ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : পক্ষীরাজের লাগাম ২

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ২৩

গত পর্বের পর

ঠিক চার ঘণ্টা পরে বাস পৌঁছাল কিংস্টন শহরে। যাত্রীরা সকলে নেমে যে যার গন্তব্যস্থলে রওনা দিলো। বাস ডিপো নিঝুম। আমার কোনো গন্তব্যস্থল নেই। নিজের বলতে হাতে কেবল চার ঘণ্টা সময়। তারপরেই ফিরতি বাসে উঠে পড়তে হবে। আমি গুটিগুটি বাস কোম্পানির অফিসে গিয়ে কাউন্টারে বসা হাসিখুশি মেয়েটিকে বললাম যে আমি ভিনদেশী। সুদূর মন্টেগো বে থেকে এসেছি। কিংস্টন দেখবো বলে। চার ঘণ্টা পরে আবার ফিরতে হবে। সে যদি আমায় সস্তায় গণ্ডায় একটা ট্যাক্সি ঠিক করে দেয়, যাতে করে আমি এই শহরটা একটু ঘুরে দেখতে পারি তাহলে ভারী উপকার হয়। মেয়েটি বোধহয় এমন পাগল পর্যটক অগে কখনও দেখেনি। যাই হোক, খুঁজে পেতে Rhoan বলে একজন ট্যাক্সি চালকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলো। Rhoan বললো যে কুড়ি ডলারে সে আমাকে চার ঘণ্টা ধরে শহর ঘুরিয়ে দেখাতে পারে। ঠিক সময়ে আবার বাসে তুলে দেবে।

Rhoan

মুশকিল আসান Rhoan-এর গাড়িতে চেপে বসলাম বাক্যবাণ না করে। গাড়ি একটু ঝরঝরে… দু-তিনবারের চেষ্টায় চলতে শুরু করলো। বাস ডিপো থেকে বেরিয়ে আমরা নামলাম কিংস্টনের পথে। প্রথমেই Rhoan আমায় Scotchies বলে একটা জামাইকান রেস্তোরাঁয় নিয়ে গেলো দুপুরের খাওয়া সারতে। দোকানটি নাকি জামাইকান জার্ক চিকেনের জন্য বিখ্যাত। সেই সাত সকালে বেরিয়েছি… তারপরে চার ঘণ্টা বাসের ঝাঁকুনিতে জব্বর খিদে… জামাইকান জার্ক চিকেনের কথা আগে শুনেছিলাম। মুরগির মাংসতে ওরা নানারকম মশলা মাখিয়ে ঢিমে আঁচে অনেকক্ষণ ধরে রোস্ট করে। মশলায় মেশানো থাকে স্কচ বনেট নামে এক বিধ্বংসী লঙ্কার গুঁড়ো। সেই থেকেই দোকানের নাম Scotchies। সুন্দর বাগান ঘেরা ভারি লক্ষ্মীমন্ত রেস্তোঁরা। বাগানের মাঝে মাঝে ছোটো কাঠের টেবিল চেয়ার পাতা।

Scotchies

চারিদিকে কেবল পাখির ডাক শোনা যায়। খাবারের দাম বেশ সস্তা। এক প্লেট জার্ক চিকেন, ভাত, মিষ্টি আলু মাখা আর এক গ্লাস কমলা রসের নবাবী খানার দাম মাত্র তিন ডলার। একটা লতা ঘেরা কাঠের ছাউনিতে বসে খিদের পেটে সেই স্বর্গীয় খাবার খেয়ে ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। তারপরে Rhoan আমাকে সারা দুপুর ধরে কিংস্টনের আনাচ কানাচ ঘুরিয়ে দেখালো। ইংরেজ জমানায় তৈরি ডেভন হাউসের আভিজাত্য, বব মার্লের বসত ভিটে, ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যাম্পাস, পুরোনো কিংস্টন বন্দর… অনেকক্ষণ ধরে প্রাণ ভরে, চোখ ভরে সব দেখে শুনে পৌঁছে দিল Knutsford কোম্পানির বাস ডিপোতে। বিকেল সাড়ে চারটেতে ফিরতি বাস ধরলাম।

Rhoan আমাকে সারা দুপুর ধরে কিংস্টনের আনাচ কানাচ ঘুরিয়ে দেখালো। ইংরেজ জমানায় তৈরি ডেভন হাউসের আভিজাত্য, বব মার্লের বসত ভিটে, ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যাম্পাস, পুরোনো কিংস্টন বন্দর…

কিংস্টন বন্দর


ডেভন হাউস


বব মার্লের বসত ভিটে

মন্টেগো বে-তে যে সব পর্যটকরা আসে তাদের ভেতর কেউ নাকি সমুদ্রের জলে ঘোড়সওয়ারি করতে যায়। এমন ধারা কথা শুনে একটু বুক ধুকপুক যে করেনি তা নয়… ঠিক যেমনটা সাঁতার না জানা মানুষের করা উচিত আর কি! তা সত্ত্বেও দেখলাম, ঠিক পরের দিন বেহায়ার মতন কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রের সঙ্গে পৌঁছে গেছি শহর থেকে অল্প দূরে সমুদ্রের উপকূলে এক ঘোড়ার আস্তাবলে। সেখানে প্রথমেই একটা হলফনামায় সই করতে হয়। তাতে লেখা আছে যে, ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে কেউ যদি দাঁত ছিরকুটে পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙে বা ভুল করে সমুদ্রে ডুবে যায় তাহলে তার জন্য আস্তাবল কর্তৃপক্ষ দায়ী হবে না। এ হেন ভয়ানক কাগজে সই করতে গিয়ে অল্প ঘাবড়ে গিয়েছিলাম বটে। তবু মনে মনে বললাম… “Ya Maan… No Problem Maan…!”

