হর-পার্বতীর বিশ্রামের স্থান। পুণ্যের মাপকাঠিতে মানস সরোবরের পরেই এর স্থান। রাখতে হবে হাঁটার অভ্যেস আর হাতে সময়

ভারমনি দেবীর মন্দিরে পুজো দিয়েই নাকি শুরু করতে হয় ‘মণিমহেশ যাত্রা’। নাইবা থাকল পুণ্যিলাভে বিশেষ উৎসাহ, ট্রেকিং-এর ‘ওয়ার্ম আপ’ করতে শুরু করি ভারমনিদেবী মন্দির অভিযানে। আপেল ক্ষেতের পাশ দিয়ে রাস্তা উঠে গেছে, যাতায়াত মিলে প্রায় ৮ কিলোমিটার।

কী করে যাবেন
ট্রেনে পাঠানকোট গিয়ে গাড়িতে চম্বা, অথবা সরাসরি ভারমোর। ভারমোরে গাড়োয়াল মণ্ডলের সুন্দর টুরিস্টলজ আছে, অন-লাইন বুক করা যায়। অনেকে হাডসারে থাকেন, তবে সেখানে একেবারে সাধারণ মানের ব্যবস্থা। আমি বলব ভারমোরেই থাকুন। সেখানে মালপত্র রেখে খালি দরকারি জিনিস নিয়ে রওনা দিন ট্রেকিং-এর জন্য। হাডসারে পাবেন পোর্টার, সেই গাইডের কাজ করবে। ফেরার পথে সরাসরি মণিমহেশ থেকে হাডসারে নেমে আসতে পারেন। তবে আমরা ফেরার পথেও থেকেছিলাম ধানচোতে। এই পথে যেতে পারবেন সবাই, যদি বিশেষ কোন অসুস্থতা না থাকে। অবশ্যই কিছুদিন হাঁটার অভ্যেস করতে হবে আর সময় হাতে রাখতে হবে। মনে রাখুন, আমাদের দলের সবার বয়স ছিল ৫৫-র বেশি। অতএব, চরৈবেতি।

পরদিন ভারমোর থেকে গাড়িতে ১৩ কিলোমিটার গিয়ে পৌঁছলাম হাডসার – এখান থেকে পায়ে হাঁটা রাস্তার শুরু। হিমালয়ের পিরপাঞ্জাল রেঞ্জের মণিমহেশ কৈলাস শৃঙ্গ – এই শৃঙ্গের পায়ের কাছে প্রায় সাড়ে তেরো হাজার ফুট উঁচুতে আছে হিমবাহ থেকে তৈরি এক ছোট হ্রদ- মণিমহেশ হ্রদ। অনেক পৌরাণিক কাহিনি জড়িত আছে মণিমহেশ নিয়ে। মণিমহেশ হর-পার্বতীর বিশ্রামের জায়গা। এখানকার অধিবাসী গাদ্দিরা শিবের পূজারী। তারা মনে করেন এই মণিমহেশ শৃঙ্গ কখনও জয় করা যায় না। সে চেষ্টা যারাই করেছে তারাই নাকি পাহাড়ের পাথর হয়ে গেছে। বছরে এক বিশেষ সময় – ভাদ্রমাসের জন্মাষ্টমী থেকে রাধাষ্টমী অর্থাৎ ইংরাজি অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ‘মণিমহেশ যাত্রা’ করতে আসেন বহু পুণ্যার্থী।

কথিত আছে এই সময়ে হর-পার্বতী স্নান করতে আসেন হ্রদের জলে। পুণ্যের মাপকাঠিতে মানস সরোবরের পরেই নাকি মণিমহেশ। হাডসার থেকে মণিমহেশ পর্যন্ত কোনও বসতি নেই। ‘যাত্রা’র সময়ে পুণ্যার্থীদের জন্য তাঁবু ফেলা হয়, খোলা হয় লঙ্গরখানা। পুণ্যার্থীদের সেবা, সেবার পুণ্য।

পুণ্যের লোভ ছিল না, কিন্তু অনেকদিন আগে একটা ছবি দেখেছিলাম বরফে মোড়া পাহাড়ে ঘেরা মণিমহেশ হ্রদে মণিমহেশের ছায়া – এই অপরূপ দৃশ্য স্বচক্ষে দেখার লোভ ছিল সেই থেকেই। কিন্তু এই পথ খোলা থাকে বছরের অল্প সময়, তার মধ্যে ‘যাত্রা’র ভিড় এড়াতে চাই – এত শর্ত আর সময় মেলাতে পারছিলাম না কিছুতেই। অবশেষে সুযোগ হল – ‘যাত্রা’র পরে সেপ্টেম্বরের শেষে রওনা হলাম।

