
নানান দুর্লভ স্মারক, আলোকচিত্র, দলিল-দস্তাবেজ রয়েছে সেখানে
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়কে নির্মাণ করে দিয়েছে পাকিস্তানি আগ্রাসী সরকারের বিরুদ্ধে সেই দেশের মুক্তিযুদ্ধ। তাই এখনো বাংলাদেশের নানান সাংস্কৃতিক পরিসরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা এবং স্মৃতিচারণ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৬ সালের কথা। মুক্তিযুদ্ধের পর ২৫ বছর পেরিয়ে যাচ্ছিল তখন। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরসারি যুক্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই তখন মারা গেছেন। কয়েকজন মুক্তিযুদ্ধ-পাগল মিলে তখন ভাবলেন, জাতির এত বড়ো অর্জনের স্মৃতিগুলোকে সংরক্ষণ করা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই ওই বছরের ২২ মার্চ যাত্রা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ঢাকার সেগুনবাগিচায় একটা পুরোনো ভাড়া বাড়িতে ৮ জন ট্রাস্টির উদ্যোগে চলতে থাকে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সংগ্রামের নানান স্মারক সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং উপস্থাপন।
জাদুঘরের কার্যকলাপ যত বাড়ছিল, বোঝা যাচ্ছিল, ওই ভাড়া বাড়িতে স্থানাভাব ক্রমশ প্রকট হচ্ছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে আগারগাঁও এলাকায় জায়গা দেয়। ২০১১ সালে জাদুঘরের নিজস্ব ভবনের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপিত হয়। ২০১৭ সালে চালু হয় ওই নতুন ভবন। এরই মধ্যে ২০০১ সালে দু’টি বাস চালু করেছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। উদ্দেশ্য, সারা বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার পড়ুয়াদের সামনে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা এবং তাদের মনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগিয়ে তোলা। বাসগুলির নাম দেওয়া হয় ‘ভ্রাম্যমাণ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’।
এই বাসগুলো বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় ঘুরে বেড়ায় এবং নানান রকম প্রদর্শনীর আয়োজন করে। পৌঁছে যায় দূর-দূরান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। যারা ঢাকায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর দেখার সময়-সুযোগ পান না, তাদের জন্য বাসগুলোতে রাখা আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা দুর্লভ নিদর্শন, স্মারক, আলোকচিত্র, দলিল-দস্তাবেজ এবং আরো অনেক কিছু। অনেক সময়ে ডকুমেন্টারি দেখানো হয়। বিতরণ করা হয় মানবাধিকার ও শান্তি সংক্রান্ত লিফলেট। পড়ুয়াদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকরাও ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরের প্রদর্শনীতে অংশ নিতে পারেন।

সারা বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা সাদরে এই ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরকে বরণ করে নিয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের অজানা ইতিহাস জানতে তারা জাদুঘর গাড়িতে ভিড় করে। অনেকে জানিয়েছে, বিভিন্ন স্মারক, দলিলপত্র, ছবি দেখে তাদের মনে হয়েছে যে তারা যেন মুক্তিযুদ্ধ নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখছে। কখনো কখনো জাদুঘর দেখার পর পড়ুয়াদের বাড়ির কাজ দেওয়া হয়। যেমন ধরা যাক, মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, এরকম কারো সঙ্গে কথা বলে তা নিজের ভাষায় লিখে আনবে পড়ুয়ারা। সেই লেখাগুলো বই আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা থাকে। কখনো বা বিনামূল্যে শিক্ষার কোনো উপকরণ অথবা মুক্তিযুদ্ধের অ্যালবাম তুলে দেওয়া হয় পড়ুয়াদের হাতে।
