মৌসুমী বিশ্বাস : মুর্শিদাবাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সময়ের মহিলা কৃষক

উদ্ভাবন করেছেন এম-যামিনী নামে একটি সুগন্ধি ধানের জাত

ন্নতমানের চাষে জেলার চাষিদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন মুর্শিদাবাদ দৌলতাবাদ, ছয়ঘড়ির (মণ্ডলপাড়া গ্রাম) প্রথম পূর্ণাঙ্গ সময়ের মহিলা কৃষক মৌসুমী বিশ্বাস। মৌসুমী মুর্শিদাবাদের একমাত্র মহিলা কৃষক, যিনি নিজের হাতে চাষ থেকে শুরু করে মাথায় করে বাজার পর্যন্ত নিজের উৎপাদনকে পৌঁছে দেন। জেলা ছেড়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর ধানের বীজ নিয়ে সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিজ্ঞতা। পেট চালাতেই একদা কয়েক কাঠা জমিতে সবজি চাষ দিয়ে চাষাবাদ শুরু। এখন নিজের কৃষি জমির পরিমাণই ৫ বিঘার বেশি। এখনও নিয়মিত ক্ষতিকর কীটনাশক ও রাসায়নিকহীন সবজি চাষ করেন।

পেট চালাতেই একদা ৫ কাঠা জমিতে সবজি চাষ দিয়ে চাষাবাদ শুরু। কীটনাশক, রাসায়নিক ছাড়া উন্নতমানের চাষে জেলার চাষিদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন।

আট-দশ বছর ধরে কলা, পেঁয়াজ সহ ধানের বীজ নিয়ে মাঠে বসেই গবেষনা চালিয়েছেন। বছরের পর বছর চাষের অভিজ্ঞতা এবং চাষাবাদের দক্ষতা থেকে সাফল্যের স্বীকৃতি মিলেছে ধানে। প্রথমে নলাক আর আই আর -৩৬ ক্রস করে। তারপরেও চার বার ক্রস চালিয়ে আনেন নতুন ভ্যারাইটি ‘এম যামিনী’। কম জলে ও শুষ্ক আবহাওয়ায় অধিক ফলনশীল ধান চাষের জন্য উপযুক্ত। গুজরাট ও পশ্চিমবঙ্গ সহ নানা জায়গায় ফলন দিতে শুরু করে এই বীজ। চাষিরা বিঘাপ্রতি ৬/৭ কুইন্টাল বেশি ফলনের রিপোর্ট দেয়। সেচ কম, রোগ কম, আবার ফলনওবেশি। মৌসুমীর ডাক পড়ে দিল্লি ও গুজরাটে যাওয়ার। লকডাউন বাধ সাধলে ভিডিওতেই পাঠানো হয়েছিল ধানের বীজ নিয়ে তাঁর সাফল্য ও কাজের বার্তা। লকডাউন ও আমফানে অনেকটাই ক্ষতি হয়েছিল তাঁর চাষের। সে ধাক্কা সামলে উঠতে পাশে পেয়েছিলেন একাধিক হিতাকাঙ্খীকে।

মৌসুমীর উদ্ভাবন করা এম যামিনী স্থানীয় কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে গবেষণার পর পাঠানো হয়েছিল ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশন ইন্ডিয়া-তে । মৌসুমীকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে হাজির করেছে এই প্রতিষ্ঠান। এনআইএফ (ন্যাশনাল ইনোভেশন ফাউন্ডেশন) – ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের (ডিএসটি) একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, প্রযুক্তিগত সৃজনশীল উদ্ভাবকদের জায়গা করে দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। 

কৃষকরত্ন, কৃষকসম্মান, মাটি সম্মান, কৃষক রবি – রাজ্য সরকার মারফত একাধিক স্বীকৃতি পেয়েছেন মৌসুমী। এছাড়া, প্রতি নারী দিবস-এ সম্মান-সংবর্ধনা জুটতেই থাকে।

এম যামিনী বীজ স্বীকৃতি পেলে ক্রমশ ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাওয়া মুর্শিদাবাদের জমিতে কম সেচে, কম রাসায়নিকে অধিক ফলন হবে ধানের। এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে এম যামিনী প্রজাতির স্বীকৃতি না মিললেও মহিলার উদ্যমকে সাধুবাদ জানিয়েছেন জেলার কৃষিকর্তারাও। বহরমপুরের সহকারি কৃষি অধিকর্তা গত বছর এক সংবাদপত্রকে বলেছিলেন, যে কোনও পরামর্শের প্রয়োজন হলেই মৌসুমী ফোন করেন তাঁদের। তাঁরাও সানন্দে সাহায্য করেন। জেলায় কৃষিমেলা হলে মৌসুমী হন অন্যতম আকর্ষণ। তাঁর নতুন ধানের ভ্যারিয়ান্ট নিয়ে সরকার ভাববে, এমন আশ্বাসও দিয়েছিলেন। স্বীকৃতি মিলুক না মিলুক, জেলার বহু চাষির কাছে মৌসুমীই এখন নানান চাষের সুলুক সন্ধান। যে কোনো সমস্যায় ফোন আসে তাঁর কাছেই।

একদিন সংসারের হাল ধরতে পড়া ছেড়ে চাষবাস শুরু করেছিলেন, এখন তিনিই দিশা দেখাচ্ছেন কয়েকশো কৃষককে। মৌসুমী তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী। পড়াশোনা ঠিকই চলছিল হঠাৎই একটা দুঃসংবাদ ঘুরিয়ে দিল জীবনের মোড়। দাদার মৃত্যুই জীবনের গতিপথ পালটে দেয় মৌসুমীর। মায়ের চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। সংসার বাঁচাতে তাই বাবার রেখে যাওয়া কয়েক কাঠা জমি আর কৃষি সরঞ্জাম নিয়ে মাঠে নেমে পড়েন। নিজে হাতে চাষাবাদ শুরু করেন। মেয়ে হয়ে মাঠে নামায় সহ্য করতে হয়েছিল গঞ্জনা। সেসব পেরিয়ে চাষে সাফল্য আসায় মাটির বাড়ি ভেঙে একতলা পাকা বাড়ি তুলেছেন। ধীরে ধীরে জমি বাড়িয়েছেন।

 

সেই জমিতে ফলছে পটল, বেগুন, লঙ্কা, লাউ, কুমড়ো সহ বিভিন্ন ফসল। রয়েছে একটি কলা বাগান। একটি পানের বরজ। রোজ নিজে হাতেই ক্ষেতের পরিচর্যা চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষি দফতরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এবং কৃষি বিজ্ঞানীদের পরামর্শ নিয়ে মৌসুমী এখন কৃষিকাজে দক্ষ হয়ে উঠেছেন। এলাকার কৃষকরা তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসেন। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তিনি কৃষকদের পরামর্শ দিতে যান। ঘরে ভর্তি একাধিক স্মারকে।

জীবন যুদ্ধ আজও চালিয়ে যাচ্ছেন মৌসুমী। তাঁর এতদিনের সংগ্রাম ও গবেষণায় নতুন পালক সংযুক্ত হওয়ার অপেক্ষা। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে মহিলা কৃষক হয়েছেন, এম যামিনী স্বীকৃতি পেলে তাঁর সন্তানই যেন পরিচয় পাবে।

তথ্যসূত্র:
জিনাত রেহেনা ইসলাম
National Innovation Foundation-India (NIF)

Developed by DXDasia