
শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীচিত্র ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’
১৫ অগাস্টের রাত বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি চরম অন্ধকারময় রাত। ১৯৭৫ সালের এই দিনে ঢাকার ধানমন্ডিতে কী ঘটেছিল, এ কথা সবাই জানে। সেই রাতে ধানমন্ডির বাসভবনে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ড চলেছিল বঙ্গবন্ধুর। যিনি বাঙালির অধিকার রক্ষায় ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত বিভাজন আন্দোলন এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কেন্দ্রীয়ভাবে নেতৃত্ব দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন ‘জাতির জনক’। হত্যা করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সহ তাঁর পরিবার এবং ব্যক্তিগত কর্মচারীদের। রেহাই পান কেবল তাঁর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।
মুজিব: একটি জাতির রূপকার সিনেমার দৃশ্যে আরিফিন শুভ, ছবি: ফেসবুক
‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ হতে পারতো শুধু এক বিশ্বখ্যাত রাজনীতিকের শিহরন জাগানো সমাপতনের চলচ্চিত্র কিন্তু তা হয়নি। অতীত ফিরে ফিরে আসে। উইলিয়াম ফকনার বলছেন, “অতীতের মৃত্যু হয় না কখনও, এমনকি অতীত বলে কিছু নেই।” সেকথা মনে করাতেই হয়তো নব্বই ছুঁই ছুঁই বয়সে এমন মহার্ঘ্য এবং বিতর্কিত একটি কাজ করে ফেললেন প্রখ্যাত পরিচালক শ্যাম বেনেগাল। বঙ্গবন্ধু-কে নিয়ে এই প্রথম এত বড়ো পরিসরে কাজ হল। বাংলাদেশ-ভারতে ১৩ অক্টোবর ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন ‘লার্জার দ্যান লাইফ’, বর্ণময় চরিত্রকে নিয়ে সিনেমা- বিতর্ক হবে না তা কি হয়! তবে, ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ শুধুই একটি সিনেমা নয়। অবিভক্ত বাংলাদেশের অতি সাধারণ এক কিশোরের ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠার সফল চিত্রায়ন। ন্যাশানাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন ইন্ডিয়া (NFDCI) ও বাংলাদেশ ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (BFDC)-এর যৌথ প্রযোজনার এই ছবি বিনোদনের জায়গা থেকে আমরা যেভাবে সিনেমাকে চিন্তা করি, সেই ভাবনা থেকে একটু সরে এসে সিনেমাটিকে দেখতে হবে।
গ্রামের দুরন্ত এক কিশোর। সারাক্ষণ খেলা আর বন্ধুদের নিয়ে মেতে থাকে। বন্ধুদের হয়ে কখনো প্রতিবাদ করতে গিয়ে জড়িয়ে পড়ে মারামারিতে। বাবার কাছে নানা অভিযোগ আসতে থাকে। কিন্তু কিশোর অন্যায়কে মেনে নেয় না। অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়েই একসময় কিশোর মুজিব জড়িয়ে যান রাজনীতিতে। অংশ নেন ভাষা আন্দোলনে। যুক্ত হন রাজনীতিতে। গণ–অভ্যুত্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধের ডাক—ইতিহাসের সেইসব ঘটনা উঠে এসেছে সিনেমায়। বলে রাখা ভালো, এ ছবিতে শুধুমাত্র জননেতা-রাজনীতিক মুজিবকে দেখানো হয়নি, সারা ছবি জুড়ে রাজনীতির বাইরের বঙ্গবন্ধুও আছেন। দেখা যাবে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের নানা অজানা গল্প।
তরুণ রাজনীতিক হিসেবে প্লেনের জানলা থেকে বাংলাদেশের ল্যান্ডস্কেপ দেখা, সাইকেলে চেপে ঘুরে বেড়ানো, জনগনকে বোঝানো ‘বাংলা শুধু একটা ভাষা নয়, আমাদের মা’ এছাড়া প্রেমিক হিসেবে, বাবা হিসেবে, জননেতা হিসেবে স্বয়ং ‘মুজিব’ই যেন পর্দায় উঠে এসেছেন। শিহরিত হতে হয় সেই দৃশ্যে, যখন সৈনবাহিনী তাকে ঘিরে রেখেছে আর মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে বাংলার মাটি মুঠোভরে মাথায় ঠেকাচ্ছেন মুজিব। গাড়ির হেডলাইটের আলোয় তাঁর মুখ ঝলসে যায় এবং অভিব্যক্তিতে ধরা পড়ে হার না মানার পরাক্রম। অন্ধকারের মাঝে তিনি যেন সূর্যের এক সন্তান।
মুজিব: একটি জাতির রূপকার সিনেমার দৃশ্যে আরিফিন শুভ, ছবি: ফেসবুক
