
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ২১
রবীন্দ্রসংগীতকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য মোহন সিং এযাবৎকাল অবধি বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতির সৌজন্যে পেয়েছেন রোল মডেল অ্যাওয়ার্ড, দিল্লি থেকে পেয়েছেন পাঞ্জাবি আকাদেমি পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য আকাদেমি পুরস্কার এবং ভারতবর্ষের অন্যতম গর্বের সম্মান সংগীত নাটক আকাদেমি, যা তাঁকে প্রদান করা হয় রবীন্দ্রসংগীতে অবদানের জন্য।
আসলে এই সবকিছুর পিছনেই রয়েছে মানুষের ভালোবাসা। নিজের সুরেলা চলার পথে হাঁটতে হাঁটতে বারবার জিতে গিয়েছেন মোহন সিং। মোহন সিং আসলে সেই পারাপারের নাম, যিনি প্রেমিক, একইসঙ্গে আমাদের কাঁদান, হাসান— সাক্ষী থাকেন রবীন্দ্রনাথ।
(গত পর্বের পর)
২০১৩ সালের একটি সাক্ষাৎকারে মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন, এখন মৃত্যুর পরেই মানুষকে নিয়ে যত বাড়াবাড়ি। নতুন প্রজন্মের অন্যতম রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বিক্রম সিং খাঙ্গুরা। তিনি কী মাপের শক্তিশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ, তা পাঠকদের নতুন করে বলে দেবার কিছু নেই৷ কিন্তু তিনি জীবিত অবস্থায় প্রায় কোনও অনুষ্ঠানে ডাকই পেতেন না। তা নিয়ে চাপা দুঃখ আছে বাবা মোহন সিং-এরও৷ অথচ তাঁর মৃত্যুর পর কত মানুষ তাঁর গান নিয়ে 'আদিখ্যেতা' করেছে।
মোহন সিং অত্যন্ত সৎভাবে সোচ্চার হন, বলেন, পয়সা দিয়ে হল ভাড়া করে অনুষ্ঠান করব বলে গান করি না। তাছাড়া তিনি তো শ্রোতাভঞ্জনের জন্য রবীন্দ্রনাথের গান করেন না। নিজের গানের প্রচারের চেয়ে রেওয়াজে তাঁর ভক্তি অনেক বেশি। স্বভাবতই অল্পশ্রুত গান গাইতেই তিনি অধিক ভালোবাসেন।
কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্ত্রীর সঙ্গে মোহন সিং
মৃত্যুর পর যে খ্যাতি, তা বলতে গিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক একটি মৃত্যুর কথা। বিখ্যাত তরুণ অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুত। খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও মৃত্যুর কাছে হার মানলেন তিনি৷ কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার দাপটের যুগে তাঁর মৃত্যুর আগে কি তাঁকে নিয়ে তেমন কোনো কথা হয়েছে? নাহ্, হয়নি। অথচ সুশান্তের মৃত্যুর পর কাদা ছোড়াছুড়ি কম হয়নি। এই কি তবে শিল্পের অনিবার্যতা? যা শেষ, তা যে শেষ নয়, জনসাধারণ কি তা বারবার মনে করিয়ে দেয়?
কিন্তু যে জীবন বাঁচতে চায় তার শিল্প নিয়ে, সেই মুহূর্তে গুরুত্ব না পেলে শিল্পীর যন্ত্রণা কি বেড়ে যায়? প্রশ্নগুলো সহজ কিন্তু উত্তর দেওয়ার পথ বড্ড কঠিন। তাই মোহন সিং-ও কোনো সাতেপাঁচে নেই কোনোদিন। নিজের কাজ করে গেছেন আড়ালে, নিভৃতে।
নিজস্ব মেজাজে মোহন সিং
শান্তিনিকেতনকে ভালোবেসে ফেলা এই মানুষটি তাই প্রিয় হয়ে গেছেন অনেক বাঙালি-অবাঙালি শ্রোতার। মোহন সিং-এর গানের সবচেয়ে বেশি ভক্ত কিন্তু স্কুল আর কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরাই। মোহনবাবু মনে করেন, গানের ক্ষেত্রে স্বরজ্ঞান আর লয়টা সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এখন বেশিরভাগ গানই লোকে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গায়। লোকে শুনবে কেন? শান্তিদেব ঘোষ যাকে বলতেন ‘অশিক্ষিত গলা’। গানের বাণীতে, সুর আর লয়ের মেজাজ থাকলেই সেই গান শ্রোতাদের মন টানবে। আর ঘরানা তো একটাই। রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে অনুসরণ করলেই হল।
(শেষ পর্ব আগামী সপ্তাহে)
*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
