অযোধ্যার ফুসফুস নিংড়ে বেরোলো একশোরও বেশি বস্তা জঞ্জাল

অযোধ্যার সবুজ ফিরিয়ে দেওয়ার মরিয়া লড়াই দেড়শোর বেশি ছাত্রছাত্রীর

গত সপ্তাহে হঠাৎই পুরুলিয়া থেকে বন্ধু তরুণের ফোন। “অযোধ্যা পরিষ্কার করব অনেকে মিলে। চলে আয়। ভালো লাগবে।” শুনেই খানিক চমকে গেলাম। এই গরমে অযোধ্যা পরিষ্কার! অযোধ্যা কি ছোট্ট জায়গা! পাহাড়ের পর পাহাড়, বন, ঝরনা… তাকে পরিষ্কার করা মানে তো এলাহি ব্যাপার। এদিকে তরুণ নাছোড়বান্দা। আমি ওকে চিনি। বলছে যখন, তখন ব্যাপারটা সত্যিই ঘটতে চলেছে। ব্যাস, ঠিক করে ফেললাম যাব পুরুলিয়া। এই সুযোগ ছাড়ব না।

তরুণ মাহাতো। আমার বন্ধু। ওর সঙ্গে আমার আলাপের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হল সাইকেল। আমরা দুজনেই সাইকেলে ঘুরতে ভালোবাসি, অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসি। ভালোবাসি পাহাড়, বন, নদী। তরুণ পুরুলিয়ার ছেলে। লাল মাটির গন্ধ লেগে ওর মনে, শরীরে। আদ্যন্ত ভবঘুরে। কিন্তু নিজের শিকড়কে ভালোবাসে খুব। শেষবার যখন পুরুলিয়া গেছিলাম, তরুণ বলেছিল—অযোধ্যাকে নষ্ট করে ফেলছে পরিযায়ী পর্যটকের দল। সপ্তাহান্তের ভিড়ে এসে মোচ্ছব করে সবাই। নোংরা, প্লাস্টিক, মদের বোতল ছড়িয়ে চলে যায়। অথচ, অযোধ্যার পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র খুবই সংবেদনশীল জায়গা। এখানে বন্যপ্রাণী আছে, পাখি আছে। পরিবেশের এই দূষণ ক্ষতি করে তাদেরও। তরুণ তাই ঠিক করেছিল, অযোধ্যাকে পরিষ্কার করার ডাক দেবে। সেই ডাকই এসেছে এখন।

গত শুক্রবার সকালে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে চেপে বসলাম রূপসী বাংলা এক্সপ্রেসে। বাইরে ঝলসে দেওয়া রোদ। তারপর, বিকেলের আগেই তরুণের বাড়ি। পরের দিনই সাফাই অভিযান শুরু। তরুণ ও তার বন্ধু উজ্জ্বল তখনো দুশ্চিন্তায়। এই গোটা কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় সব টাকা তখনো ওঠেনি। সব মিলিয়ে অন্তত হাজার কুড়ি টাকার প্রয়োজন। টাকা জোগাড়ের ব্যবস্থা চলছে।

তাতে অবশ্য, উৎসাহে কমতি নেই কারো। তরুণ জানাল, সাফাই অভিযান শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। হাত লাগাচ্ছে স্থানীয় স্কুলের কচি-কাঁচারা। সঙ্গে চলছে বীজ সংগ্রহ। নানা গাছের বীজ। বর্ষায় সেইসব ছড়িয়ে দেওয়া হবে অযোধ্যার আনাচে-কানাচে। সবুজ অযোধ্যা আরো খানিক সবুজ হয়ে উঠবে। দুশ্চিন্তার মধ্যেই তরুণ বলছিল, টাকা ঠিক উঠে যাবে। অনেকেই এগিয়ে আসছে, চাপ নেই।

