ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : ঢোলগোবিন্দ

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ১৬

   গত পর্বের পর   

 

ফিরতি পথে সন্ধেকে ধাক্কাধুক্কি দিয়ে সরিয়ে ঝুপ করে রাত নামল ২৫১ নম্বরে। গরুর গাড়ির হেডলাইট কথাটা নেহাত মিথ্যে নয়। লাল সেলাম বেশ চোখ গরম করে আমাদের আগলে আগলে চলেছে। কচ্চিৎ কদাচিৎ দু-একটা জীপ হুশ করে পাশ কাটিয়ে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে৷ লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্কর পাখিরা ঘুমে অচেতন। দৃষ্টি ও শ্রবণ যখন অকেজো তখন ঘ্রাণ হয় তীক্ষ্ণ। মাছের আঁশটে গন্ধ জানিয়ে দেয় লাগুনা ডেল ফ্লামেঙ্কর অবস্থান৷ আরো যেটা এই সময় তীক্ষ্ণ ছিল তা হলো ক্ষুধা। ফাহার্দ ফেরীঘাটের পাস্তিলো কার্নে যে কখন হজম হয়ে গ্যাছে কে জানে। পেটের ভেতরে ছুঁচোরা ডন বৈঠক সেরে মুগুর ভাঁজতে লেগেছে। পর্যটন দপ্তরের কাগজ ঘেঁটে আমরা আগেই ঠিক করেছিলাম যে আজ রাতের ডিনার সারব এল ইডেন রেস্তোরাঁয়।

এল ইডেন নাকি টাটকা মাছের স্বর্গ। কুলেব্রায় এসে স্বর্গে যাব না তাও কি হয় নাকি! ময়ূর পেখম জল থেকে সদ্য ধরে আনা মাছ, লবস্টার, শঙ্খ রান্না হয় তরিবত করে। এখানে নাকি খোদ স্পেন থেকে আনা জাফরান দিয়ে তৈরি হয় চিংড়ি আর আঙুর দেওয়া রিসোটো। সেটি যে একবার খেয়েছে তার স্বর্গলাভ সুনিশ্চিত। অতিথি আপ্যায়ন নাকি অসাধারণ। দোকানের মালিক দম্পতি রিচার্ড আর লুজের ভাষায়, “এখানে যদি একবার আসো, তুমি বন্ধু… যদি বারবার আসো, তাহলে তুমি পরিবার।”

মামাসিটাস গেস্ট হাউস থেকে প্রথম ডানদিক ঘুরলেই একটা ছোটো কাঠের পাটাতন দেওয়া ব্রিজ… নিচে সাগর থেকে বিছিন্ন এক বিরহী জলপ্রণালী… তারপরেই একটা বাঁদিক নিলেই এল ইডেন রেস্তোরাঁ। সেখানে পৌঁছে লাল সেলামকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাঁধা ছাদা করে যখন রেস্তোরাঁর দরজা ঠেলে ঢুকলাম তখন সেখানে খদ্দেরের জমজমাট ভিড়। নীল রঙের ছাদ, কমলা রঙের দেওয়ালে টুনি বাল্বের মালা ঝোলানো… দরজার পাশেই পানশালা… কাচের গবলেটের কানায় নুন মাখিয়ে, লেবু বা আনারসের চাকতি সাজিয়ে তৈরি হচ্ছে রংবাজ মার্গারিটা। কাচের গেলাশের টুং টাং শব্দ ছাপিয়ে ক্যারিব দ্বীপের বাজনা… মিঠে পার্কাসানের আওয়াজ বুকের ভেতরে দ্রিমি দ্রিমি শব্দে ধাক্কা মারে। ঢুকতেই অভ্যর্থনা জানাল এক প্রমাণ সাইজের চোখে ফেট্টি বাঁধা মাটির জলদস্যু আর নীল ছোপ জামা গায়ে দোকানের মালিক রিচার্ড।

‘আপনাদের রিসার্ভেশন আছে?’
‘আজ্ঞে না… তবে জম্পেশ খিদে আছে।’

রিচার্ড রসিক মানুষ। মুচকি হেসে বলল…
‘আসুন একটা টেবিলের ব্যবস্থা করছি।’

দেওয়াল ঘেঁষে একটা টেবিল পেলাম। সেখানে বসে রেস্তোরাঁর সকলকে হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দেখছি এমন সময় আমাদের টেবিলে এসে বসলেন রিচার্ডের স্ত্রী লুজ৷ পরণে কালো গাউন, কালো ঢেউ খেলানো চুল… লম্বাটে গড়ন। মনে হয় আদি নিবাস স্পেন… সেই জন্যেই বোধহয় এই স্বর্গের অমৃত হলো জাফরানি রিসোটো। লুজ আমাদের ধৈর্য ধরে আজ মেনুতে কি কি আছে… আর তা কেমন করে তৈরি হয়েছে সব বুঝিয়ে দিলেন। দোকানের মালকিন নিজে এসে মেনু বুঝিয়ে অর্ডার নিচ্ছেন এমন অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। যাই হোক… সাব্যস্ত হলো যে জেনিফার খাবে মাখন মাখা লবস্টার আর আমি খাব একটা রেড স্ন্যাপার ভাজা। সঙ্গে এক বাটি চিংড়ি আর আঙুর দেওয়া রিসোটো আমরা ভাগাভাগি করে নেব। জেনিফার খাবে একটা রংবাজ মার্গারিটা আর আমি খাব এক গেলাস ঠান্ডা জল।

