
মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি — পর্ব ৫
গত পর্বে
এরপর বেশ অনেকদিন মণিদার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়নি, তবে খবর পেতাম। যেদিন মধ্যরাতে মণিদা (সঙ্গে আরও তিনজন) বুড়ো পাঁচতলার টেরাস ঠেকে ঝাঁপ দিয়েছিল বাগানের গাছের কোপে, অ্যারেস্টেড হল তার আগের দিন সন্ধেবেলায়। প্রদীপদা (চক্রবর্তী) আমায় বলেছিল রাতে ওরা কোথায় থাকবে। এরপর কিছুদিন কেউ কোনও খবর পায়নি ঠিক কোথায় কোন জেলে ও আছে। একদিন মাসিমাকে (মণিদার মা) একা পেয়ে বিনয়ের সুরে জানতে চাই ওর খবর। তারপর দেখা করতে যাই নির্দিষ্ট দিনে। বেশ কয়েকবার দেখা হবার পর একদিন বলল, “একটা গান ভেবেছি। ‘কথা দিয়া বন্ধু ফিরা না আইলা…’”। অনেক পরে ১৯৭৫ সালে যখন ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ তৈরি হয়, তখন (এখনও) গানটা আমরা গাইতাম।
পর্ব ৫
জেলের ভেতর অনেক অনেক ঘটনা আছে। কিন্তু সেসব বেশিরভাগই ব্যক্তিগত। ১৭ মাস (সামান্য এদিক ওদিক হতে পারে) জেল খাটার পর মুক্তি। সেখানে শর্ত ছিল আগামী তিন বছর পশ্চিম বাংলার বাইরে থাকতে হবে। কলকাতায় ফিরে এল ১৯৭৫ সালের মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরুর দিকে। এর মধ্যে মণিদার পরিবার পঞ্চাননতলা ছেড়ে নাকতলায় বাড়ি ভাড়া করে উঠেছিল। ঝড়ের বেগে ঢুকে পড়ল পুরোনো পাঁচুদার চায়ের দোকানের ঠেকে।
এর মধ্যে আমার দিনযাপনে কিছুটা রদবদল ঘটেছে। দ্বিজেন বার্মা থেকে এসেছিল শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে (এখন নামও বদলে গেছে। কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটি হয়েছে।) ১৯৭১-৭২ এইরকম কোনো একটা সময়ে নকশালবাড়ি রাজনীতির উপদ্রুত অঞ্চল হিসেবে কলেজ হস্টেল ফাঁকা করে দেওয়া হয়। দ্বিজেন ওই সময় আমাদের পাশের পাড়া বক্সি বাগানে বোনেদের সঙ্গে থাকবে। ওর বার্মিজ গিটার ছিল, স্প্যানিশ। মাঝে মাঝেই ও পাঁচুদার ঠেকে গিটারটা আনত, বাজাত। আসলে বুলার বন্ধু হিসেবে আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। ও গিটার বাজিয়ে হিন্দি গান গাইত। একমাত্র একটা গান পুরোটা জানত— কৌন আয়া হ্যায় মহফিল সে…। গানটা শুনেই আমি বললাম,
— আমায় গিটার শিখিয়ে দেবে?
— আরে আমাদের ওখানে (বার্মায়) তো প্রায় ছেলে-মেয়েরাই গিটার বাজায়। ওদের দেখেই তিন-চারটে কর্ড বাজাতে পারি।
— তাই-ই শিখিয়ে দাও।
— তোমার গিটার আছে?
— না, নেই।
— আমি একটা জাম্বো কিনব। সেক্ষেত্রে এটা তুমি নিতে পারো।

রফা হল ১২০ টাকা আমি দুই মাসে শোধ করব। ও আমাকে C, C মাইনর, A, A মাইনর এই চারটে কর্ড শেখাল। সময় লাগল। এর মধ্যে ওর হস্টেল খুলে গেল, ও চলে গেল। আমি বাড়িতে প্র্যাক্টিস করতে থাকলাম। টানা তিন মাস প্রত্যেকদিন বাজাবার পর হাত একটু সহজ বোধ হল। তখন বাংলা আধুনিক গান প্রায় শুনিই না। রবিবার দুপুরে রেডিও কলকাতা খ (B)-তে মিউজিকাল ব্যান্ডবক্স শুনতাম আর বাড়িতে একটা রেডিওগ্রাম ছিল। ইচ্ছামতো ডিস্ক (তখন আমরা রেকর্ড বলতাম) বাজাতাম/শুনতাম। তখন ভানু (তপেশ ব্যানার্জি) আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিল। ভানুও পঞ্চাননতলায় থাকত। ভালো গান গাইতে পারত। আমরা দুজনে অনেক বাংলা আধুনিক গান গাইতাম, গিটার বাজাতাম। এক মাসে দুটো গান লিখে ফেললাম, সুরও তৈরি করলাম। প্রথম গানটা ছিল 'ফিরে আসব তুমি কেঁদো না, ফিরে আসব' — খুবই সাধারণ গান, মাত্র চারটে কর্ড। দ্বিতীয় গানটা 'অনেক ভাবব আমি সারাদিন সারাবেলা'। (দুটো গানই ২০১১ আর ২০১৫ সালে রেকর্ড করেছিলাম, সিডি অ্যালবাম আকারে)।
এবার আবার ফিরে আসি তিন বছর পর মণিদার ফিরে আসায়, সাল ১৯৭৫। পাঁচুদার ঠেক। অনেক কথা, গল্প, জব্বলপুর, ভূপাল — সকাল গড়িয়ে দুপুর। কদিন পরেই পয়লা বৈশাখ। সকলে মিলে ঠিক করা হল সেদিন একটা বড়ো ঠেক বসানো হবে। সন্ধে থেকে শেষ রাত। যে যখন খুশি চলে যেতে পারে। যারা নিয়মিত ঠেকে আসে না, তাদেরকেও বাধ্য করা হবে ঠেকে আসার জন্য। যেমন তপন চৌধুরী, রেখা, দীপ্তি আরও কেউ কেউ৷ ভেন্যু ঠিক হল অসীমদার (ঘনাদা নামেই বেশি পরিচিত) তিনতলার ছাদে, খোলা আকাশের নিচে। এই ধরনের আড্ডায় (প্রধানত বা একমাত্র মণিদার উৎসাহে) আমরা সাধারণত গান গাইতাম বা কেউ কবিতা পড়ত। সেদিন মণিদা বলল, সবাইকে কিছু না কিছু করতেই হবে।
(চলবে…)

