
পিকনিকের ইতিহাস বহু প্রাচীন, মহাভারত, মুঘল আমলেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়
“থ্যাংক গড ফর কোরাপশন”
পালামৌর জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে অবশেষে এই কোরাপশনের সৌজন্যে ফরেস্ট রেস্ট হাউসে ঠাঁই নিলেন চার বন্ধু। তারপর গল্পের মোড় পালামৌর এক জঙ্গলে নানা বাঁক নিয়েছে। সেই দিকে এই মুহূর্তে না গিয়েও চোখ এঁটে যেতে পারে শুধুমাত্র সেই পিকনিকের সিকোরেন্সে। ছবিটিতে দেখা যায় সিনেমার সব মুখ্য চরিত্ররা মিলে একটি ফাঁকা জায়গায় শতরঞ্চিতে বসে মেমরি গেম খেলতে থাকেন। একে একে সবাই হেরে যান। টিকে থাকেন সৌমিত্র আর শর্মিলা। শেষে শর্মিলাও ইচ্ছে করেই সৌমিত্রর কাছে হেরে যান। ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প আর সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-তে পিকনিক পাড়ার ছাপোষা বনভোজনে সীমাবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে যুবককালের কথকতা। পিকনিককে ঘিরে সেদিন পালামৌর জঙ্গলে লেখা হয়েছিল না বলা আখ্যান। এটা আগামীর গল্পের প্লট বলা যায়। পিকনিক মানে মিঠে রোদ গায়ে মেখে ভরপুর আনন্দ। যার অন্তরে লুকিয়ে থাকে অনেক গল্প, যা রূপ পায় বা পায় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে থাকে সেই গল্প। ক্রমে ক্রমে পিকনিক বিবর্তিত হয়েছে। রেখে গেছে ইতিহাসের ছেঁড়া পাতা।
পিকনিকের ইতিহাস বহু প্রাচীন। অর্জুন, কৃষ্ণ ও বলরামের পিকনিকে যেমন সবরকমের সুরাপানের ব্যবস্থা ছিল, আবার বাৎসায়নের কামসূত্রে ধনী মানুষদের সারাদিনব্যাপী পিকনিকের কথা আছে। লীলা মজুমদারের লেখাতেও আছে একালের চড়ুইভাতির গালগপ্পো।
আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশ, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রতাপে আমাদের শীতকাল প্রায় উধাও। তাই তো একচিলতে শীতকাল আসে, তার রোদের রং সরষের তেলের মতো আর উত্তাপ বড়ো মিঠে, তার কুয়াশার রং মোহের মতো, সে সময়টা আমাদের জন্য পিকনিকের উৎকৃষ্ট সময়—বাড়ি থেকে, ডিপার্টমেন্ট থেকে কিংবা অফিস থেকে। শীতের দেশের চিত্র পুরো বিপরীত, সেখানে গ্রীষ্ম আসে অল্প সময়ের জন্য। সেসব গ্রীষ্মদিনে তারা পিকনিক বাস্কেট/ঝুড়ি ভরে সুখাদ্য আর সুপেয় পানীয় নিয়ে পুরো পরিবার কিংবা বন্ধুবান্ধবেরা মিলে চলে যায় পার্কের নিটোল সবুজতায়, পিকনিক ব্ল্যাঙ্কেট বিছিয়ে বসে ‘আলফ্রেস্কো ইটিং’–এর মজা নিতে।
আমাদের এই বাংলায় শীতের সঙ্গে পিকনিকের নিবিড় যোগ। চড়ুইভাতি, বনভোজন বা পিকনিক যে নামেই ডাকা হোক না কেন, শীতকাল এলেই শুরু হয়ে যায় তার তোড়জোড়। তারপর একদিন ভোরবেলায় সদলবলে হুশ করে বেরিয়ে পড়া। শীতকাল মানেই গাছের পাতায় শিশির, কুয়াশা মাখানো সকাল, উলের জামাকাপড়, কমলালেবু, নলেন গুড় আর মোয়া। শীত পড়তে না পড়তেই, ‘কোথায় পিকনিক হবে’, ‘কখন যাব’, ‘কী কী খাবো’ ইত্যাদি। শীত মানেই এক কথায় চড়ুইভাতির মরশুম। কলকাতাবাসী এই শীতের ছুটিতে সে আনন্দ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করতে নারাজ। আর কেন-ই বা করবে যখন হাতের নাগালেই রয়েছে পিকনিক করার এত ভালো ভালো জায়গা! যেমন উল্লেখযোগ্য- গাদিয়ারা, টাকি, সুবজদ্বীপ, বকখালি। পিকনিকের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। মহাভারত, মুঘল আমলেও তার উল্লেখ পাওয়া যায়।
আরও পড়ুন: শীতের পিকনিক হোক শালপাতায়, ফিরে আসুক ঐতিহ্য

সেকালেও (মহাভারত, মুঘল আমল) চড়ুইভাতি
আমাদের দেশে পিকনিকের ইতিহাস বহু পুরোনো। ধ্রুপদি ভারতীয় শিল্প ও সাহিত্যে পিকনিক ও বাগানে পার্টির উল্লেখ রয়েছে বহু জায়গায়। বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সেখানে আদিকাল থেকে পিকনিক হয়ে আসছে। কৌশাম্বিতেও শুঙ্গযুগের একটি টেরাকোটার মূর্তি পাওয়া গেছে। যেখানে রথের মাঝে পিকনিক পার্টি চিত্রিত হয়েছে। বিনোদচন্দ্র শ্রীবাস্তব তাঁর বই ‘হিস্ট্রি অফ এগরিকালচার অফ ইন্ডিয়া’–তে উল্লেখ করেছেন যে, ওই মূর্তির মাঝে বড়ো বড়ো প্লেট রয়েছে, যাতে রান্না করা চাল, ডাল, মিষ্টি এবং নানারকম পদ আছে তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এমনকি মহাভারতেও পিকনিকের উল্লেখ আছে। অর্জুন, কৃষ্ণ ও বলরামের সেই পিকনিকে সবরকমের সুরাপানের ব্যবস্থা ছিল। কাদম্বরী, মাধবিকা এবং ঋতুকালীন ফুলের সুবাসযুক্ত রাম ছিল পিকনিকে। আবার মহাভারতেই এক পিকনিকে ভিমকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করে দুর্যোধন।
খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে লেখা বাৎসায়নের কামসূত্রে উদয়ন যাত্রা বা সমাজের ধনী মানুষদের সারাদিনব্যাপী বাগানে পিকনিকের কথা জানা যায়। উদয়ন যাত্রায় বাড়ির চাকররা রান্না করে রকমারি পদ পরিবেশন করতেন। পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট ও তাঁদের পারিষদরা জ্যোৎস্নারাতে এক হয়ে পিকনিকে যেতেন। ষোড়শ শতকে বিখ্যাত পার্সি চিত্রশিল্পী মীর সৈয়দ আলির আঁকা ‘দ্য প্রিন্সেস অফ দ্য হাউস অফ তৈমুর’–ছবিতে (উপরের ছবিটি দেখুন) দেখা গেছে হুমায়ুন আসনে বসে চড়ুইভাতির আনন্দে মেতে উঠেছেন। কর্মচারীরা গাছের তলায় বসে থাকা অতিথিদের খাবার, পানীয় পরিবেশন করছেন।

ব্রিটিশ আমলে পিকনিক
ব্রিটিশ আমলে পিকনিকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিকারের ইতিহাস। ইংরেজরা ভারতে আসার আগে ভারতবর্ষের গেমবার্ডরা জলাভূমিতে আর বনাঞ্চলে বেশ নিরুপদ্রবই থাকত। জাঙ্গল ফাউল, কোয়েল, ডাহুক, জলপিপি—কী ছিল না সেই পাখিদের ঠিকানায়! গরমের দুই মাস ছাড়া বাকিটা সময় শিকারির হাত খুলে শিকারের সময়। ভারতবর্ষের বন্য প্রাণীদের, বিশেষ করে বাঘদের আজকের এই সংখ্যা কমে আসার পেছনে কারণ ছিল ব্রিটিশদের এসব শিকার। ১৯০৬ সালে বিকানীরের মহারাজার আমন্ত্রণে লর্ড মিন্টো এমন শিকার-পিকনিকে এসে ভাট-তিতিরই মেরেছিলেন ৪ হাজার ৯১৯টি, যে পাখির মাংস তাঁদের কাছে প্রায় অখাদ্য। ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষে চাকরিরত ব্রিটিশদের সমাজে পিকনিক ও ড্রামা সোসাইটিগুলো ছিল স্ক্যান্ডালের আখড়া, কিংবা কেবলই বিবাহযোগ্য মেয়ে খোঁজার বাহানা। পিকনিকের অলস-মধুর অবসরে কত কী ঘটে যেত! কলকাতার ময়দান, ভিক্টোরিয়াতেও পিকনিক চালাতেন ব্রিটিশরা।
আরও পড়ুন: শীতের পিকনিকে কমলালেবু নেই, রয়েছে ন্যাপকিন

বাংলা ও বাঙালির পিকনিক
বাংলায় ঐতিহ্যবাহী পিকনিক, যাকে চড়ুইভাতি বলা হয়, তা ছিল মূলত খোলা জায়গায় আত্মীয়, বন্ধু মিলে রান্না করে খাওয়া-দাওয়া সঙ্গে উপড়ি পাওনা আনন্দ আর হুল্লোড়। গন্তব্য যদি কাছাকাছি হয়, তাহলে রান্নার উপকরণ সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে নানা পদ তৈরি হয়ে থাকে। তারপর খাওয়া দাওয়া। মেমরি গেম, তাস পেটানো, গোল হয়ে গল্প গাছা, এসব পিকনিকেরই অনুষঙ্গ। এ এক রাজকীয় আয়োজন! আবার দূরে গন্তব্য হলে অনেক সময় রান্না করে নিয়ে মজা করে সরাদিন কাটানো-এই বা কম কীসে!
ভাড়া করা বাবুর্জির হাতের ছোঁয়ায় কী কী আপনার রসনা তৃপ্ত করতে পারে? বা একসময় করেছে? ধবধবে সাদা ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, ভাজা মাছের মাথা দিয়ে রান্না করা মুগ ডাল, আলু বা বেগুন ভাজা, আলু এবং মটর দিয়ে রান্না করা বাঁধাকপি। আর কাছাকাছি কোনও পুকুর থেকে ধরা মাছ ভাজা হলে তো কথাই নেই! না হলে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া মুরগির ঝোল। সবই প্রায় পরিচিত খাবার যা আমরা সারা বছর খাই – তবে শীতের সূর্যের নিচে এর স্বাদ লা জবাব!

পিকনিকের খানাপিনা
লীলা মজুমদার তাঁর ‘রান্নার বই’-য়ে লিখেছিলেন পিকনিকের ফর্দ, “দুপুরের জন্য দুটো মুরগি আগের দিন রোস্ট করে রাখলে, তার সঙ্গে আলু রোস্ট করলে, মটর সেদ্ধ করে রাখলে ভালো হয়। …প্রত্যেকের জন্য আলাদা একটি করে প্লাস্টিকের কি কার্ডবোর্ডের বাক্স! তাতে মুরগির ভাগটি ও আলু মটর দিতে পারো। একটা করে ডিম শক্ত করে সেদ্ধ করে, নুন মাখিয়ে লাল করে ভেজে নিও। …সঙ্গে কাগজের কি প্লাস্টিকের গেলাস নিও, যথেষ্ট মিষ্টি পানীয়ের বোতল আর প্রত্যেকে নিজের বাড়ি থেকে খাবার জলের বোতল …সময়কার ফল নিও; বিকেলের জন্য একটা প্লেন বড়ো ফলের কেক নিও, যার চিনি গলে যাবার ভয় নেই।” এ তো গেল ব্রিটিশরাজের পেস্ট্রিনির্ভর পিকনিকের মেনু, দিশি কেতার মেনুও বাতলে দিয়েছেন তিনি: লুচি/পরোটা, শুকনো আলুর দম/আলু–কপির চচ্চড়ি, মাছের চপ, মাংসের বড়া/শামি কাবাব। তবে লীলা মজুমদার নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন, সবচেয়ে মজা হয় সেখানে গিয়ে খিচুড়ি, বেগুনভাজা, আলুর দম, টমেটোর চাটনি, মাছভাজা রাঁধা যায় যদি।
সুবজ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে, জলাশয় বুজে মাল্টিরাইজ হচ্ছে। প্রান্তর যখন থাকবে না, সবুজকে ঘিরে থাকবে না উপাসক পাখি আর প্রাণী, তখন কি আমরা ইতিহাসের দেঁতো হাসির মতো কোনো ‘অ্যাটাভিজম’বশত ফিরে যাব বদ্ধঘরের সেসব পিকনিকে, যেখানে মত্ততা ছাড়া আর কোনো উপাদান নেই?
____
কৃতজ্ঞতা:
প্রথম আলো
scroll.in