ভালোবাসার কথা বলতে এলাম : গ্রেগরী পেক

বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ১৩

  গত পর্বের পর  

জেনিফারের সঙ্গে দেখা হলো সান হুয়ানে আমার প্রিয় রেস্তোরা রাইসেস-এ। আমাদের জাহাজঘাটার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পুয়ের্তো রিকান রেস্তোরা রাইসেস। ধবধবে সাদা মলমলের স্কার্ট ব্লাউস আর মাথায় সাদা বান্দানা পরা মেয়েরা সেখানে খাবার পরিবেশন করে। তাদের অলিভের মতো গায়ের রং আর ধবধবে সাদা মলমলের মতো হাসি। সেখানে গেলেই তারা আদর আপ্যায়ন করে কাঠের চেয়ার টেবিলে বসতে দেয়… টিনের থালা বাটিতে খেতে দেয়… টিনের বালতিতে লাল ন্যাপকিনে সাজিয়ে দেয় খাবার কাঁটা চামচ… সেখানে গেলে টাটকা ডাবের জল, মশলাদার কাঁচকলা সেদ্ধ বা মফঙ্গ আর সদ্য ধরা মাছ বা চিংড়ির সূরুয়া দিয়ে গরম ভাত খাওয়া যায়। সেখানে গেলে মনে হয় অনেকদিন জলে ভেসে বেড়াবার পরে বাড়ি ফিরলাম যেন।

জেনিফার জানালার ধারে একটা টেবিলে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ওর সামনের টেবিলে টিনের বালতিতে লাল ন্যাপকিন রোদ্দুরের আলোয় প্রোজ্জ্বল। পর্যটন আপিসের কাগজপত্র, কুলেব্রার ম্যাপ, বাস রুট সব টেবিলে মেলে ধরে ভাত আর চিংড়ি অর্ডার করলাম। সস্তায় গন্ডায় কুলেব্রা যাবার জটিল প্রক্রিয়া শুনে তো জেনিফারের চক্ষু চড়কগাছ! করকরে ১০০ ডলার গচ্ছা দিয়ে ট্যাক্সি ধরে ফাহার্দ ফেরীঘাটে যাবার প্ল্যানটাও একই রকম কষ্টদায়ক। জেনিফার ভাবুক ভাবুক মুখ করে খানিকক্ষণ জানালার বাইরে রোদের পানে চেয়ে রইলো…

“আমি বোধহয় গোটা এক দিন আর এক রাত ছুটি পাবো না। কয়েকজন ছাত্র বলছিল কথা বলতে চায়… ওদেরকে সময় দিতে হবে…”

“আচ্ছা… তুমি তোমার দপ্তরে কথা বলে দ্যাখো ছুটি পাও কিনা… আমি আগামীকাল যাব ঠিক করলাম।”

“আমি না গেলেও যাবে?”

জেনিফার জানালার ধারে একটা টেবিলে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ওর সামনের টেবিলে টিনের বালতিতে লাল ন্যাপকিন রোদ্দুরের আলোয় প্রোজ্জ্বল। পর্যটন আপিসের কাগজপত্র, কুলেব্রার ম্যাপ, বাস রুট সব টেবিলে মেলে ধরে ভাত আর চিংড়ি অর্ডার করলাম।

“হ্যাঁ… যাব। আগামীকাল না গেলে, এই জীবনে আমার আর কুলেব্রা যাওয়া হবে না। আর পরজন্ম সম্বন্ধে এখনও ধারণা বেশ ধোঁয়াটে।”

জেনিফার মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাঃ হাঃ করে হাসলো… সেই হাসির চমক লাগল ওর চোখে আর তার আওয়াজ আমাদের টেবিল অতিক্রম করে ঘুরে বেড়ালো কাঠের টেবিলে, জানালার রোদ্দুরে, ধবধবে সাদা মলমলের স্কার্ট ব্লাউজ আর মাথার সাদা বান্দানায়…

“তুমি একটা আস্ত পাগল! আচ্ছা দাঁড়াও…  কাল ছুটির ব্যবস্থা করছি… তবে আমরা ওই বাস, ট্রেন, ফেরী ফেলের চক্করে পড়ব না… বেশি খরচ হলেও আমরা ট্যাক্সি চেপেই ফেরিঘাটে যাব।”

“বেশ তো… তাই সই…”

আমিও স্বস্তি পেলাম। সস্তার তিন অবস্থা কথাটা তো নেহাত ফেলনা নয়। খাওয়া দাওয়া সেরে জেনিফার জাহাজে ফিরে গেল। ও বেশিক্ষণ রোদে থাকতে পারে না… এছাড়া ওর ফোন, ইমেল, টেক্সটের পিছুটান আছে… আমি হাঁটতে হাঁটতে বাস গুমটিতে গিয়ে একটা টি ৫ বাস ধরে ঘুরে বেড়ালাম গোটা সান জুয়ান শহর… কালে লৈসা, আইলা ভার্দে, ইতুরেগুই… আরো কত সব অচেনা জায়গা…। ফেরবার পথে জাহাজঘাটার বাইরে এক ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে দরদাম সেরে ফেললাম। রফা হলো যে সে আমাদের পরদিন দুপুর বারোটায় তুলে নিয়ে ফাহার্দ ফেরীঘাটে পৌঁছে দেবে আর ভাড়া বাবদ নেবে ৮০ ডলার… তার এক কানা কড়িও কম নয়!

