ছাত্রছাত্রীদের কাছে ভরসার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠছে শিলিগুড়ির মুরলীগঞ্জ হাইস্কুল

আর পাঁচটা স্কুলের মতোই পরিকাঠামো, কিন্তু চিন্তাভাবনায় নজির গড়ছে এই স্কুল

রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলো (West Bengal Govt. School) যে নিয়মে চলছে ঠিক সেই নিয়মের সঙ্গে নিজেদের নতুন কিছু নিয়ম লাগু করে গোটা রাজ্যের ব্যতিক্রমী স্কুল হয়ে উঠেছে শিলিগুড়ি (Siliguri) মহকুমার বিধাননগরের মুরলীগঞ্জ হাইস্কুল (Muraliganj High School)। আর দশটা স্কুলের মতো মুরলীগঞ্জ হাইস্কুল শুরু হয় সকাল দশটা চল্লিশ মিনিটে। ছুটি বিকেল চারটে ৩৫ মিনিটে। কিন্তু অন্য স্কুলের এখানে আট পিরিয়ড হয় না, হয় ছ’টি।

অঙ্ক এবং ইংরেজিতে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীরা কাঁচা বলে সেই দুটি ক্লাস হয় সত্তর মিনিট করে। অন্য সব স্কুলে একবারই টিফিনের ঘণ্টা পড়ে, আর এই স্কুলে দুবার টিফিন হয়। একবার ১২টা দশ মিনিটে আর একবার একটা পঁচিশ মিনিটে মিড ডে মিলের জন্য। স্কুলের পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব ছাত্রছাত্রীর আত্মরক্ষার জন্য কুডো শেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। স্কুল চত্বরকে গড়ে তোলা হয়েছে ‘চাইল্ড ফ্রেন্ডলি’। এ জন্য স্কুল চত্বরে রাখা হয়েছে এক হাজার ফুলের টব। গাছের পরিচর্যা করে ছাত্রছাত্রীরাই। গাছের পরিচর্যাকে কর্তৃপক্ষ রেখেছেন শিক্ষার (Education) অঙ্গ হিসেবেই।

স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত বিএমআই বা বডি মাস্ক ইনডেক্স করা হয় রুটিন করে। প্রতিটি ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের জন্য রয়েছে নিজস্ব কোয়েশ্চেন ব্যাঙ্ক। সিলেবাসের পড়া হয় এভাবেই।

২০১২ সালে এই স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য হাত ধোয়ার বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়। খাওয়ার আগে এবং পরে, এমনকি শৌচকর্মের পর হাত ধোয়ার বিজ্ঞানসন্মত কর্মসূচি শুরু হয়। বর্তমানে করোনার জন্য মাস্ক ব্যবহারের অভ্যাস শুরু হয়েছে, যদিও ২০১৩ সাল থেকেই মাস্ক ও অ্যাপ্রন ব্যবহারের বিশেষ কর্মসূচি শুরু হয়। প্রধান শিক্ষক সামসুল আলমের (Samsul Alam) কথায়, “মাস্ক ব্যবহারের পরিকল্পনা ২০১৩ সালেই আমরা শুরু করেছিলাম।”

এইসব কর্মসূচির মধ্যেই গত ৩০ জুন শুরু হয়েছে জল খাওয়ানোর বিশেষ কর্মসূচি। রোটারি ক্লাব অফ শিলিগুড়ি গ্রিনের (Rotary Club of Siliguri Green) সহযোগিতায় স্কুলে বসেছে এক হাজার লিটারের জলের ট্যাঙ্কি। এক হাজার ছাত্রছাত্রীকে দেওয়া হয়েছে জলের বোতল। মাঝেমধ্যেই ঘণ্টা বাজছে, তৎক্ষণাৎ ছাত্রছাত্রীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ছে জল খেতে। এইভাবে মোট পাঁচবার জল খেতে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। এ এক অভিনব উদ্যোগ।

প্রধান শিক্ষক সামসুল আলম বলেন, “আজকাল ছেলেমেয়েরা অনেক জাঙ্ক ফুড খায়। কিন্তু জল খেতে ভুলে যায়। অনেকেরই কিডনির সমস্যা হচ্ছে। তাই জল খাওয়ানোর এই বিশেষ কর্মসূচি। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা বেশ চনমনে থাকে সারাক্ষণ।”

স্কুলে রয়েছে দুটি বাস। রয়েছে ১৫টি পুল কার। ত্রিশ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকেও সেখানে পড়তে আসে ছাত্রছাত্রীরা। বর্তমানে ৪০টি কক্ষ রয়েছে মুরলীগঞ্জ হাইস্কুলে। প্রতিদিন নিয়ম করে জাতীয় পতাকা উত্তোলন হয়। জেলা শাসক, মহকুমা শাসক যাতে স্কুলে মোটিভেশনাল ক্লাস নিতে পারেন তারও প্রয়াস চলছে। স্কুলে বসছে মিউজিক সিস্টেম।

মুরলীগঞ্জ হাইস্কুল স্থাপিত হয় ২০০০ সালে। শুরুতে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৬৫ জন। আজ তা হাজার ছাড়িয়েছে।  বর্তমান প্রধান শিক্ষক ২০০৪ সালে এই স্কুলে যোগ দেন, তখন এটি ছিল জুনিয়র স্কুল। আজ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস হয়। যামিনী রায় পুরস্কার পেয়েছে এই স্কুল। সার্ক ভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষা প্রতিনিধিরা এই স্কুল পরিদর্শন করেছেন কেমনভাবে কাজকর্ম চলছে তা দেখতে। প্রধান শিক্ষক বলেন, আজ রিকশা চালকদের ছেলেমেয়েরা কেন সরকারি স্কুল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে! আর সবাই যদি সরকারি স্কুলের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে শিক্ষকদের চাকরি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেবে ভবিষ্যতে। তাই মুরলীগঞ্জ হাইস্কুল সবসময়ই মৌলিক কর্মসূচির দিকে ঝোঁকে। বিশ্বাস, এভাবে শিক্ষার গুণগত মান যেমন বাড়বে, আবার অভিভাবকদের কাছেও বিষয়টা আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

Developed by DXDasia