খানিক বাদে টেবিলে খাবার এল। খাবারের পরিমাণ দেখে তো আমাদের চোখ কপালে… জেনিফারের লবস্টার যেন মাখনে নাইতে আসা তিমিমাছ… আর আমার রেড স্ন্যাপার বিশাল প্লেটে জায়গা সংকুলান করতে পারছেনা… তার কুরমুরে ভাজা ল্যাজ প্লেটের বাইরে নিশানের মত উত্তান। যেমন টাটকা মাছ, তেমন উপাদেয় রান্না। পেট ভরে মন ভরে তৃপ্তি করে খেয়ে দেয়ে রিচার্ড আর লুজকে বিদায় জানিয়ে লাল সেলামকে বন্ধনমুক্ত করে ফিরলাম মামাসিটাস গেস্ট হাউস।

সেখানে তখন সাংঘাতিক জগঝম্প বাজনা চলছে… চারিদিকে আলোর রোশনাই… গিটার বাজিয়ে গান গাইছে একটি মেয়ে… ঘন নীল জলের লাগোয়া টেবিলে গালগল্পে মশগুল হুল্লোরে মানুষ… বরফ শীতল মার্গারিটারা নুন ছিটিয়ে তৈরি… দেয়ালে একটা সাইন দেখতে পেলাম… বালিমাখা পায়ের বুড়ো আঙুল আর নুনমাখা চুমু…’

ঢিলেঢালার কথা মনে পড়ল…

“আপনারা বেলাবেলি ঘুরে আসুন৷ বেশি রাত করবেন না৷ মামাসিটাস গেস্ট হাউসে উইকএন্ডে দারুণ সব নাচাগানার ব্যবস্থা থাকে। মিস করবেন না যেন…”

চারিদিকে আলোর রোশনাই… গিটার বাজিয়ে গান গাইছে একটি মেয়ে… ঘন নীল জলের লাগোয়া টেবিলে গালগল্পে মশগুল হুল্লোরে মানুষ… বরফ শীতল মার্গারিটারা নুন ছিটিয়ে তৈরি… দেয়ালে একটা সাইন দেখতে পেলাম… ‘বালিমাখা পায়ের বুড়ো আঙুল আর নুনমাখা চুমু…’

জলের ধারে একটা টেবিলে বসলাম আমি আর জেনিফার। অন্ধকার নেমেছে৷ সেই অন্ধকারে জলের ভেতরে কয়েকটা ঘন নীল রঙের সম্মোহক আলো জ্বলছে। সেদিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকা যায় বহুক্ষণ। দেখলাম আমারই মতো সম্মোহিত কয়েকটা বিশাল মাছ সেই আলোকে ধীরে ধীরে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। তাদের যেন আর অন্য কোথাও সাঁতরে যাবার শক্তি নেই। কিছু না অর্ডার করলে যদি খেদিয়ে দেয়, তাই আমরা ফলের রস চাইলাম। মামাসিটাস গেস্ট হাউসে উইকএন্ডে সন্ধ্যায় বোধহয় এমন অর্ডার কেউ করে না। পরিবেশিকা শুধোল আমরা ফলের রসে রাম মেশাতে চাই কিনা। আমাদের উত্তর শুনে চাহিদার বৈচিত্র্যেু ওবেলিক্সের কায়দায় দিস টুরিস্টস আর ক্রেজি জাতীয় কিছু একটা স্বগতোক্তি করে আমাদের চাহিদা মিটিয়ে টাকা বুঝে নিল।

ঠিক এই সময়ে গায়িকা গান শেষ করে গিটার বাক্সবন্ধ করে চলে গেলেন আর শুরু হল সার্বজনীন কারাওকে। সামনে একটা স্ক্রিনে গানের কথা ভেসে ভেসে উঠছে… ভালোবাসার গান, মিলনের গান, বিরহের গান আর সমবেত জনতা গলা সপ্তমে ঠেলে সেই সব গান গাইতে লেগেছে৷ সব গানই তাদের মুখস্থ। কেউই খুব একটা পর্দায় চোখ ফেলছে না। বুঝলাম ঢিলেঢালা উইকএন্ডে দারুণ সব নাচাগানার ব্যবস্থা নিয়ে অতিশয়োক্তি করেনি।

