
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ৩
স্কুটার চালিয়ে গেলেন সিউরি, মাত্র ৫৫ মিনিটে। গাড়ি রেজিস্ট্রেশন করতে। কিন্তু তাঁরা সবাই হতবাক। এমন গাড়ি বীরভূম জেলায় আগে কখনও দেখেননি কেউ। এটা কোন ক্যাটাগরিতে পড়বে, কেউ বুঝতে পারছিলেন না। সাইড কার স্কুটার জানার পর রেজিস্ট্রেশন হল। গাড়ির নম্বর হল। সেদিন রেজিস্ট্রেশন অফিসের এক অফিসারকে স্কুটারে করে ঘুরিয়েছিলেন মোহন সিং। খেলার মাঠে প্রায়ই নিজেদের তৈরি করা খেলনা হেলিকপ্টার ওড়াতেন মোহন আর টুকু। আসলে তখন ছিল শখ বাঁচিয়ে রাখার সময়। ওড়বার সময়।
(গত পর্বের পর)
“বাংলা না শিখলে তোমার সঙ্গে কথাই বলব না…”
মোহন সিং নিজেকে পাঞ্জাবি বলতে পছন্দ করেন না, আবার তিনি বাঙালিও নন। মানুষটি আসলে আদ্যোপান্ত শান্তিনিকেতনি। এটাই তাঁর প্রথম এবং শেষ পরিচয়। ক্লাসিক্যাল গানের তালিম নেওয়ার সময় কোনো ভাষা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু শান্তিনিকেতনে আছেন, অথচ বাংলা বলতে পারবেন না, তা কী করে সম্ভব! সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলতে বেশ সমস্যা হত। সংগীতভবনের ক্লাসে তখন মাত্র ছয় জন ছাত্র-ছাত্রী। পাঁচজন মেয়ে, আর মোহন একা ছেলে। মোহন সিং তখনও এক অক্ষরও বাংলা জানেন না। হিন্দি আর ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলতে হত সকলের সঙ্গে। এই ক্লাসেই গান শিখত একটি মেয়ে, শুচিস্মিতা। পরবর্তীকালে যাঁর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হবেন মোহন। এই শুচিস্মিতাই প্রথম মোহন সিংকে বাংলা অক্ষর চিনিয়েছিলেন। একইসঙ্গে সংগীতভবনে ক্লাস করছেন মোহন-শুচিস্মিতা। এদিকে বাংলা শেখাও চলছে জোরকদমে। শুচিস্মিতা, ডাক নাম সুমু। একদিন সুমু ‘সহজপাঠ’ এনে দিলেন। মোহনকে বললেন, “বাংলা না শিখলে আমরা তোমার সঙ্গে কথাই বলব না।” শুরু হল প্রেমের সহজপাঠের শুভ সূচনা। সাক্ষী থাকলেন সেই রবীন্দ্রনাথ।
মোহন-শুচিস্মিতা – বিয়ের দিন
‘সহজপাঠ’ হাতে পেয়ে মোহন সুমুকে বললেন, আগে ‘অ আ ক খ’ লেখা বই দাও। দেখলেন হিন্দি অক্ষরের সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য নেই। মাত্র এক সপ্তাহ সময় নিলেন। তারপরেই প্রিয় সুমুকে শোনালেন সহজপাঠ। বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম সেই শুরু। বাকিটা তো ইতিহাস।
সাত বছর বয়সে নষ্ট হয়ে গেল পা
তাঁর ছোটোবেলা। পাঞ্জাবে তখন গান শেখাচ্ছেন অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ধ্রুবতারা যোশি, বিবি ওয়াজেলওয়ারের মতো গুণী পণ্ডিতরা। মোহন সিং গান শিখছেন তাঁদের কাছে। মাত্র সাত বছর বয়সে পোলিও-য় নষ্ট হয়ে যায় দুটো পা। বাড়ির সকলের কাছে হঠাৎ করেই চলে গেলেন খরচের খাতায়। জীবনের সম্বল তখন গান আর হুইল চেয়ার। মোহনের এক পিসতুতো দাদার বন্ধু ছিলেন বলরাজ সাহানি। যিনি শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে ইংরেজি পড়াতেন। সেই বলরাজ সাহানিই একবার বলেছিলেন, মোহন যদি সংগীতভবনে পড়তে যেতে চায়, তাহলে খুব ভালো হবে। তারপরেই সঙ্গে সঙ্গে শান্তিদেব ঘোষকে চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মোহন। এই ঘটনার কথা গত পর্বেই লেখা হয়েছে।
মোহন সিং খাঙ্গুরার পাসপোর্ট সাইজ ফটো
পায়ে পোলিও। কিন্তু সে কোনওদিন থেমে থাকেনি। সে ছুটেছে, সর্বদা ছুটে চলেছে নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে। এই ছোটার ইচ্ছাটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল কে? ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ উত্তর আসবে, “আমার মন”। মোহনকে নিয়ে তাঁর আত্মীয়স্বজনরা ছিলেন নিরাশ। বাড়ির লোকজন প্রথমে ভেবেছিলেন, গানের তো কোনও ভবিষ্যৎ নেই। মোহন সেদিন ভেবে নিয়েছিলেন, দরকার হলে না খেয়ে থাকবেন। কিন্তু গানের শিক্ষাটা তাঁর দরকার। বাড়ি ছিল সম্পূর্ণ নিরামিষাশী। বাংলায় তো সব চলে! মাছ, মাংস! কী করে মানিয়ে নেবে যুবক মোহন! তিনি শুধু মানিয়ে নিলেনই না, তাঁকে নিয়ে চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল।
(চলবে…)
*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত।
