
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ১০
সন্ধেগুলো কাটত বাবার কাছে গল্প শোনার আশায়। যে মোহন একদিন বাংলা জানতেন না, স্ত্রীর কাছে সেই কবে উপহার পেয়েছিলেন ‘সহজপাঠ’। তারপর বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন, সেই মোহন দুই ছেলেকে শোনাচ্ছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’।
“মানুষের আয়ু মানুষের জীবনের ভুল মাপকাঠি। দশ বছরের জীবন সে উপভোগ করেছে দেড় বছরে।” – সেই কবে লিখে গিয়েছিলেন বিভূতিভূষণ। বাবার কাছে এই সব গল্প শুনে আবির হয়তো বুনে চলেছেন নতুন কোনো সুর আর বিক্রমের চোখে তখন হাজার হাজার স্বপ্ন।
(গত পর্বের পর)
স্বপ্নসন্ধানী ছিলেন বিক্রম। বিক্রম সিং খাঙ্গুরা ওরফে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদরের ‘কবি’। সোনাঝুরির উদাত্ত গাছগুলোর দিকে চেয়ে বুঝে নিতেন পাতাদের মর্মরধ্বনি। গাছেরা কীভাবে কাঁদে, কীভাবে বিলাপ করে ইত্যাদি। এই চেয়ে দেখার নেশাই একসময় বিক্রমকে পেয়ে বসল। তিনি আসলে আমাদের সকলকে ভাবতে শিখিয়েছেন, যুঝতে শিখিয়েছেন পরম্পরার সঙ্গে একালের রাগ-অনুরাগ। আর তাই তো বাঁধাধরা সিলেবাস তাঁর ছিল না পসন্দ। পড়াশোনা যে ভাবেই হোক, কবিতা লিখতে হবে পছন্দের কলমে। মোটা মোটা কালিতে লেখা হবে অক্ষরমালা। তাঁর চাই বিশেষ কলম, তাঁর চাই বিশেষ ব্র্যান্ডের সিগারেট। এমনকি বাংলা বানান নিয়েও বিক্রমের খুঁতখুঁতানি কম ছিল না। তথাকথিত সিস্টেমের বা ব্যাকরণের বাইরে বেরিয়ে বাংলা ভাষাকে দেখতে চেয়েছিলেন নিজের মতো করে। তাই তাঁর কবিতায় ‘সাদা’ হয়ে গেছে ‘শাদা’। অনেকটা জীবনানন্দ দাশের মতোই। বিক্রম বলতেন, তালব্য-শ দিয়ে শাদা না লিখতে পারলে শ্বেতত্বটা ঠিক ফোটে না। দন্ত্য-স দিয়ে লেখা সাদা যেন বড্ড ফ্যাকাসে। তাছাড়া তাঁর মতে তালব্য-শ-এর ভিজ্যুয়াল অ্যাপিল অনেক বেশি। কবিতা লেখার পর অনেক রাত হয়ে যেত। ভাই আবিরকে ঘুম ভাঙিয়ে বিক্রম বলতেন, “লেখাটা কেমন হল?”
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিক্রম এবং আবির
লেখার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গানেও তিনি উদাত্ত। উচ্চারণের ক্ষেত্রেও। তাই বিক্রম সিং-এর গায়কি মিলবে না কারোর সঙ্গেই। কোথাও কোথাও বাবা মোহন সিং-এর সঙ্গেও মিলবে না। শিল্পীর নিজস্বতা এখানেই। মোহন সিং-ও এই কথাটিই বলেন। বিক্রমের গায়কির সঙ্গে কারোর মিল নেই, এখনও কোনো শিল্পী এইরকম উচ্চারণে গান গান না।
বিক্রম সিং খাঙ্গুরার কাজ
রবীন্দ্রনাথের ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে’ গানে ‘হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে’র জায়গায় ‘হৃদয়’ উচ্চারিত হয় সাংঘাতিক গভীরভাবে। এ এক বিস্মৃত যুগের আর্তনাদ এবং জীবনের একমাত্র প্রিয়কে খোঁজা, খানিক অপেক্ষাও। ‘হৃদয়’ শব্দের ‘হৃ’-তে যে আকুতি আছে, তা বিক্রম সিং নিজের মতো করে ব্যবহার করেছিলেন। এই গানেই ‘সবাই ছেড়েছে নাই যার কেহ/ তুমি আছ তার আছে তব স্নেহ’ লাইনের ‘ছেড়েছে’-র জায়গায় ‘ড়’-এর কী মারাত্মক উচ্চারণ করেন বিক্রম।
আসলে গান এবং এসরাজের বপণ দুই ছেলের মধ্যে করেছিলেন মোহন সিং। তাঁদের জোর করেননি কোনোদিন। দুই ছেলে নিজেরাই সুরকে নিজেদের মতো করে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। তাই মোহন সিং এবং বিক্রম সিং একই পরিবারের হয়েও গায়কিতে ভিন্ন হয়ে যান। এখানেই তো শিল্পের মজা। আজকের পর্ব জুড়ে শুধুমাত্র বিক্রম সিং-ই থাক। শুনেছি, তিনি একা থাকতে ভালোবাসতেন।
(চলবে… )
*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
