
মোহন সিং খাঙ্গুরা বলছেন — পর্ব ১৯
মোহন সিং-এর জন্ম পঞ্জাব রাজ্যে। তারপর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে সেই কবে চলে এসেছিলেন পড়াশোনা করতে৷ পাকাপাকিভাবে সেখানেই থেকে গেলেন৷ তাই উত্তর আসবে, নিজেকে শান্তিনিকেতনের মানুষ বলতেই বেশি ভালোবাসেন— বাঙালি পাঞ্জাবি এসব বুঝতে চান না— মানুষ তো মানুষই হবে— সেটিই একমাত্র পরিচয় হওয়া উচিত৷ তাই তাঁর প্রথম গানের ক্যাসেটেও লেখা ছিল— মোহন সিং শান্তিনিকেতন।
কিছু কিছু মানুষ হয়তো আমাদের জীবনে এইভাবেই রয়ে যান তাঁর নিজস্ব বোধ নিয়ে। যে বোধের আলো থেকে ঠিকরে পড়ে কোনো প্রভাত সংগীত৷ এই বুঝি কোন আলেয়ার হ্রদ থেকে এসরাজ আর ধ্রুপদি তালে মোহন সিং উচ্চাঙ্গে গান ধরবেন।
(গত পর্বের পর)
শান্তিদেব ঘোষ এবং শৈলজারঞ্জন মজুমদারের গায়কির মধ্যে দীনুদা অর্থাৎ দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা বড়ো প্রভাব ছিল। দীনুদা ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি রবীন্দ্রনাথের গানে আকার দিতেন। রবীন্দ্রনাথ আসলে এত ফার্স্ট একজন শিল্পী, যিনি ক্রমশ এগিয়েই চলেছেন। সেটা সামলে রাখতেন দীনেন্দ্রনাথ। শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছাত্র। দীনুদার গায়কি পছন্দ করতেন মোহন সিং। যে কারণে মোহন সিং-এর গানের মধ্যে তাঁর একটা প্রভাব আছে। “অনেকে বলেন শান্তিদার প্রভাব। আমি বলি, এঁদের পঁচিশ বছর দেখে তারপর নিজে গাইতে শুরু করেছি। প্রভাব হতে পারে, কিন্তু তা নকল নয়”।
যুবক বয়সের মোহন সিং
সংগীতের রাজনীতির জন্য শান্তিদেব ঘোষের ক্যাসেট হল না ঠিকমতো। ভারতীয় সংগীত জগতের এ এক দুর্ভাগ্য। মোহন সিং-এর মূল বিষয় শাস্ত্রীয় সংগীত। কম করে একশোটি গান কম্পোজ করেছেন তিনি।
মায়ের সঙ্গে ছোট্ট বিক্রম আর আবির
মোহন সিং-এর এই দীর্ঘ জীবনে তাঁর স্ত্রী শুচিস্মিতার প্রভাব খুব গুরুত্বপূর্ণ। সংসারে মন ছিল না মোহনের। টাকা-পয়সা সব স্ত্রীর হাতে দিয়ে বলতেন “তুমি যা করবে করো”। শুচিস্মিতা তাঁকে অসম্ভব সাহায্য করেছেন আজীবন। মোহনকে চাল-ডাল-নুন-তেলের মধ্যে নিয়ে যাননি কখনও। তাঁর রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া কিন্তু স্ত্রীর জন্যই৷ এছাড়াও ওঁর কথায় মোহন তৈরি করেছেন একাধিক গান। শুচিস্মিতার কথা এই ধারাবাহিকে আগেও লেখা হয়েছে। অত্যন্ত ঘরোয়া নিপুণ কারিগরের অধিকারী ছিলেন তিনি। এই যেমন বড়ো ছেলে বিক্রম— সাইকেলে তিনি চলেছেন লাইব্রেরির পথে, কখনও কোপাই, সোনাঝুরি, লালবাঁধ। বাড়ি ফিরেই মাকে বলতেন, “দু'পিস মাছ ভেজে দাও তো। খুব খিদে পেয়েছে”। রাতে আবার বায়না উঠল ফেঞ্চ টোস্টের। নিজেই কিচেনে ঢুকতে যাচ্ছেন। তখন মা নিষেধ করে বলছেন, “থাম তো, তুই যা, আমি বানিয়ে দিচ্ছি”।
আনন্দ পুরস্কারের মঞ্চে সপরিবারে মোহন সিং
মোহন-শুচিস্মিতা-বিক্রম-আবির আসলে এক সুতোয় গড়া। ফুল থেকে পাপড়ি খসে গেলে ফুলের আর কী দোষ! শান্তিনিকেতনের লাল মাটি তাঁদের মায়ায় জড়িয়েছেন। শান্তিনিকেতনকে গর্বিত করেছেন। সংগীতের নানাবিধ রাজনীতির মধ্যে নিজের সত্ত্বাকে উদ্ভাসিত করাই একজন প্রকৃত শিল্পীর কাজ৷ সেটা মোহন সিং করে গেছেন নিভৃতে, আড়ালে। প্রচারবিমুখ এই মানুষটির স্মৃতিচারণে তাই গভীরভাবে থেকে যান ছোট্টবেলার বন্ধু টুকু (রণধীর রায়), উস্তাদজি, সাধুবাবা, শান্তিদেব ঘোষ, দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়রা।
(চলবে…)
*মূল সাক্ষাৎকার গ্রাহক— অর্পিতা চ্যাটার্জি
অনিবার্য কারণবশত এখন কোনও ভিডিও ক্লিপিং রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
