মোহন সিংকে ‘বাগেশ্রী কানাড়া’ রেঁধে খাইয়েছিলেন পণ্ডিত আমির খাঁ সাহেব!

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন – পর্ব ৪

পায়ে পোলিও। কিন্তু সে কোনওদিন থেমে থাকেনি। সে ছুটেছে, সর্বদা ছুটে চলেছে নিয়মের বেড়াজাল ভেঙে। এই ছোটার ইচ্ছাটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল কে? ওপাশ থেকে তৎক্ষণাৎ উত্তর আসবে, “আমার মন”। মোহনকে নিয়ে তাঁর আত্মীয়স্বজনরা ছিলেন নিরাশ। বাড়ির লোকজন প্রথমে ভেবেছিলেন, গানের তো কোনও ভবিষ্যৎ নেই। মোহন সেদিন ভেবে নিয়েছিলেন, দরকার হলে না খেয়ে থাকবেন। কিন্তু গানের শিক্ষাটা তাঁর দরকার। বাড়ি ছিল সম্পূর্ণ নিরামিষাশী। বাংলায় তো সব চলে! মাছ, মাংস! কী করে মানিয়ে নেবে যুবক মোহন! তিনি শুধু মানিয়ে নিলেনই না, তাঁকে নিয়ে চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। 
(গত পর্বের পর)

কারোর মতো করে গাইলে, সেই গানে কোনও নিজস্বতা থাকে না

সংগীত ভবনে পড়ার সময় মোহন সিং মূলত শাস্ত্রীয় সংগীতের পাঠ নিয়েছিলেন। তবে হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের গানও গেয়েছেন বৈকি! মন্দিরে মন্দিরে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন। এমনকি নীলিমা সেন অর্থাৎ বাচ্চুদির সঙ্গে ডুয়েটও গেয়েছেন। কিন্তু বাংলা পড়তে পড়তে, রবীন্দ্রনাথ পড়তে পড়তে, রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে শুনতে প্রেমে পড়ে গেলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তাঁর গুরু শান্তিদেব ঘোষের সঙ্গে নাকি মোহন সিং-এর গায়কীর এক অদ্ভুত মিল বা সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু শান্তিদেববাবুর কাছে তিনি কখনও রবীন্দ্রসংগীত শেখেননি, একথা নিজেই একাধিকবার বলেছেন মোহন। মোহন সিং মনে করেন, কারোর মতো করে গাইলে, সেই গাইয়ের গানে কোনও নিজস্বতা থাকে না। অনুভব আর উচ্চারণই আসল। দশজন শিল্পীর উপলব্ধি বা রিয়েলাইজেশন যদি আলাদা হয়, তবে দশজনের গানই হয়ে উঠবে নতুন এবং স্বতন্ত্র। মানুষ এই দশজনের গানই শুনবে। তাছাড়া, রবীন্দ্রনাথের গানের স্বরলিপিতে যে স্পর্শ বা স্বর আছে, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করলে গানের চেহারাটাই অন্যরকম হয়ে যায়। শান্তিদেব ঘোষের কাছ থেকে মোহন শিখছেন গানের গতি। গতির ইম্প্রেশন। রবীন্দ্রনাথের গানের গতি শান্তিদেব ঘোষকে শিখিয়েছিলেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই গানের গতি আবিষ্কার করতে পেরেছেন তাঁরা। রবীন্দ্রনাথ হয়ে দীনেন্দ্রনাথ, শান্তিদেব হয়ে মোহন। তারপরে বিক্রম (বিক্রম সিং খাঙ্গুরা)। এখানে মোহন সিং-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাৎপর্যবহ কথাটি হল, “কোনও গান গাওয়ার সময় ভাবতে চেষ্টা করি, এই গানটা গাওয়ার সময় রবীন্দ্রনাথের এক্সপ্রেশন কীরকম হত। আমি তখন পথ পেয়ে যায়।”

ধ্রুবতারা যোশীর সঙ্গে মোহন সিং খাঙ্গুরা 

রাগকে যে ধ্যান করতে হয়, তা প্রথম শেখা আমির খাঁ সাহেবের থেকে 

রণধীর রায়, ধ্রবতারা যোশী আর মোহন সিং – এই তিন মুখের মিলন মানেই সুর ঘোরাফেরা করত চারপাশে। মোহন এবং টুকু (রণধীর) দুজনেই গান শিখতেন যোশীদার কাছে। বন্ধুত্ব সেই থেকেই। মোহনের গান আর রণধীরের বাজনা। ধ্রুবতারা যোশীর সেই সময়ের বাড়িতে ছিল এক গেস্ট হাউস। যা কীনা পুরোপুরি শিল্পীদের গেস্ট হাউস। ভারতের এমন কোনও শিল্পী নেই যারা ধ্রুবতারা যোশীর গেস্ট হাউসে আসেননি। একবার এই বাড়িতেই এসেছিলেন শ্রদ্ধেয় আমির খাঁ সাহেব। মোহন আর টুকু রোজ যেতেন খাঁ সাহেবকে দেখতে এবং তাঁর গান শুনতে। হঠাৎ একদিন দেখা গেল বাড়ির সামনে এক চাটাই পেতে উনি বসে আছেন। কিন্তু কী করছেন উনি? খাঁ সাহেব উত্তর দিলেন, রাগ ধ্যান করছি। 

এই রাগ ধ্যান প্রথমবার তাঁর মুখ থেকেই শুনেছিলেন মোহন। রাগটাকে যে ভিস্যুয়ালাইজ করতে হয়, আলাদা ধ্যান করতে হয় তা প্রথমবার জানা হল মোহন আর টুকুর। আমির খাঁ সাহেব বললেন, “কাল তুমলোগ আও। কাল হাম খানা বানায়েঙ্গে। তুমলোকভি আনা খানে কে লিয়ে।” বিকেল চারটে নাগাদ উনি শুরু করেছেন খাবার বানাতে। রাঁধছেন মাংস। রান্না করতে করতে খাঁ সাহেব গুনগুন করছেন গান। কী বানাচ্ছেন তিনি? খাঁ সাহেব উত্তর দিলেন,  তিনি রাঁধছেন বাগেশ্রী কানাড়া। রান্নার পর সেদিন পুরিয়া ধানেশ্রী শুনিয়েছিলেন সবাইকে। 

মোহন সিং বলছেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা

যোশীদাকে মোহন বললেন, আপনি বাগেশ্রীর একটা নতুন বন্দিশ তৈরি করুন।
– ঠিক হ্যায়। কাল এসো। আমি বন্দিশ তৈরি করে রাখব। 
এমনই একজন উদার মানুষ ছিলেন ধ্রুবতারা যোশী। কনস্টিপেশেনের রোগী ছিলেন। একদিন সকালে অনেকক্ষণ পর বেরোলেন বাথরুম থেকে। মোহন জিজ্ঞাসা করলেন, কী গো যোশীদা, হল?
– নারে হল না, শুধুই বাঁশি শুনলাম। 
এমনই রসিক মানুষ ছিলেন ধ্রুবতারা যোশী। গুরু-শিষ্যের সম্পর্কও ছিল দেখার মতো।

(চলবে…)

*অর্পিতা চ্যাটার্জির নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত।

Developed by DXDasia