খানিক বাদে জেনিফারের পানে চেয়ে দেখি কপালে বেশ কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে।

“বেশি আওয়াজ মনে হচ্ছে? ঘরে যাবে?”
“তাই চলো।”

কারাওকে স্টেজের পাশ দিয়ে দোতলার সিঁড়ি আর তার মাথাতেই আমাদের ঘর। তখন প্রায় মধ্যরাত৷ নীচে সকলে চিল চিৎকার করে গাইছে… ‘ইউ আর দ্য ওনলি ওয়ার্ল্ড আই নো…’

ঘরে ঢুকে দোর দিলাম। জেনিফার ওর ব্যাকপ্যাক খুলে ক্রীম, চিরুনি ইত্যাদি বার করছে… কপালে আওয়াজের ধাক্কা।

“আমি আমার ফোনে অ্যালার্ম দিয়ে রাখছি বুঝলে… কাল অন্ধকার থাকতে উঠে দ্বীপের অন্য দিকটা ঘুরে আসব। দুপুর একটার ফেরী নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।”

জেনিফারের ক্রিমমাখা হাত নাকের পাশে থমকালো।

“এই এত রাতে ঘুমিয়ে অন্ধকার থাকতে উঠবে?… আজ এত ধকল গেল… আমি বোধহয় অত সকালে উঠতে পারবো না।”

“আচ্ছা, তুমি দেখো উঠতে পারো কিনা… আমি ভোরবেলা যাব ঠিক করলাম।”

“আমি না গেলেও যাবে?”

“হ্যাঁ, যাব। কাল হাতে কেবল কয়েক ঘণ্টা সময়। ভোরবেলা না গেলে আমার এই জীবনে আর কুলেব্রার বাকিটা দেখা হবে না। এই দ্বীপে সূর্যোদয় দেখা হবে না… আর পরজন্ম সম্বন্ধে এখনও ধারণা বেশ ধোঁয়াটে।”

জেনিফার মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাঃ হাঃ করে হাসলো।

“ঠিক আছে… আমাকেও ডেকে দিও… আমিও যাব… পরে জাহাজে ফিরে ঘুমিয়ে নিলেই হবে ”

“বেশ তো”

নিচে সকলে চিল চিৎকার করে গাইছে… “উনা পালোমা ব্লানকা”

আমি লাল ফুলতোলা কাপড়ের ব্যাগ থেকে রাতের পোশাক, দাঁতের মাজন, ব্রাশ ইত্যাদি নিয়ে বাথরুমে গেলাম। সেখানে গিয়ে প্রথম কাজ হলো জোরে কল খুলে দেওয়া… যাতে কোনো জৈবিক শব্দবাদ্য জেনিফারের কানে না পৌঁছয়। এমনিতেই আমি কোনোদিন কোনো মেমসাহেবের সঙ্গে রাত্রিবাস করিনি… তার ওপরে যদি রাত্রে নাক ডাকে সেটা নিয়েও বিশেষ দুশ্চিন্তা। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কলকাতার এসি মার্কেট থেকে কেনা কমলা ফুল ছাপ, বুকে বক্রম সেলাই আর লেস বসানো ঢোলগোবিন্দ হাফ হাতা নাইটি পরে খুব আড়ষ্ট হয়ে বাথরুম থেকে বেরোলাম।

সামনে একটা স্ক্রিনে গানের কথা ভেসে ভেসে উঠছে… ভালোবাসার গান, মিলনের গান, বিরহের গান আর সমবেত জনতা গলা সপ্তমে ঠেলে সেই সব গান গাইতে লেগেছে৷ সব গানই তাদের মুখস্থ।

নিচে সকলে চিল চিৎকার করে গাইছে… “সুইট ক্যারোলাইন…”

জেনিফার হরাস করে ওর ফুলহাতা গেঞ্জি আর জিনস খুলে ফেলল… দেখলাম নিচে একটা কালো হাফ প্যান্ট আর কালো হাতকাটা গেঞ্জি। ওর কোনো ঢোলগোবিন্দ হাফ হাতা নাইটি নেই।

“আমার কাছে মুখ পরিষ্কার করার জন্য তুলো আছে জেনিফার… এই নাও… কানে গুঁজে নাও… নিচে যা আওয়াজ হচ্ছে! গুড নাইট স্লিপ টাইট।”

ঘড়িতে ভোর চারটের অ্যালার্ম দিয়ে ঢোলগোবিন্দকে সামলে সুমলে বিছানার এক্কেবারে বাঁদিকে, বাঁদিক  ফিরে শুলাম।

নিচে সকলে চিল চিৎকার করে গাইছে… “এন্ড আই লাভ ইউ সো… দ্যাট পিপল আস্ক মি হাউ… হাউ আই লিভড টিল নাউ… আই টেল দেম… আই ডোন্ট নো…”

চলবে…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia