
মহিলা পুরোহিত নন্দিনী ভৌমিকের সাক্ষাৎকার
“নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার/ কেন নাহি দিবে অধিকার/ হে বিধাতা?” – ‘সবলা’ কবিতায় এই প্রশ্ন তুলে ধরেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর শিক্ষায় দীক্ষায় নারীদের প্রকৃত সবলা করে তুলতে এগিয়ে এসেছিলেন রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেথুন সাহেব প্রমুখ মুক্তমনা ব্যক্তিরা। কিন্তু তারপর? তারপর নারীরা নিজেরাই খুঁজে নিয়েছে মুক্তির পথ। তাই আজকে চাষবাস থেকে চন্দ্র অভিযান সর্বত্রই পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে মেয়েরা। তবু পৌরহিত্য আজও পুরুষ প্রধান পেশা। ধীরে ধীরে ভাঙছে এই অসাম্য, এগিয়ে আসছে মেয়েরা আর এই ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে ‘শুভমস্তু’। যারা শুধু পুজোপাঠ নয়, বৈদিক মন্ত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেন নারী-পুরুষের সাম্যকে। কীভাবে কাজ করেন তাঁরা? বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া পুরোহিত নন্দিনী ভৌমিকের (Nandini Bhowmik Priest) সাক্ষাৎকারে উঠে এল নানান অজানা কথা।
________
ছোটোবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক আবহে আপনার বড়ো হয়ে ওঠা। মায়ের হাত ধরেই শুরু হয় নাটকের চর্চা, কিন্তু পুজোপাঠের ক্ষেত্রেও কি পারিবারিক ভূমিকা ছিল?
নন্দিনী: অবশ্যই, আমার বড়ো হয়ে ওঠা আধ্যাত্মিক আবহে। বাড়িতে সাংস্কৃতিক চর্চার পাশাপাশি নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো অর্চনা হয়। আর বাবা ছিলেন গৃহী সন্ন্যাসী। ছোটোবেলায় বাবার কাছেই পুজো, যোগাভ্যাস এগুলো শিখেছি। বাবা বলতেন শুধু সুস্বাস্থ্য নয়, যোগাভ্যাসের মাধ্যমে অধ্যাত্ম চেতনারও বিকাশ ঘটে। এভাবেই মনের মধ্যে মুক্ত অধ্যাত্মবাদ জন্ম নিয়েছিল।
কলেজে অধ্যাপনা, গ্রুপ থিয়েটার, তারপরেও পৌরহিত্যের সূচনা। এর পিছনে কারণ কী ছিল?
নন্দিনী: পৌরহিত্যের সূচনা মূলত আমার শিক্ষিকা গৌরী ধর্মপালের জন্যই। গৌরীদির নিজস্ব লাইব্রেরি থেকে আমাদের (আমি এবং আমার সহপাঠিনী রুমা) হাতে আসে তাঁর লেখা পুরোনতুন বৈদিক বিবাহ বইটি। তখন গৌরীদিও বলেন তাঁর লিখিত এই বই এবং বিবাহ পদ্ধতির কথা। তিনি আরও বলেন যে, তিনি নিজে এবং তাঁর কিছু ছাত্রীও কয়েকটি বিয়ের পৌরহিত্য করেছেন। সত্যি বলতে আমরা তখন এই বিষয়ে তেমন কিছুই জানতাম না। তখন তিনিই আমাদের বলেন “এই কাজটা অনেকদিন বন্ধ হয়ে আছে, তোমরা আবার শুরু করবে?” আমরা রাজি হয়ে যাই। তখন আমার বড়ো মেয়ের বিয়ে একদম সামনে। সেই বিয়ে থেকেই আমার পৌরহিত্যের সূচনা।

নন্দিনী ভৌমিকের পৌরহিত্যে বৈদিক মতে বিবাহ
তার মানে আপনার পৌরহিত্য করার পূর্বপরিকল্পনা ছিল না?
নন্দিনী: একেবারেই না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পৌরহিত্যের শুরুর দিকে আমার বাবা আমাদের সঙ্গে থাকতেন, কারণ তখন বাবা যজ্ঞ করতেন। আমি যজ্ঞ করতে শিখি বাবার কাছেই।
গৌরী ধর্মপালের ‘পুরোনতুন বৈদিক বিবাহ’ এবং ‘শুভমস্তু’-র বিবাহ পদ্ধতিতে কতটা পার্থক্য আছে?