পরদিন ঠিক সময়ে লাল সালোয়ার কামিজ আর লাল ফুলতোলা কাপড়ের ব্যাগে রাত্রিবাসের উপযোগী অল্প কিছু দরকারি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে সোজা হাজির জাহাজঘাটার গেটে। পেট পুরে লাঞ্চ সেরেও ব্যাগে দুটো আপেল আর এক বোতল খাবার জল নিয়ে নিয়েছি। সাবধানের মার নেই! জেনিফারও ঠিক সময়ে উপস্থিত। ওর মাথায় রোদ্দুর আটকানো বিশাল খড়ের টুপি, পরণে একটা ফুলহাতা গেঞ্জি আর জিনস। পিঠের ব্যাকপ্যাকে ওর আগামী ২৪ ঘণ্টার প্রয়োজনগুলি। দরদাম করে ট্যাক্সি ভাড়ায় খানিকটা সাশ্রয় করতে পেরেছি শুনে ভারী খুশি হলো সে।

ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম দুজনে। চালক বেশ হাসিখুশি আর গপ্পে। বেশ ঝিং চ্যাক বাজনা বাজছে গাড়িতে… ক্যারিব সাগরের হাওয়া এসে গাড়ির ভেতরে সে কী হুটোপাটি… আমাদের ফেরী ছাড়বে তিনটের সময়… তেমন ভিড় না হলে আমরা দুপুর দুটো নাগাদ পৌঁছে যাব ফাহার্দ ফেরীঘাটে। সব ঠিকঠাক চলছে…

“ইয়ে বলছিলাম… কুলেব্রাতে আমরা রাতে কোথায় থাকব?”

“ওহ… দাঁড়াও… সেটা এখনি ঠিক করে ফেলি… তবে ওখানে পৌঁছেও খুঁজে নেওয়া যাবে…”


 
মনে হলো জেনিফার থাকার জায়গা ঠিক না হলে স্বস্তি পাবে না… ওর কপালে একটা দুটো ভাঁজ পড়ছিল। আমার ব্যাগ হাতরে বের হলো পর্যটন দপ্তরের দেওয়া হোটেলের হদিশ… জেনিফারের ব্যাগ হাতরে বের হলো সেলফোন। জানালার বাইরে হুশ হুশ করে সরে যাচ্ছিল হাসিয়েন্দা পাহাড়, ক্যারোলিনা, রিও গ্রান্ডে, লোকিলো… আমার মন রইলো সেখানে… চোখ রইলো হোটেলের ফোন নম্বরে… কান রইলো জেনিফারের কথোপকথনে। বেশ কয়েকটা জায়গায় ফোন করলো জেনিফার… “ঠাঁই নাই… ঠাঁই নাই…”

ওর কপালে যে অতগুলো ভাঁজ পরে তা কে জানত … বুঝলাম রাত্রিবাসের ঠিকানা না পেলে এই দ্বীপান্তরকে ও কালাপানিতে চিরনির্বাসনের স্টেটাস দেবে। অবশেষে হোটেল দেবতা মুখ তুলে চাইলেন। এক হোস্টেলের মালকিন ফোন ধরলেন। জানালেন যে কুলেব্রার ফেরিঘাট থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ওঁর হোস্টেল। সেখানে খুবই পকেটবন্ধু দামে আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হবে।

আমাদের ঘরে অবশ্য অন্যান্য মানুষ জন থাকবে… এটা একটা হোস্টেল কিনা… হোটেলের মতো প্রাইভেট রুমের ব্যবস্থা এখানে নেই। বাথরুমও সার্বজনীন। ভদ্রমহিলা খুবই করিতকর্মা। মুহূর্তের মধ্যে জেনিফারের সেল ফোনে ভেসে উঠলো ফেরীঘাট থেকে হোস্টেলে যাবার ম্যাপ। ফেরী থেকে নেমে তিনবার ডানদিক ঘুরলেই বাঁদিকে হোস্টেল… আমাদের ভুলচুক হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই… জেনিফারের কপাল অবশেষে মসৃন… আমার চোখ, কান, মন সমস্ত আচ্ছন্ন করে রইল… হাসিয়েন্দা পাহাড়, ক্যারোলিনা, রিও গ্রান্ডে, লোকিলো…

আমাদের ঘরে অবশ্য অন্যান্য মানুষ জন থাকবে… এটা একটা হোস্টেল কিনা… হোটেলের মতো প্রাইভেট রুমের ব্যবস্থা এখানে নেই। বাথরুমও সার্বজনীন। ভদ্রমহিলা খুবই করিতকর্মা। মুহূর্তের মধ্যে জেনিফারের সেল ফোনে ভেসে উঠলো ফেরীঘাট থেকে হোস্টেলে যাবার ম্যাপ।

এক অজানা দ্বীপের পথে চলেছি… সেখানে পৌঁছে তিনবার ডানদিক ঘুরেই আমার গন্তব্য… আগামী ২৪  ঘণ্টার মতো ঠাঁই… সেখানে লাল সালোয়ার কামিজ পরণে লাল ফুলতোলা কাপড়ের ব্যাগে স্থাবর অস্থাবর নিয়ে কলিং বেল বাজালেই যে মানুষটা দরজা খুলবে তাকে নিশ্চয় এক্কেবারে গ্রেগরী পেকের (Gregory Peck) মতো দেখতে…!

চলবে…

*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

Developed by DXDasia