প্রথম দিনের গন্তব্য ধানচো – হাডসার থেকে দূরত্ব ৭ কিলোমিটার। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ গিয়েছে, পাশে চলেছে এক নদী – ঘোই নালা। পুরো রাস্তাই চড়াই। কিছুটা চলেই হাঁফ ধরে, কিন্তু পথের পাশে একটু জিরিয়ে নিলেই ক্লান্তি ভ্যানিশ, আর চারপাশের দৃশ্য এতই সুন্দর যে ক্লান্তি টের পেতে দেয় না। সারা পথেই সঙ্গী হয়েছে ঝরনা আর নদী, কাঠের সাঁকো পেরিয়ে চলা। ‘যাত্রা’ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় লোকজন নেই। পথে তাঁবুর চিহ্ন আছে, আর কিছু নেই। সাথের পোর্টার আশ্বস্ত করলেন ধানচোতে একটা আস্তানা থাকবেই – ‘ঘোড়াওয়ালারা’ যায় যে। বোঝা গেল ছাগল-ভেড়ার পাল নিয়ে যারা যায় তাদের আস্তানা। ধানচো পৌঁছে দেখা গেল এক নয়, দুটো এরকম তাঁবু আছে। ভিতরে পাথরের উপরে কম্বল বিছানো, সামনে খোলা চত্বর, অবিরাম নদীর আওয়াজ, মণিমহেশের হিমবাহ থেকে নেমে আসছে ঝরনা। ধানচোর ঝরনাই বুধিল নদী। গল্প আছে এটাই নাকি বিষ্ণুর বৈকুন্ঠধাম। পথের ক্লান্তির পর মনে হচ্ছে সত্যি এক স্বর্গরাজ্য। চটিওয়ালার কাছে খাবারের সন্ধান করতে দেখলাম তার সম্বল মাত্র গোটাকয়েক আলু। রান্না করে দিল ভাত, ডাল আর আলুসিদ্ধ। আবার সেই আলু থেকে ঘোড়াওয়ালাদের জন্য কিছু সরিয়ে রেখে আমাদের সকালে আলুর পরোটা করে দেবেন, এমন প্রতিশ্রুতিও দিলেন। এ যেন অন্নপূর্ণার ভাঁড়ার।

পরদিন ভোরে আবার চলা শুরু। সে পথ আরও খাড়া – তবে এখন আমাদের নিজেদের উপর ভরসা বেড়েছে। কোনও ব্যস্ততা নেই, বিশ্রাম নিতে নিতে পথ চলা, ৭ কিলোমিটার পথ পেরোতে পারব নিশ্চয়ই। পথে পড়ল এক সাধুর গুহা। সে ডেরায় থাকেন সাধুজি, সঙ্গে আর এক তরুণ সাধু। সাধুজি নিজের হাতে তৈরি করে দিলেন গরম চা। কয়েকদিন পরে তিনিও অন্যদের মতো নেমে যাবেন নীচে। ফেরার পথে সাধুজি একা। অন্য জন কেটে পড়েছেন, তিনি নাকি এসেছিলেন জড়িবুটির সন্ধানে।

পথ যত উঠছে, সবুজ তত কমছে। গাছপালা তো নেই-ই, পাহাড়ের গায়ে অল্প অল্প সবুজ ঘাসের ছোঁয়া। ধানচোর পর থেকেই হিমবাহ এলাকা শুরু। তবে সেপ্টেম্বরের শেষে বরফ নেই, শুধু মণিমহেশের অল্প আগে কিছুটা হিমবাহ এলাকা এ সময়েও পেরোতে হয়। মণিমহেশের তিন কিলোমিটার আগে গৌরীকুন্ড – এটিও পুণ্যস্থান। এখানে নাকি পার্বতী স্নান করেন। এখানে স্নান করে মহিলা পুণ্যার্থীরা যান মণিমহেশ। শেষ তিন কিলোমিটার পথ আর ফুরাতে চায়না। কিন্তু পথ পেরিয়ে কি অপার্থিব দৃশ্য – ঠিক যেমনটি ছবিতে দেখেছিলাম। বিকেলের আলোয় মণিমহেশের চূড়া্য রঙ লেগেছে, আকাশেও সেই রঙের মাখামাখি –হ্রদের জলে তারই ছায়া। খাওয়া রাজমার ডাল ও ভাত, থাকা তাঁবুতে। রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার ভয় কাটিয়ে তাঁবুর বাইরে এলাম – চাঁদের আলোয় দেখব একবার মণিমহেশের রূপ, মণিমহেশের দিকে তাকিয়ে মনে হল সার্থক হয়েছে আমাদের আসা।

Developed by DXDasia