠকের কাছে অধিক মূল্যবান, তবে বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভরশীল। তাঁর বেশ কিছু রাজনৈতিক, সামাজিক, এমনকি সাহিত্য বিষয়ক লেখাও এক-দেড় পৃষ্ঠায় সমাপ্ত। হলেও, ভাবনাচিন্তার খোরাক যথেষ্ট। অন্যদিকে সাহিত্য, রাজনীতি নিয়ে ঢাউস প্রবন্ধও বিস্তর। ছোটগল্প একেবারে ছোট নয়, উপন্যাসও বিশাল। 

বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম ‘এপিক’ উপন্যাস লিখেছেন, ‘সত্যাসত্য’। ছয় খণ্ডে সমাপ্ত, প্রতিটি খণ্ডের নাম আলাদা। যৌবনে লেখা। পরিণত বয়সে লিখেছেন ‘ক্রান্তদর্শী’, চার খণ্ডে। বিষয় ভারত ভাগ, বাংলা ভাগ। রাজনীতির সঙ্গে মিশেল প্রেম, সামাজিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, মানবতা, দেশভাগের পূর্বাপর ইতিহাস, ঘটনাবলি বিবৃত। মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডে উপন্যাসের ইতি। 

একটি তথ্য জানানো জরুরি। সব লেখাই তিনি আগে ‘পয়েন্টস নোট’ করতেন। অতঃপর নোট সাজিয়ে, যোগবিয়োগ করে লেখা। হতে পারে গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, কিংবা ছড়াও। আরও একটি তথ্য, লেখা শুরুর আগে লেখার শিরোনাম ঠিক করতেন, যেন শিরোনামেই বুঝিয়ে দিতে চান বক্তব্যের সারমর্ম। 

অন্নদাশঙ্কর একদা রাজকর্মচারী, অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের কর্মী (ভারত ভাগের আগে)। ছিলেন আইসিএস, উঁচু পদের আমলা, ট্রেনিং বিলেত থেকে। যেহেতু রাজকর্মচারী, লেখালেখিতে কিছু বিধিনিষেধ ছিল, অমান্য করলে ঝামেলা। বেছে নিলেন ছদ্মনাম, লীলাময় রায়। এই নামে বহু প্রবন্ধ, মূলত সমাজ-রাজনীতি নিয়ে লেখা, ব্রিটেন-শাসিত ভারতে প্রকাশিত। লিখেছেন বাংলায়, বাংলার পাঠকের জন্যই। বাংলা তথা বঙ্গদেশই ছিল তাঁর রক্তে, ধমনীতে। 

আইসিএস হয়ে বিলেত থেকে ফিরে ভারতের অন্য কোনও রাজ্যেও শাসনকাজে যেতে পারতেন। অনেকেই গিয়েছেন বোম্বে, দিল্লির মায়ায়, কিংবা উচ্চাশায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ভারতের অন্য রাজ্যের বদলে বাংলা কেন বেছে নিলে?’ সপ্রতিভ উত্তর, ‘বাংলাই আমার আরাধ্য’। রবীন্দ্রনাথ খুশি কী অখুশি, ‘চোখেমুখে ভাবান্তরের চিহ্ন ছিল না’। ওঁর কাছেই আরও শুনেছি, ‘একবার বলতে চেয়েছিলুম, আপনি (রবীন্দ্রনাথ) যেখানে আছেন, সেই বাংলা ছেড়ে কেন ভিন রাজ্যে, প্রদেশে যাব? বলিনি, বললে হয়তো ভাবতেন গুরুদেবকে খুশি করছি।’

আমাদের জানা আছে, অন্নদাশঙ্কর রায় চাকরিজীবনের বেশিরভাগ সময়ই পূর্ববঙ্গে কাটিয়েছেন। শুরু রাজশাহীর চাঁপাই নবাবগঞ্জ থেকে। এখানে তাঁর স্ত্রী লীলা রায়ের বাংলার শিক্ষক ছিলেন ‘হারমনি’ খ্যাত অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন। পূর্ববঙ্গের বহু জেলার আদালতে কখনও বিচারপতি, কখনও জেলাশাসক, বিভাগীয় প্রশাসকও। ভারত ভাগের কয়েক মাস আগে ছিলেন ময়মনসিংহে। লিখেছেন বহুল পঠিত বিখ্যাত কবিতা, ২৫ লাইনের:

