রবীন্দ্রনাথের দুঃখের গান গাওয়া মানেই কান্নাকাটি করা নয় — মোহন সিং

মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ১৭

মায়ের সঙ্গে মোহন সিং

মোহন সিং-এর বাল্যবন্ধু টুকু অর্থাৎ রনধীর রায়ের বাদ্যযন্ত্র দেখলেই টুং টাং করতেন আবির। একবার কোনো একটি তার খুলে যাওয়ায় ছোট্ট আবির বাঁধতে শুরু করেছিল। সেই দেখে চমকে উঠেছিলেন রনধীরবাবু। এতটুকু বয়সে এত সুন্দর করে তার বাঁধছে বাদ্যযন্ত্রে! সেই শুরু। আরেক সন্তান বিক্রম। স্বাতন্ত্রতায় যিনি আজও প্রত্যেকটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়ের নয়ন জুড়ে থেকে গেছেন। বিক্রম সিং-এর কথা উঠতেই বাবা মোহন সিং বলেন, বিক্রমের জন্ম পাঞ্জাবে। গায়ের রং ছিল গোলাপি। সেই থেকে মায়ের দেওয়া নাম ‘পিঙ্কু’। প্রথম ‘সা’ লাগিয়েছিল মাত্র দেড় বছর বয়সে।

(গত পর্বের পর)

রবীন্দ্রনাথের পূজা পর্যায়ের গান— ওই আসনতলের মাটির পরে লুটিয়ে রব/ তোমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হব/ কেন আমায় মান দিয়ে আর দূরে রাখ/ চিরজনম এমন করে ভুলিও নাকো/ অসম্মানে আনো টেনে পায়ে তব/ তোমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হব।

১৯০৯ সালে শান্তিনিকেতনে বসে রবীন্দ্রনাথ এই গান লিখছেন ত্রিতালের বাউল রাগে। এই সেই শান্তিনিকেতন, যেখানে শিল্পীরাও রাঙামাটির ধূলার ধূসরে মিশে যান। পরবর্তীতে নিজেরাই সৃষ্টি করেন এক একটা যুগ— সুবর্ণ যুগ। মোহন সিং খাঙ্গুরা আপন মনে গেয়ে চলেন এই গান। বিষাদের গান, একাকিত্বের গান, কিংবা এই গান উচ্ছ্বাসের, শিল্পকে পরম বন্ধু ভেবে এই গান তখন শান্তিনিকেতনের উদাস বাউলের পথে কাঁচা লাল মাটির পথ ধরে এগিয়ে যায় অজয়ের দিকে। তারপর ভোরের কুয়াশায় মিলিয়ে যায় সেই উদাত্ত সুর। 

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে মোহন সিং-এর একটি দুর্লভ মুহূর্ত 

এখন প্রসঙ্গ উঠতেই পারে, মোহন সিং-এর রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে শান্তিদেব ঘোষের প্রতিক্রিয়া ঠিক কেমন ছিল? মোহন সিং তাকিয়ে রয়েছেন একটা জানালার দিকে। বাইরের সামান্য হাওয়া এসে লাগছে পর্দায়। সেসব দৃশ্য ধরা পড়ছে চশমা ভেদ করে তাঁর চোখে। আর তিনি বলছেন, ১৯৯৪ সালে তিনি প্রথম রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেট করেন। শান্তিদেব ঘোষের ভাই 'মন্টুদা' সেই ক্যাসেট নিয়ে গিয়ে শুনেছিলেন। শান্তিদাকে কেউ ক্যাসেট দিয়ে এলেও শুনতেন না। কিন্তু মোহনের ক্যাসেটটা ভাইকে চালাতে বললেন। গান শুনে মোহনকে ফোন করলেন শান্তিদেব। সেটাই ছিল মোহনকে করা ওঁর প্রথম ফোন। উনি বলেছিলেন, "রবীন্দ্রনাথের গান তুমি ছেড়ো না।" তারপর প্রায়ই শান্তিদেব ঘোষ চলে যেতেন মোহনের বাড়িতে। তাঁর রেওয়াজ শুনতে। চলে যাবার আগে বলে যেতেন, কাল আহির শুনব। পরের দিন বললেন, টোরি শুনব। তারপর একদিন হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, মিঁঞা কি টোরি, দরবারি টোরি— এর মধ্যে তফাৎ কী? গেয়ে শোনাতে বললেন। মোহন সিং-এর প্রথম ক্যাসেটের 'রাখো রাখো রে' গানটা শান্তিদেব ঘোষের খুবই প্রিয় ছিল। 

"মাঝে মাঝে সন্ধেবেলা শান্তিদা আসতেন। বলতেন, দিনুদার গানের গতিটা কে নিয়েছে বলো? নাট-বল্টু সব এখন ঢিলে হয়ে গিয়েছে। তোমার গানে সেই গতিটা আবার খুঁজে পেলাম।" 

মোহন সিং বলেন, কেউ কেউ রবীন্দ্রনাথের গানে অতিরিক্ত ভাব আনতে গিয়ে সুর, তাল ভুলে যান। মনে রাখতে হবে, দুঃখের গান মানেই কান্নাকাটি করা নয়। রবীন্দ্রনাথের দুঃখের গানে যে আগুন আছে, সেটাকে স্পর্শ করতে হবে। মোহন আজীবন সেই চেষ্টাই করে এসেছেন।

(চলবে…)

*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি

অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
 

Developed by DXDasia