ছবিতে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ, শেখ হাসিনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন নুসরাত ফারিয়া এবং বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছার চরিত্রে নুসরাত ইমরোজ তিশা অভিনয় করেছেন। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মধ্যে তাজউদ্দীন আহমদের চরিত্রে রিয়াজ আহমেদ অভিনয় করেছেন। সিনেমায় বঙ্গবন্ধুর পিতা শেখ লুৎফর রহমানের চরিত্রে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী।
বাংলাদেশের এত তারকাকে একসঙ্গে আগে কোনো সিনেমায় দেখা যায়নি। সিনেমাটিতে ১৫ জনের বেশি জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা রয়েছেন। আরিফিন শুভ এই সিনেমার জন্য মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছেন অভিনেতা। শুটিং হয়েছে মুম্বাইয়ের দাদাসাহেব ফালকে ফিল্ম সিটিতে। সেখানেই তৈরি করা হয়েছিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, খেলার মাঠ, মিছিল-মিটিংয়ের স্থান, থানা; কোথাও আবার শেখ মুজিবের স্মৃতিবিজড়িত কলকাতার বেকার হোস্টেল। পরে শুটিং হয়েছিল বাংলাদেশের টুঙ্গিপাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও বেশ কিছু লোকেশনে।
মুজিব: একটি জাতির রূপকার সিনেমার দৃশ্যে আরিফিন শুভ, ছবি: ফেসবুক
একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে ‘শ্যাম বেনেগালচিত’ সিনেমা এটি নয়। তবু, পরিচালকের ভূমিকায় তাঁর নাম না থাকলে হয়তো এত বিতর্ক নিয়ে আপামর বিশ্বের বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারতো না। দুই বাংলার অভিনেতারা এই সিনেমার জন্য নিজেদের ১০০ শতাংশ পরিশ্রম দিয়েছেন তো বটেই, এই ছবির জন্য কঠোর অধ্যাবসায়ের মধ্যে দিয়ে গেছেন ভারতীয় তথা বাঙালি সংগীত পরিচালকের শান্তনু মৈত্র। তাঁর সংগীতের কথা আলাদা করে বলতেই হবে, কারণ এ ছবির বুনিয়াদি স্তম্ভ হল গান। ‘মুজিব’সিনেমার একমাত্র মৌলিক গান ‘অচিন মাঝি’। জাহিদ আকবরের লেখা ও রথিজিৎ ভট্টাচার্যের গাওয়া সেই গানটিও দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়া, মন ভরিয়েছে ঊর্মি চৌধুরী ও কোরাসে কণ্ঠে অদিতি বোস ও সাহ্নিতি নস্করের গাওয়া বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ‘কী কী জিনিস এনেছো দুলাল’। এর চিত্রায়নেও ধরা পড়ে পুরোনো বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক নির্যাস।
ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন অতুল তিওয়ারি ও শামা জাইদি। কিছু কিছু দৃশ্য, সংলাপ এতটাই বাস্তব হয়ে উঠেছে, যে গায়ে কাঁটা দেবে। মনে হবে না এটা সিনেমা। মন ভরবে এ প্রজন্মেরও। শুধু রাজনৈতিক দিকে আলো ফেললে বোধহয় তা সম্ভব হত না। এই ছবি সফল ভাবে বাঙালির স্মৃতিকাতরতা, সংবেদনশীল মনকে স্পর্শ করেছে। তথ্যবিভ্রাট, অসংখ্য সমালোচনা স্বত্বেও এই সিনেমাটা দেখার পর আপামর দর্শকের চোখ ভিজে যায়, আর এটাই বোধহয় এই সিনেমার জয়।
একনজরেঃ
মুজিব: একটি জাতির রূপকার
পরিচালক: শ্যাম বেনেগাল
চিত্রনাট্য: শামা জাইদি, অতুল তিওয়ারি।
অভিনয়ে: বাংলাদেশের দিলারা জামান, খায়রুল আনাম সবুজ, ফজলুর রহমান বাবু, তৌকীর আহমেদ, আরিফিন শুভ, নুসরাত ইমরোজ তিশা, চঞ্চল চৌধুরী, নুসরাত ফারিয়া, সাবিলা নূর প্রমুখ। ভারতের শিল্পীদের মধ্যে আছেন রাজেন মোদি, শ্রীজা ভট্টাচার্য, দেবাশীষ নাহা, সোমনাথ, আবির সুফি, অরুণাংশু রায়, কৃষ্ণকলি গাঙ্গুলি প্রমুখ।
ভাষা: বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি
লোকেশন: টুঙ্গিপাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মুম্বাইয়ের দাদাসাহেব ফালকে ফিল্ম সিটি
দৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট
প্রযোজনা: বিএফডিসি (বাংলাদেশ) ও এনএফডিসি (ভারত)