তেলের শিশি ভাঙল বলে 
খুকুর পরে রাগ করো।
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা?
(খুকু ও খোকা, ১৯৪৭)

এই কবিতার উৎস ছোট কন্যা তৃপ্তি রায়। তৃপ্তির বয়স তখন দুই। বাবার জন্য জবাকুসুম তেলের শিশি নিয়ে, ওই বয়সে, খেলতে খেলতে যাওয়ার সময় হাত থেকে পড়ে যায়, ভাঙে। অন্নদাশঙ্কর-লীলা রায়ের পাঁচ সন্তানের তিনজনেরই জন্ম পূর্ববঙ্গে। মধ্যম সন্তান চিত্রকাম পাঁচ বছর বয়সে মারা যায়, চট্টগ্রামে। কৈবর্ত ধামে চিত্রকামের স্মরণ ফলকও আছে। 

অন্নদাশঙ্করের বন্ধুকুলে বাংলাদেশের বহু সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, গুণীজন। বন্ধু নয় কেবল, আত্মীয়তায় একাত্ম। বন্ধু আবুল ফজলকে তিনিই বুদ্ধিদাতা, ‘চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় গল্প লিখুন।’ আবুল ফজলের স্মৃতিচারণ গ্রন্থে অন্নদাশঙ্কর রায়ের নানা বিষয় উল্লিখিত। আমাদের এও জানা আছে, দেশভাগ না হলে কুষ্টিয়ার শিলাইদহে অন্নদাশঙ্কর বসতি গড়ার পরিকল্পনা পোক্ত করেছিলেন, লিখেওছেন তিনি। তাঁর একটি গ্রন্থের নাম, ‘আমার ভালোবাসার দেশ’। এই দেশ, বাংলাদেশ। ঢাকা থেকে প্রকাশিত। 

অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্ম ১৫ মার্চ, ১৯০৪ সালে, ওড়িশার দেশীয় রাজ্য ঢেঙ্কানলে এক শাক্ত পরিবারে। বাবা নিমাইচরণ রায়, মা হেমনলিনী। শাক্ত থেকে বৈষ্ণব, বৈষ্ণবতায় নরনারীর যে লীলা, প্রেম, ঈশ্বরপ্রেমে সব মানুষ একাত্ম। ধর্ম গৌণ, ধর্মীয় আবদ্ধতা লাগামছাড়া, সহজিয়া মানবতাই মুখ্য। যেমন লালনের গানে। লালন হিন্দু না মুসলিম গৌণ, ঈশ্বরভজনা, মানবপ্রেমই সার্বিক। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিষ্টানের বালাই নেই। এই যে অ-বালাই, অন্নদাশঙ্কর পারিবারিক মনমানসেই জেনেছেন শৈশবেই। তাঁর মানবপ্রেম বোধে মানুষই সবার উপরে, ‘তাহার উপরে কেহ নাই’। ধর্ম, ধর্মাচরণ যাই হোক, মানবিকতাই মানবতন্ত্র। বৈষ্ণব চেতনা থেকেই লিখতে পারেন, ‘জাতপাত, সম্প্রদায়, ধর্ম তুচ্ছ। যদি মানবিক হই, মানবতাই প্রথম। খাদ্যের জাত নেই। সাতদিন এক টেবিলে একসঙ্গে বসে খেলেই, খাওয়া ভাগাভাগি করলে, একই চামচে, খাদ্যের গুণেই আমরা, হিন্দু মুসলিমরা ঘরোয়া, আত্মীয়।’ 