নন্দিনী: সময়ের চাহিদা মেনে গৌরীদি জীবিত থাকাকালীন সময়েই তাঁর অনুমতি নিয়ে বিবাহ পদ্ধতিতে আমরা কিছু সংযোজন ও পরিমার্জন করি, যেমন মন্ত্রের পাশাপাশি গান যোগ করা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর আমাকে মারাত্মক আক্রমণের শিকার হতে হয়। তখন পুরোপুরি নতুন ভাবে আমি লেখা শুরু করি। এখন সেই পদ্ধতিতেই বিবাহ অনুষ্ঠান করা হয়। শুধু বিবাহ নয়, এখন অন্নপ্রাশন, গৃহপ্রবেশ, পারলৌকিক ক্রিয়া, বাৎসরিক, পুজো সবরকম সামাজিক অনুষ্ঠানই আমরা করি।
পারলৌকিক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা উত্তরণের কথা বলি, কারণ আমরা বিশ্বাস করি মৃত্যু উত্তরণের পথ। আর, অন্নপ্রাশন ও গৃহপ্রবেশে আমরা প্রকৃতির পুজো করি।
অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘শুভমস্তু’-র নিয়ম প্রথাগত নিয়মের থেকে কতটা আলাদা?
নন্দিনী: সম্পূর্ণই আলাদা। পারলৌকিক ক্রিয়ার ক্ষেত্রে আমরা উত্তরণের কথা বলি, কারণ আমরা বিশ্বাস করি মৃত্যু উত্তরণের পথ। আর, অন্নপ্রাশন ও গৃহপ্রবেশে আমরা প্রকৃতির পুজো করি। কারণ প্রকৃতি যদি ভালো থাকে তাহলে এই শিশুটি ভালো থাকবে, প্রকৃতি যদি ভালো থাকে তাহলে পরিবারের সদস্যদের স্বপ্ন দিয়ে গড়া বাড়িটির সদস্যরা ভালো থাকবেন। এক্ষেত্রে আমরা এমন কিছু মন্ত্র বেছে নিয়েছি যেগুলো সামাজিক ভাবেও খুব প্রাসঙ্গিক। যেমন বায়ুর ক্ষেত্রে বায়ু দেবতার পুজো নয়, বরং বায়ুকে দূষণমুক্ত রাখা যে মানুষের কর্তব্য আমরা সেটা বোঝাই। পাশাপাশি পূর্বপুরুষদের পুজো করি আমরা, কারণ এটা ভারতীয় সংস্কৃতির একটা ঐতিহ্য। অন্নপ্রাশনের ক্ষেত্রে শিশুটি বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড়োদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা আমরা বলি, যা মানুষের মনে ভীষণভাবে রেখাপাত করে। ফলে এই পদ্ধতি ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে।

পাত্রী সিঁদুরের তিলক পরিয়ে দিচ্ছেন পাত্রকে
বিবাহের ক্ষেত্রে দেখা যায় বিয়ের আসরে পাত্রীও পাত্রের কপালে সিঁদুরের একটি ফোঁটা দেন। কিন্তু পরবর্তী কালে ছেলেটি তো সেই ফোঁটা প্রতিদিন দেন না। এক্ষেত্রে কি বৈষম্য হচ্ছে না?
নন্দিনী: প্রথাগত বিয়ের পদ্ধতিতে দেখা যায় পাত্রীর করণীয় প্রায় কিছুই থাকে না, সবটাই পাত্রকে করতে হয়। কিন্তু শুভমস্তুর বিবাহ পদ্ধতিতে দুজনেই সমমর্যাদায় বিয়ে করেন। সিঁদুরদানের ক্ষেত্রে আমি লক্ষ্য করলাম ভারতীয় সংস্কৃতিতে পুরুষ, বিশেষত উচ্চবংশীয় এবং উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন প্রায় সব পুরুষই কপালে টিকা বা তিলক পরতেন। কারণ এই টিকা বা তিলককে মাঙ্গলিক চিহ্ন হিসাবে মনে করা হত। এই চিন্তাভাবনা থেকেই বাবার সঙ্গে আলোচনা করে এই রীতি বিবাহ পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত করি। এখানে বিয়ের আসরে আগে স্ত্রী তার স্বামীর কপালে সিঁদুরের ফোঁটা পরান, তারপর স্বামী স্ত্রীয়ের সিঁথিতে মাঙ্গলিক সিঁদুর পরিয়ে দেন। এটাও এক ধরনের নারীর ক্ষমতায়ন। কারণ এক্ষেত্রে উভয়পক্ষই একে অপরের মঙ্গলকামনা করে সিঁদুর পরিয়ে দেন। আর সবকিছু তো একবারে বদল করা সম্ভব নয়, তাই বলা যেতে পারে এটা একটা সূচনা।
সমকামী বিবাহে আপনারা পৌরহিত্য করেছেন কখনও? বা ভবিষ্যতে ডাক যদি ডাক পান সেক্ষেত্রে কী ধরনের নিয়ম হবে?
নন্দিনী: না, এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিই নি। তাঁদের প্রতি আমাদের ভালোবাসা এবং শুভকামনা রয়েছে, তবে যতদিন না ভারতবর্ষে বিষয়টি আইনসিদ্ধ হচ্ছে ততদিন এই ধরনের বিবাহের ক্ষেত্রে আমাদের পৌরহিত্য করার পরিকল্পনা নেই।
বিভিন্ন পুজোর ক্ষেত্রেও নারী পুরুষ, জাতপাতের বিভাজন লক্ষ্যণীয়। সেই বিভাজন আধুনিক সমাজে কীভাবে ভাঙা সম্ভব?
নন্দিনী: মানসিক শক্তি, সততা ও বিশ্বাস থাকলে এই বিভাজন বন্ধ করা সম্ভব। প্রসঙ্গত বলি, আমার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে আমাদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত শালগ্রাম শিলার পুজোর ভার বাবা আমার মা-কে দেন। প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী মেয়েরা শালগ্রাম নারায়ণ শিলা স্পর্শ করতে পারেন না। কিন্তু আমার বাবা মা-কে এই দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে মা প্রতিদিন নারায়ণের পুজো করেন। আমিও শালগ্রাম শিলা স্পর্শ করে নারায়ণ পুজো করি। পুজোর সময় মন্ত্রের পাশাপাশি পঞ্চকবির (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন এবং নজরুল ইসলাম) গান ব্যবহার করি। কারণ যাঁদের গানে বাঙালি সমৃদ্ধ তাঁদের গান ভক্তিরসে ব্যবহার করবো না তা তো হতে পারে না। তবে এই গান ব্যবহারের ক্ষেত্রে একজন আমাকে প্রশ্ন করেছেন রবীন্দ্রনাথ হিন্দু না হওয়া সত্ত্বেও কেন তাঁর গান পুজোয় ব্যবহার করি। তখন তাকে রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায় খুলে দেখতে বললাম, খুঁজতে বললাম কোথায় বিভাজন? আসলে পাপ হয় এই অহেতুক বিভাজনেই। যুক্তি দিয়ে বিচার করে মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর করতে পারলেই সব অসাম্য দূর করা সম্ভব।

৬৬ পল্লির দুর্গাপুজোয় পৌরহিত্য করেছেন মহিলা পুরোহিতেরা, দেশে প্রথম
২০২০ সালে মহিলা পুরোহিত-দের নিয়ে নির্মিত ছায়াছবি ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ মুক্তির পরে সমাজে মহিলা পুরোহিতদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে?
নন্দিনী: হ্যাঁ অবশ্যই, ছবিটি একটি মাইলস্টোন বলা যেতে পারে। প্রায় একবছর ধরে প্রচুর পরিশ্রম করে ছবিটি তৈরি করা হয়। মুক্তির পর দর্শকদের বিপুল সাড়া মেলে এবং মহিলা পুরোহিতদের সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শুধু সিনেমা নয়। টিভি, রেডিও, বিভিন্ন খবরের কাগজ, ইন্টারনেট প্রভৃতি সবধরনের গণমাধ্যম আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে অবশ্যই মানুষ এখন নতুন ভাবে ভাবছেন।
এখানে বিয়ের আসরে আগে স্ত্রী তার স্বামীর কপালে সিঁদুরের ফোঁটা পরান, তারপর স্বামী স্ত্রীয়ের সিঁথিতে মাঙ্গলিক সিঁদুর পরিয়ে দেন। এটাও এক ধরনের নারীর ক্ষমতায়ন। কারণ এক্ষেত্রে উভয়পক্ষই একে অপরের মঙ্গলকামনা করে সিঁদুর পরিয়ে দেন।
২০২১ সালে কলকাতায় ৬৬ পল্লির পক্ষ থেকে দুর্গাপুজোয় পৌরহিত্যের জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়, এবছর সেই ৬৬ পল্লি-সহ মোট চারটি দুর্গাপুজোয় ‘শুভমস্তু’ পৌরহিত্য করছে। তার মধ্যে একটি সুদূর নেদারল্যান্ডসে। এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও মহিলা পুরোহিতেদের কাজ নিয়ে মানুষ আগ্রহী হচ্ছেন।
নতুন প্রজন্মের মেয়েরা পৌরহিত্যের ক্ষেত্রে কতটা এগিয়ে আসছেন?
নন্দিনী: ভীষণভাবে এগিয়ে আসছেন। এখনকার নতুন প্রজন্মের অনেকেই পৌরহিত্য করছেন যারা শুভমস্তুর সঙ্গে যুক্ত নন। এমনকি বিয়ের ক্ষেত্রে ইভেন্ট ম্যানেজারদের কাছেও অনেকে মহিলা পুরোহিত চাইছেন। এটা একটা ভালো দিক। বংশপরম্পরাগত ভাবে নয়, পৌরহিত্যের প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করে অব্রাহ্মণ মানুষও পৌরহিত্য করতে পারেন। আমি চাই মেয়েরা উপযুক্ত শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষিত হয়ে উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পৌরহিত্যকে জীবিকা হিসাবে গ্রহণ করুন।
