খাটুন্দি গ্রামে আয়োজিত হল স্বাস্থ্য সচেতনতা শিবির
এর আগে ‘বঙ্গদর্শন’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল বাংলার প্যাডম্যান শোভন মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি। ত্রিধারা প্রকল্প আর মহিলাদের ঋতুস্রাবের জন্য প্রয়োজনীয় তাঁর লড়াই নিয়ে কলম ধরছিলেন শোভন নিজেই। আজকে থাকছে পিরিয়ডস নিয়ে আরও কিছু তরুণের ব্যতিক্রমী কাজকর্মের সুলুকসন্ধান, যা আমাদের সবার কাছেই দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যাঁরা আমাদের অন্ন বস্ত্র বাসস্থান জুগিয়ে আসছেন সেই প্রাচীন কাল থেকে, গ্রামের সেই প্রান্তিক মানুষগুলোর সাথে পরিচয় না ঘটলে, তাঁদের জীবনযাত্রাটা না চিনলে আমরা আরও একটু একটু করে স্বার্থপর হতে থাকব, জীবনটা শুধু আটকে যাবে মেগাসেল আর ইএমআই আর ক্রেডিট কার্ডে। এরকম ভাবনা থেকেই উত্তরপাড়া, বালি, বেলুড় অঞ্চলের একদল ছেলেমেয়ে বের হয়েছিলেন রাস্তায়, পৌঁছে গেছিলেন গ্রাম বাংলার সবুজ পৃথিবীতে। ঋতুস্রাব বা পিরিয়ডস নিয়ে গ্রামের মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি আর প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের হাতে স্যানিটারি ন্যাপকিন তুলে দেওয়াই ছিল তাঁদের প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে এই লক্ষ্যপূরণের জন্য কোনো প্রথাগত সংগঠন তাঁরা গড়ে তোলেননি। সপ্তর্ষি, অরিঘ্ন, অভ্রজ্যোতি, অর্কেন্দু, অলকেন্দু, দেবাঞ্জনা, শতাক্ষী, অলকানন্দারা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে কোনো মঞ্চ ছাড়াই একত্রিত হয়েছিছেন, স্বপ্ন দেখেছিলেন নতুন কিছু করবেন বলে।

খুব ছোটো করে তাঁরা নিজেদের কাজ প্রথম শুরু করেছিলেন গত ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে। ২০১৭ শেষ হচ্ছে আর শুরু হচ্ছে ২০১৮, এরকম সময়েই তাঁরা রাস্তায় বেরিয়েছিলেন কিছু জামাকাপড়, কম্বল, খাবারদাবার নিয়ে। দুঃস্থ মানুষের হাতে সেগুলো তুলে দিয়ে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন করেছিলেন তাঁরা। তাঁদের দ্বিতীয় কর্মসূচি ছিল বাংলা নববর্ষের দিন বোলপুরের কাছাকাছি রূপপুর নামের একটি গ্রামে। নিখরচায় মেয়েদের কাছে স্যানিটারি ন্যাপকিন পৌঁছে দেন তাঁরা সেখানে। তার পাশাপাশি জামাকাপড়, গামছা, খাবারদাবার গ্রামবাসীদের হাতে তুলে দিয়ে তাঁরা চেষ্টা করেন গ্রামীন জীবনের সঙ্গে আরও বেশি করে নিজেদের সংযোগ গড়ে তুলতে। তারপর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিন একটি আশ্রমে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মেয়েদের জন্যে ক্লাসের১ ব্যবস্থাও সপ্তর্ষিরা করেছিলেন।

আরও পড়ুন
ইচ্ছের দৌড়- পর্ব ১
এই তিন বারের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আরও বড়ো করে এই কাজটি করবেন নতুন একটি গ্রামে। এই ছেলেমেয়েদের মধ্যেই একজন সপ্তর্ষি বৈশ্য, পূর্ব বর্ধমানের২ খাটুন্দি গ্রামে তাঁর শৈশব কেটেছে। পরবর্তী কর্মক্ষেত্রে হিসেবে তাই এই জায়গাটাকেই সবাই বেছে নিলেন। গত শুক্রবার ২৮ ডিসেম্বর সেখানে তাঁরা আয়োজন করলেন ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা শিবির। গ্রামের একটি মাত্র স্কুল, খাটুন্দি উচ্চ বিদ্যালয়। সেখানে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড ভেন্ডিং মেশিন আর ব্যবহৃত প্যাড ডিসপোজাল মেশিন বসানোর বন্দোবস্ত করলেন তাঁরা। সেই যন্ত্রগুলি ২৮ তারিখের আগেই গ্রামে পৌঁছে গেছিল। গোটা নভেম্বর-ডিসেম্বর জুড়ে তাঁরা অর্থ সংগ্রহ করেছেন, একত্রিত করেছেন প্রয়োজনীয় সব জিনিস। এই শিবির ছিল অরিঘ্ন, সপ্তর্ষিদের কাছে অভিনব শীতকালীন পিকনিকের মতো, যেখানে কমলালেবুর বদলে রয়েছে ন্যাপকিন।

গত শুক্রবার খাটুন্দি নিমতলা তরুণ সংঘ ক্লাব আর খাটুন্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে চার ভাগে শুরু হয় কর্মকাণ্ড। স্কুলের সব থেকে বড় ক্লাস রুমে প্রায় ৩০০ ছাত্রীকে নিয়ে চলে ঋতুকালীন সচেতনতার পাঠ। ৭ম, ৮ম, ৯ম, ১০ম, ১১দশ শ্রেণির ছাত্রীদের বোঝানো হয় মাসিক ঋতুস্রাব কী, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই বা কী। তা শেষ হলে তাদের হাতে-কলমে দেখানো হয় কীভাবে প্যাড ভেন্ডিং মেশিন ও ডিসপোজাল মেশিনটি ব্যাবহার করতে হবে। আসল জিএসটি বিল, মেশিনের চাবি, ম্যানুয়াল, প্যাড সবকিছু তুলে দেওয়া হয় স্কুলের প্রধান শিক্ষক জয়দেব স্যারের হাতে। স্কুলের মাঠে চলে নতুন কম্বল, চাদর, গামছা, টুপি উপহার দেওয়ার কাজ। মাঠের অন্য দিকে পুরানো জামাকাপড় বিলি চলতে থাকে। ক্লাবঘর ও তার চাতালে প্রথমে নতুন জিনিস দেওয়া হয়, তা শেষ হলে শুরু হয় পুরানো জামাকাপড় বিলির কাজ। খুদে দের জন্য ছিল বিস্কুট আর লজেন্স। অনেকে আরেকবার লজেন্স-বিস্কুট পাওয়ার জন্য দুবার লাইনও দিয়েছে, সপ্তর্ষি, অরিঘ্নরা জেনেও না করেননি, লজেন্সের জোগান বেশিই ছিল। দুবার লজেন্স পাওয়ার মজাই আলাদা ওই খুদেদের। ওই হাসিটাই ছিল উদ্যোক্তাদের প্রাপ্তি।