আরও একটি মারাত্মক কথা বলেছেন। ‘সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়, হোক তা হিন্দু-মুসলিম, মানুষই হত্যা নয়, বিদ্বেষ নয়, মনুষ্যত্ব, মানবিক বোধও হত্যা।’ দেখতেই পাচ্ছি, ভারতসহ পৃথিবীর নানা দেশে। ভারতের সাম্প্রদায়িক চরিত্র কী হতে পারে ভবিষ্যতে, আগামবার্তা ছিল তাঁর লেখায়, প্রফেসি। হুবহু মিলে যাচ্ছে। নানা দিক থেকে মিলিয়ে দেখেছি, তাঁর জন্মদিনের প্রাক্কালে, মনিষীর দিব্যদৃষ্টি ঠিক, সত্য।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্য সচিব রথীন সেনগুপ্তর কাছে শুনেছি, অন্নদাশঙ্করকে হত্যার জন্য আরএসএস ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে দিনক্ষণও ঠিক করে। গোয়েন্দা মারফত এই গোপন সংবাদ জেনে অন্নদাশঙ্করের বাড়িতে পুলিশ মোতায়েন, কড়া নিরাপত্তা। দেখেশুনে অন্নদাশঙ্কর বলেন, ‘মারুক, শহীদ হব।’ ফোনে আমাকে ডাকেন, যাই। হেসে শোনান, ‘বুড়ো বয়সে শহীদ হওয়া গৌরবের।’

অন্নদাশঙ্করের বৈশ্বিক মানবিকতা পরিবার থেকে, নিজের দায় থেকেও। স্ত্রী মার্কিনি, টেক্সাসের এল পাসো-র অ্যালিস ভার্জিনিয়া ওর্নডরফ, বিয়ের পরে লীলা রায় নামকরণ। অন্নদাশঙ্কর বৈষ্ণব হিন্দু, স্ত্রী প্রটেস্টান্ট খ্রিষ্টান, যুক্ত হলুম পরিবারে, মুসলিম নামধারী। একই বাড়িতে থাকা, একই টেবিলে খাওয়া। মানবিকতার আদর্শ। আমাদের পরিবার, তাঁরও পরিবার। ঢাকা থেকে আত্মীয়স্বজন এলে তাঁর গৃহে অবস্থান। ঢাকায় গিয়ে তিনিও আমাদের পারিবারিক। 

অন্নদাশঙ্কর খাঁটি বাঙালি, ভেজাল নেই। আত্মজীবনীতে বিস্তারিত। কিন্তু তাঁর প্রথম সাহিত্য ওড়িয়া ভাষায়, কবিতা। ওড়িয়ার পাঁচজন লেখক, এঁদের মধ্যে দুজন বাঙালিও, ওড়িয়া আধুনিক সাহিত্যের পথিকৃৎ। ‘সবুজদল’ নামে (প্রেরণাদায়ক প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’) আত্মপ্রকাশ। অন্নদাশঙ্কর বলতেন, ‘এই প্রকাশে রবীন্দ্রনাথই মূল প্রেরণা।’

বাংলার আধুনিক সাহিত্যে, বুদ্ধিমননতায় অন্নদাশঙ্কর বহুমান্য, সুধীন্দ্রনাথ, বুদ্ধদেব বসু প্রমুখ উচ্চকণ্ঠিত। অন্নদাশঙ্করের গদ্য বাংলা সাহিত্যে সম্পদ, বলেছেন সাহিত্যের পণ্ডিতকুল। ছড়ায়, কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের ভাষ্য: ‘রাজা’। কতরকম ছড়া, ছোটদের, বড়দের। 

বাংলাদেশ প্রেমিক অন্নদাশঙ্কর। এই প্রেম বাংলাদেশের জল-মাটি-হাওয়া-নিসর্গে উজ্জীবিত। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখেন ১৯৭১-এ:

যতদিন রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার,
শেখ মুজিবুর রহমান
(অংশ ‘বঙ্গবন্ধু’, ১৯৭১)

অন্নদাশঙ্কর দুই বাংলার, বিচ্ছিন্ন করা মুশকিল। তাঁর জন্মদিনে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, ভারত-বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। যত দিন যাবে, তিনিই রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলাদেশে স্মরণীয়। তাঁর জন্মদিন উপলক্ষ্য মাত্র, তিনি আমাদের চিন্তা-চেতনায়, আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, সার্বিক বোধে। বাঙালি তাঁর কাছে ঋণী। ঋণ অপরিশোধ্য। 
 

Developed by DXDasia