সত্যিই টাকা উঠে গেল পরের দিন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন স্থানীয় অনেকেই। ভলান্টিয়াররাও পৌঁছে গেল যথাসময়েই। অযোধ্যা সাফাই করতে জড়ো হল অন্তত দেড়শো জন ছাত্র-ছাত্রীও। প্রায় সবাই স্থানীয় কলেজের পড়ুয়া। গ্রীষ্মের দাবদাহ উপেক্ষা করেই তারা হাজির ‘ক্লিন অযোধ্যা গ্রিন অযোধ্যা’ উদ্যোগে যোগ দিতে।

তরুণ শুরু থেকেই ঠিক করেছিল, এই উদ্যোগে মূলত সামিল করবে ছাত্র-ছাত্রীদেরই। তাদের সংবেদনশীলতা বেশি, সহনশীলতাও। নাহলে এই প্রচণ্ড গরমে পুরুলিয়ার শুকনো ও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ায় এমন পরিশ্রম করে সাফাই অভিযান চালানো অসম্ভব। যাই হোক, অভিযান শুরু হল। রোদ থেকে বাঁচতে মেয়েরা মুখে ও মাথায় জড়িয়ে নিয়েছে ওড়না। ছেলেদের ভরসা টুপি ও রুমাল। ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি হাজির ছিলেন গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী সমাজসেবী সাইক্লিস্ট অক্ষয় ভগতও। অক্ষয় পুরুলিয়ারই ভূমিপুত্র। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সমাজসেবী কয়েকজনও।

দশটা নাগাদ শুরু হল অভিযান। তিন জায়গায় তিনটি দলে ভাগ হয়ে আবর্জনা জড়ো করার কাজ চলতে লাগল। জায়গা তিনটি পুরুলিয়ার তিনটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট– অযোধ্যা হিল টপ, আপার ড্যাম ও বামনি ফলস। এই তিনটি জায়গাতেই পর্যটকদের জমায়েত সবচাইতে বেশি, ফলে দূষণও বেশি। পুরোদমে কাজ চলল বেলা দুটো অবধি। উদ্ধার হল একশোরও বেশি বস্তা জঞ্জাল। কী নেই সেই জঞ্জালে! রাশি রাশি মদের বোতল, প্লাস্টিক র‍্যাপার, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ব্যাগ ও আরো কত কী।

বোঝাই যাচ্ছিল, একটি সাফাই অভিযানে দূষণমুক্ত করা যাবে না অযোধ্যাকে। পর্যটকদের ঢল নামলে দূষণ ফের মাত্রাছাড়া হবে। তাই ঠিক হল, নিয়মিত এমন অভিযান চলবে। সম্ভব হলে প্রতি মাসেই। সচেতনতা নির্মাণের পাশাপাশি খরচ তোলার জন্য আরো জোরদার প্রচার করা হবে। মানুষ নিশ্চয়ই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন।

সেদিনের মতো কাজ মিটলে ক্লান্তি ঘিরে ধরল। যদিও, ক্লান্তির অবকাশ নেই উদ্যোক্তাদের। নতুন নতুন পরিকল্পনা আসছে। কলেজ পড়ুয়ারাও নানা পরিকল্পনা দিচ্ছে। সব মিলিয়ে এক চমৎকার আবহ। জানতে পারলাম, বর্ষায় কয়েক হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে অযোধ্যা জুড়ে। তাছাড়া সংগ্রহ করা বীজগুলো তো আছেই।

ফেরার ট্রেন ধরার আগে তরুণকে বললাম, পরেরবার ফের ডাকতে। যতবার সম্ভব হবে আসব। আর চেষ্টা করব, একা না আসতে। অযোধ্যা কি একা পুরুলিয়ার নাকি? অযোধ্যা তো এই রাজ্যের ফুসফুস। ফুসফুসে ময়লা জমলে শরীর তিলে তিলে এগোয় মৃত্যুর দিকে। তা হতে দেওয়া যায় না।

সুন্দরী অযোধ্যা বেঁচে থাক। বেঁচে থাক তরুণদের এমন উদ্যোগের হাত ধরেই।

 

Developed by DXDasia