
মহীনের তেজি ঘোড়াগুলি — পর্ব ৩
গত পর্বে
মণিদা একদিন সকালে (আমার ছুটির দিন) বাড়িতে এল। খাটের উপরে দুটো এলপি পড়েছিল, দুটোই বিটলস-এর। একটা হেল্প, অন্যটা এ্যাবে রোড। অবাক হয়ে বলল, এসব কে শোনে? বললাম, আমি৷ ও হতবাক! সেই থেকে আমাদের একটা বন্ড তৈরি হল। আমি ওকে এলটন জন এলপি শুনতে দিই, ও আমাকে ট্রিনি লোপেজ দেয়।
হঠাৎ নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ে। ও এলাকা সে এলাকা ঘুরে আমাদের বেহালায়।
পর্ব ৩
এ শহরতলিতে আছড়ে পড়া রাজনৈতিক ঢেউয়ের শব্দ দূষণ, বুলেটের অন্তহীন উল্লাস, সিআরপি মিলিটারির বুটের মেটাল মিউজিক, বামপন্থী-ডানপন্থী-ঈশান পন্থী-নৈঋক পন্থী সবাই এক। যেখানেই নকশাল শুনবে, ঘরে ঢুকে মা-মাসি-বোনকে চু* দাও৷ যুবক দেখলেই গুলি করো — তোমার কোনো আইনি দায়বদ্ধতা নেই। শহর চালায় বাবু আর বেশ্যারা। রাজ্যপাট চালায় আজানুলম্বিত আসমুদ্রহিমাচল মানু, সিদ্ধার্থ, তার সঙ্গে আছে বিশ্ববন্দিতা প্রিয়দর্শিনী।
কে কার হিসেব নেবে?
হঠাৎ একদিন আমাদের রেশন দোকানে মণিদা (গৌতমদা তখন মণিদা হয়ে গেছে) ঝড়ের মতো এসে, ভিড় ঠেলে বলল, সন্ধে ৭টায় জামরুল তলায় অপেক্ষা করবি। প্রদীপ (চক্রবর্তী) তোকে যা বলার বলে দেবে। একইভাবে ঝড়ের বেগে মণিদা ভিড় ঠেলে হারিয়ে গেল।
প্রদীপের কথা অনুযায়ী মণিদার অর্ডার আমাকে ২০০ দেশব্রতী বিলি করতে হবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটা একটা করে নয়, তিন জায়গায় ওটা ভাগ করে দিতে হবে। বিলির দায়িত্ব অন্যদের। তখন হাতে দেশব্রতী দেখলে শ্যুট অ্যাট সাইট অর্ডার ছিল। আর একটা কাজও আমাকে করতে হবে। সেটা শুধুমাত্র দিনের বেলায়। ওরা আপাতত যেখানে abscond করে আছে জায়গাটা আমিও চিনতাম। হয়তো একটু বিরক্ত করছি, তবু আমি লিখবোই। দুধারে দুটো বাড়ির প্রাচীর, মাঝখানে গ্যাপ ঠিক দেড় ফিটের। মাত্র একজন মানুষ গলে যেতে পারে। আপাতভাবে অন্ধ গলি।
আমরা পাড়ার ছেলে নিজেরাই জানতাম ওটা ব্লাইন্ড লেন নয়। ওই সাব বাইলেনে ঢুকলে আনুমানিক ৩০ ফিট এগোলে প্রথম এবং শেষ বাড়িটাই প্রদীপদার (চক্র)। প্রদীপদার বাড়িতে ধাক্কা খেলেই ঠিক ডানদিকে ঢুকলে (অনেকটা হলিউডের উদ্ভট সায়েন্স ফিকশনের মতো) ফাঁকা মাঠ, বেশ কয়েক বিঘে নিয়ে, একটা পুকুর প্রায় দিঘি। পাড়ায় আমাদের মতো কয়েকজন খচ্চর ছাড়া আর কেউ এই জায়গা চিনতেন না, খবর রাখতেন না। আর মিঃ মেহতা — ফুঃ মেহতা — বা** তোমার পাঞ্জাবকেই চেনো না, আর তুমি শালা ঢুকবে ওই এলাকায়, যেখানে ওরা abscond করেছিল কিছু দিনের জন্য। পাড়ার স্বজনরাও কোনোদিন জানত না যে ওখানে ২০/২১ জন ছেলেরা থাকত।
আরও পড়ুন: “প্রেমে ফিদা হলাম বিটলস শুনে”
দিন যায়। রাষ্ট্রযন্ত্রের থাবার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। হাড় ভাঙা বুলেটের শব্দ জ্যোৎস্নার আলোকে ব্ল্যাক আউট করতে পারে না। পারে না বেয়নেট কাশফুলের এপাশ ওপাশ সোহাগ বন্ধ করতে।

কিন্তু তারা অনেক কিছু করতে পারে। তারা ওয়ারেন্ট বার করতে পারে, পারে বডি ওয়ারেন্ট বার করতে৷ করলোও। মণিদার নামে বডি ওয়ারেন্ট বেরলো। কো-ইন্সিডেন্স, কাকতালীয় কোন বিশেষণে বোঝাব জানি না, সত্যি বলছি মাইরি। স্বপ্নাদের বাড়ির সামনে দেখা হল আমার মণিদার সঙ্গে। ও গলিতে মধ্যগগনেও সূর্যের আলো ঢোকে না, যেখানে মণিদার সঙ্গে আমার দেখা হল বেলা ৩টের সময়। ঠিক পাঁচ মিনিটের বাক্যালাপে স্থির হল যে, তক্ষুনি মণিদা আর আমি সুন্দরবন যাব প্রায় লুকিয়ে। আমরা পৌঁছালাম গোসাবা। অন দ্য ওয়ে শুনলাম ওর নামে বডি ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে। ও গা ঢাকা দিতে চায়, কিন্তু দলের কারো সঙ্গে নয়— এ কথাটা তখন বুঝিনি। অনেক অনেক পরে আলিপুর জেলে দেখা করার সময় অর্থটা জেনেছিলাম।
(চলবে…)