প্রথমেই একটা হলফনামায় সই করতে হয়। তাতে লেখা আছে যে, ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে কেউ যদি দাঁত ছিরকুটে পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙে বা ভুল করে সমুদ্রে ডুবে যায় তাহলে তার জন্য আস্তাবল কর্তৃপক্ষ দায়ী হবে না। এ হেন ভয়ানক কাগজে সই করতে গিয়ে অল্প ঘাবড়ে গিয়েছিলাম বটে। তবু মনে মনে বললাম… “Ya Maan… No Problem Maan…!”

জানতে পারলাম আমার জন্য নির্দিষ্ট ঘোড়াটির নাম ডাইনামাইট। নাম শুনেই মনের ভেতর কেমন একটা ভীতি মিশ্রিত সম্ভ্রম… একটা সিঁড়ি দেওয়া উঁচু কাঠের পাটাতনে উঠে ডাইনামাইটের পিঠে বসতে হলো। এরমধ্যে আস্তাবল কর্তৃপক্ষ মাথায় একটা সাদা হেলমেট পরিয়ে দিয়েছে। মনের ভেতর বেশ একটা রেড রোডের মাউন্টেড পুলিশ পুলিশ ভাব। প্রথমেই আমাকে শেখানো হল কী করলে ডাইনামাইট ডানদিকে ঘুরবে,  বামদিকে ফিরবে, থমকে দাঁড়াবে বা পুচ্ছ তুলে দৌড়বে।  শেষেরটা দেখতে গিয়ে আর একটু হলেই বিস্তর দুঃখ ছিল কপালে। খুব জোর সামলেছিলাম। তারপরে খানিকক্ষণ ডাইনামাইটের পিঠে চেপে কিছুক্ষণ আশেপাশের এলাকা চড়ে বেড়ালাম। গাইড Hernando আমাকে দেখালো পোলো খেলার ময়দান, পুরোনো আখের কারখানার উইন্ডমিল, গ্রামের স্কুল, মধ্যবিত্তের আস্তানা…

ডাইনামাইটও ভদ্রলোকের মতো ঢিমে তালে চলছে। নিজের নামের মর্যাদা রাখতে আমাকে কোনোরকম বেকায়দায় ফেলেনি। শেষমেষ আমরা এসে পৌঁছালাম সাগরের কিনারে। যেদিকে দু-চোখ যায় ঘন নীল জল। কোথায় যেন সেই জল গিয়ে নীল আকাশের সঙ্গে মিশে গেছে।

ডাইনামাইটের সঙ্গে

ডাইনামাইট এদিকে জলে যেতে নারাজ। অতএব সাগরে যাবার সাঁতারু ঘোড়া এলো আস্তাবল থেকে। ধবধবে সাদা তার গায়ের রং। নাম মুনলাইট। আগে ডাইনামাইটের পরনে ছিল শক্তপোক্ত হার্নেস, পায়ে গলিয়েছিলাম লোহার আংটা। মুনলাইটের সাঁতারের পোশাক অন্যরকম। ভারী ভারী পোশাক পরে সাঁতার কাটা যায় না। মুনলাইটের পিঠে কেবল একটা পাতলা আসন শক্ত করে পেটের সঙ্গে বাঁধা, আর মুখে লাগাম আটকানো। আমি মাথার হেলমেট আর পায়ের জুতো খুলে রেখে ওর পিঠে চেপে বসলাম। আসনের ওপরে একটা চামড়া দিয়ে তৈরি হাতলের মতো রয়েছে। Hernando বলল যে আমি যেন এক হাতে লাগাম আর এক হাতে চামড়ার হাতলটা শক্ত করে ধরে থাকি। মুনলাইট যখন সাগরে নামবে তখন যেন ঘাবড়ে গিয়ে হাতের লাগাম বা হাতল ছেড়ে না দিই। পা দুটো দিয়ে যেন ওর পেট চেপে ধরে থাকি… বুকের ধুকপুক আওয়াজে সব কথা ঠিক শুনতে না পেলেও বুঝলাম যে, দু-টুকরো চামড়ার ওপরেই আমার ইহকাল পরকাল।

জলে নামলো মুনলাইট। আমার গোড়ালিতে জল… হাঁটুতে জল… পেটে জল… বুকে জল… গলায় জল… আঙুলে শক্ত করে ধরা আছে দু-টুকরো চামড়া… দুটো পায়ে জড়ানো মুনলাইটের পেট… যেদিকে দু-চোখ যায় শুধু নীল আর নীল… মুনলাইট সমুদ্রের উপরে হাঁটছে না সাঁতার কাটছে ঠিক ঠাওর করতে পারছিলাম না। একটা অদ্ভুত হুমমমমমমমমম হুমমমমমমমমম অচেনা আওয়াজ করছিল সে। মুখটা জলের ওপরে ভাসিয়ে রেখেছি আমি। আঙুলে লাগামের আশ্বাস। আর ইহকাল পরকালের সমস্ত ভার বহন করে ভিজে শরীরে সাগরের জল ঠেলে ভাষাহীন, পরিচিতিহীন এক অকল্পনীয় ধবধবে সাদা রঙের জান্তব বিশ্বাসবোধ…

“আলো-অন্ধকারে যাই—মাথার ভিতরে
স্বপ্ন নয়, কোন এক বোধ কাজ করে;
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,
হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;
___

শরীরে জলের গন্ধ মেখে,
উৎসাহে আলোর দিকে চেয়ে
চাষার মতন প্রাণ পেয়ে
কে আর রহিবে জেগে পৃথিবীর ’পরে?
স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—কোন এক বোধ কাজ করে
মাথার ভিতরে…..”

চলবে…

___________________

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia