
যদিও মাস দুয়েক পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়
বাংলার গল্প হোক, কিংবা চলমান শহর কলকাতার চিনা হকারের অতীত কথাই হোক। হোক না মৃণাল সেনের ছবি। স্বার্থে ঘা লাগলে যেন সবাই হীরক রাজা। কথায় আছে, লঙ্কায় যেই আসে সেই যেন রাবণ। নিন্দুকরা বলেন, শিল্পীর স্বাধীনতা গলা টিপে মারার যে প্রয়াস লক্ষ করা গেছে কালের সীমারেখা পেরিয়ে, তার থেকে ব্যতিক্রম নয় বাংলা ছবিও। শিল্পও যে গলা উঁচু করে কথা বলতে পারে না, তার প্রমাণ একাধিক। প্রমাণ খোদ মৃণাল সেনের ছবিও।
শতবর্ষের আলোকে বিচার করলে মৃণাল সেনও দ্বিতীয় ছবির ক্ষেত্রে সহজে চেকপোস্ট পেরোতে পারেননি প্রথমে। বক্সঅফিসে পরে সাফল্য পেলেও প্রথমে কেন্দ্রীয় সরকারই বিষয়বস্তুর কারণে সেই সময়ের চিনা সম্পর্ক এই সিনেমার পথ আটকে দাঁড়ায়। ১৯৫৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল মৃণাল সেন পরিচালিত ‘নীল আকাশের নীচে’। মৃণাল সেনের দ্বিতীয় ছবিতে অভিনয় করেছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, মঞ্জু দে, বিকাশ রায় প্রমুখ।

কী আছে ছবিতে
মৃণাল সেনের প্রথম পর্বের ছবিগুলির মধ্যে ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে আমরা বাসন্তী নামের এক নারী চরিত্রকে পাই। বিপরীতে এক চিনা ফেরিওয়ালা ওয়াং লু। ১৯৩০ সালের ভারতবর্ষ তথা কলকাতার সামাজিক চিত্র, লবন সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আন্দোলন, বিদেশি দ্রব্য বর্জন আন্দোলন ইত্যাদি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ। এইরকম প্রেক্ষাপটে চিনা ফেরিওয়ালার সঙ্গে এক ভারতীয় নারীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এখানেই নাটকের আখ্যান আরম্ভ। দেশে তখন স্বদেশি আন্দোলন তুঙ্গে। চিনা ফেরিওয়ালার জিনিসের প্রতি অনীহা আসলে বিলিতি দ্রব্যের বর্জন, নাকি গরিবের দেওয়া উপহার – তা ব্যারিস্টারের স্ত্রী বাসন্তীর কাছে প্রশ্নচিহ্ন রেখে যান মৃণাল সেন।
কেন নিষিদ্ধ হয় এই ছবি
নীল আকাশের নীচে নিষিদ্ধ করে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার। সে সময় চিন বিরোধী হাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বস্তুত, দেশে সরকার নির্দেশিত প্রথম নিষিদ্ধ ছবি এটিই বলে জানাচ্ছেন চলচ্চিত্র সমালোচকরা। যদিও মাস দুয়েক পরে ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: মৃণালে জড়িয়ে থাকা মহাপৃথিবীর সন্ধানে

তিব্বতের বিদ্রোহ দমনের প্রেক্ষিতে এবং পঞ্চশীল-চুক্তির প্রেক্ষিতে চিনা সরকারের এই ঘটনা রাজনীতি সচেতন মৃণাল সেন বিলক্ষণ জানতেন৷ অতএব, ১৯৫৮ সালের কোনও এক সময় মহাদেবী ভার্মা-র চার পাতার ছোটো গল্প ‘চীনি ফেরিওয়ালা’ নির্ভর (মৃণাল সেন অবিশ্যি ‘গল্প’ শব্দটি ব্যবহার করেননি তাঁর এক সাক্ষাত্কারে৷ বলেছিলেন ‘মেমোয়ারস’ অর্থাৎ, স্মৃতিকথা) ‘নীল আকাশের নীচে’-র চিত্রনাট্য যখন তিনি লিখছেন, তখন খুব সচেতন হয়েই লিখছেন ধরে নিতে হবে৷ সেই হিসেবে ‘নীল আকাশের নীচে’ মৃণাল সেনের প্রথম প্রত্যক্ষ-রাজনৈতিক সিনেমা।
কলকাতা শহরের লাইটহাউস এবং অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহে (পূর্ণ-প্রাচী-রাধা) যখন মৃণাল সেনের দ্বিতীয় ছবি ‘নীল আকাশের নীচে’ হইহই করে চলছে (১৯৫৯-এর ২০ ফেব্রুয়ারি মুক্তি) তখন এক গভীর রাত্তিরে তিব্বতের লাসা থেকে ছদ্মবেশে কয়েকজন অনুচরকে নিয়ে দুর্গম হিমালয় পেরিয়ে ভারতবর্ষে পালিয়ে আসছেন দলাই লামা৷ ১৯৫৯ সালের ১৭ মার্চ তিব্বত ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার বছর তিনেক আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এ রকম একটা দিন ভবিষ্যতে আসবে৷ তাই ১৯৫৬ সালেই এ দেশে এসে জওহরলাল নেহরুকে বলেছিলেন প্রয়োজন পড়লে এ দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় তিনি নেবেন৷ তিনি যখন হিমাচল প্রদেশের ধরমশালায় এসে আশ্রয় নিচ্ছেন ততদিনে জনগণপ্রজাতন্ত্রী চিন দেশের সরকার তিব্বতের বিদ্রোহ দমন করে তাদের পছন্দের পাঞ্চেন লামাকে তিব্বতের প্রধান করে দিয়েছে৷ অথচ এর অনেক আগেই, ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে তিব্বতে বাণিজ্য ঘিরে চিন-ভারতের মধ্যে পঞ্চশীল শান্তি চুক্তি হয়েছে৷ জওহরলাল নেহরু এবং চৌ-এন লাই দুজনেরই সম্মতিক্রমে৷ ঐতিহাসিকদের মতে দলাই লামার এই তিব্বত থেকে চিনা আক্রমণের কারণে পালিয়ে আসা ইতিহাসে ‘অন্যতম নিষ্ক্রমণ’ হিসেবে চিহ্নিত৷

তিব্বতের বিদ্রোহ দমনের প্রেক্ষিতে এবং পঞ্চশীল-চুক্তির প্রেক্ষিতে চিনা সরকারের এই ঘটনা রাজনীতি সচেতন মৃণাল সেন বিলক্ষণ জানতেন৷ অতএব, ১৯৫৮ সালের কোনও এক সময় মহাদেবী ভার্মা-র চার পাতার ছোটো গল্প ‘চীনি ফেরিওয়ালা’ নির্ভর (মৃণাল সেন অবিশ্যি ‘গল্প’ শব্দটি ব্যবহার করেননি তাঁর এক সাক্ষাত্কারে৷ বলেছিলেন ‘মেমোয়ারস’ অর্থাৎ, স্মৃতিকথা) ‘নীল আকাশের নীচে’-র চিত্রনাট্য যখন তিনি লিখছেন, তখন খুব সচেতন হয়েই লিখছেন ধরে নিতে হবে৷ সেই হিসেবে ‘নীল আকাশের নীচে’ মৃণাল সেনের প্রথম প্রত্যক্ষ-রাজনৈতিক সিনেমা।
মৃণাল সেন স্বীকার করেন ছবিটি সেন্টিমেন্টাল, ছবির কাঠামোতেও অনেক গণ্ডগোল আছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে তিনি এখনও একমত৷ কিন্তু কী সেই বক্তব্য? “আমি বলতে চেয়েছিলাম যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে একসূত্রে বাঁধা৷ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মূলত এক৷ আমার এখনও মনে হয় আমার চিন্তাধারা ভুল ছিল না৷” ভারত সরকার নির্দেশিত এটা প্রথম নিষিদ্ধ ছবি বলে মনে করেন সমালোচকরা। যদিও ২ মাস পরে মৃণাল সেনের দ্বিতীয় ছবি মুক্তির আলো দেখে।

রাষ্ট্রের সুরে সুর না মেলালেই মানুষ রাষ্ট্রদ্রোহী হয় না, হয় না রাষ্ট্রের দুশমন বা সমাজের শত্রু। যে সব বৃত্তি মানুষকে পশু থেকে পৃথক করেছে তার মধ্যে সবার সেরা হচ্ছে Reason বা যুক্তি। শিল্পী যদি গলা উঁচু করে কথা না বলতে পারেন, কিংবা যদি তাঁর শিল্পের মধ্যে চোখে আঙুল দিয়ে ভালো-মন্দ নির্দেশ করতে না পারেন, তাহলে সেই সমাজ স্বৈরাচারের নামান্তর। সেখানে বাক স্বাধীনতা রসাতলে। তাহলে একটা প্রশ্ন কি এসে যায় না যে, যেই যখন ক্ষমতায় তখন তার রক্তচোখ যেন হীরকের রাজার মতো স্বৈরাচারী! মুখোশের আড়ালে আসলে সেও লঙ্কেশ্বর! এখানে শিল্পী ও শিল্পকেও গলা নামিয়ে শাসকের সুরে কথা বলতে হয়, এটাই কি দস্তুর? সময় উত্তীর্ণ হলেও মৃণাল সেনের শতবর্ষ-এর লগ্নে এই প্রশ্নই রেখে যায় নীল আকাশের নীচে।
