
বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ – পর্ব ১২
গত পর্বের পর
এবারের সমুদ্র -সফরের নতুন সহযাত্রী ছিল বছর পঁয়ত্রিশের ছিপছিপে, পেলব, জেনিফার লেভেস্কু। জেনিফার একজন মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলার। এইটে আমাদের লেফট, রাইট, এটেনশন, ইউনিফর্ম, আধা সামরিক হাঁক ডাকের মাঝে এক নব্য ব্যাপার বটে। এমনিতে আমাদের জাহাজে ডাক্তার বদ্যিরা কেবলমাত্র শারীরিক ভাঙচুর, জ্বর, পেটের অসুখ ইত্যাদি প্রভৃতি কেতরে পড়ার মেরামতি করে এসেছে… তবে ইদানীং কালে খেয়াল করছি যে শরীরের খোলসের ভেতরে যে জটিল মনের বাসা… সেই বাসার পরিচর্যা, মেরামত, উঠোন নিকোনোর প্রতিও কলেজ যত্নশীল হয়েছে। কানাঘুষো শুনেছি যে মনের দুঃখে নাকি দু-একজন বিফল প্রেমিক ছাত্র জলে ঝাঁপ দেবার কথা বলেছিল। আমাদের জাহাজে নরম সরম জেনিফার লেভেস্কুর আগমন হল সেই সব মানসিক অশান্তির মুশকিল আসানকারী এক নবদিগন্তের সূচক।
জেনিফার লেভেস্কুর সঙ্গে প্রথম আলাপ হয় জাহাজের খাবার ঘরে নৈশভোজের সময়। জাহাজে নৈশভোজ হলো বিকেল পাঁচটা থেকে সাড়ে ছটা পর্যন্ত। সকলের খাওয়া হলে তবেই রাঁধুনিরা দিনের মতো ছুটি পাবে। কাচের জানালার বাইরে খটখটে রোদে সমুদ্রের রং নীলার মতো দ্যুতিমান। সারাদিন ক্লাস পড়িয়ে, সেদ্ধ সবজি, পাস্তা, আর মশলার নামগন্ধহীন হয় মাছ, নয় মাংস দিয়ে রাতের খাবার সোনামুখ করে খেয়ে ফেলতাম রোদ্দুর ঝলকানো ঢেউয়ের দিকে চেয়ে। কয়েকটা গোল টেবিলে এককাট্টা হয়ে বসে ইঞ্জিনিয়াররা, ডেক অফিসাররা, ডাক্তারেরা… নৈশভোজের সময় তারা নিজেদের মধ্যে তাদের দপ্তরের খুঁটিনাটি আলোচনা করে। আমার দপ্তর থেকে যেহেতু কেবল আমি একাই যাই তাই আমার কোনো নির্দিষ্ট টেবিল নেই… ঘুরে ফিরে যেখানে জায়গা পাই বসি… কানের পাশ দিয়ে ভেসে যায় অন্যান্য দপ্তরের খুঁটিনাটি আলাপচারিতা… কাঁটা চামচে আলগোছে বিদ্ধ হতে থাকে আলুনি সেদ্ধ সবজি, পাস্তা, আর মশলার নামগন্ধহীন, হয় মাছ, নয় মাংস।

নৈশভোজ
একদিন ডাক্তারদের টেবিলে বসেছি… আর বসেছে বছর পঁয়ত্রিশের নরম সরম এক মেয়ে। আলাপ হলো… নাম জানলাম… জেনিফার লেভেস্কু… এই সফরের নবতম সংযোজন… মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলর৷ জেনিফার খুব আস্তে কথা বলে… বাদামি চুলগুলো কোনোরকমে একটা গিঁট্ দেওয়া… পরণে জাহাজের নীল আর খাকি ইউনিফর্ম… মুখে প্রসাধনের লেশমাত্র নেই… প্রথম আলাপে যেটা খেয়াল করলাম তা হলো ওর উদাত্ত হাসি। ও যখন হাসে তখন মাথা ঝাকিয়ে ঝাকিয়ে হাঃ হাঃ করে হাসে… সেই হাসির চমক লাগে ওর চোখে আর তার আওয়াজ আমাদের টেবিল অতিক্রম করে ঘুরে বেড়ায় ইঞ্জিনিয়ারদের, ডেক অফিসারদের টেবিলের খুঁটিনাটি আলোচনায়।

জেনিফার লেভেস্কু
অন্যান্য সময়ে জেনিফার লাজুক আর মুখচোরা। কথাবার্তায় বুঝলাম যে এই নতুন কর্মস্থলের সাথে মানিয়ে নিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে ওকে… ঢেউয়ের উত্থান পতন, আধা সামরিক আদব কায়দা, আবহাওয়া আর ক্যাপ্টেন বুশীর মেজাজের অনিশ্চয়তা… সবটাই ওর কাছে একেবারে আনকোরা। জাহাজে ছাত্রীদের আর রাঁধুনিদের বাদ দিলে আমাকে নিয়ে মাত্র গুটিচারেক মেয়ে… অন্য দুজন বেশ কাঠখোট্টা ডাকাবুকো মেরিন ইঞ্জিনিয়ার… তাদের সাথে তেমন কথাবার্তা জমে না… অতএব জেনিফারের সবে ধন নীলমণি হলো মধুবাণী। সে আমার সাথে খটখটে রোদে নৈশভোজ সারে… আমার সাথে স্ক্রাবেল খেলায় রোজ হারে… আর এক মাথা জোছনা মেখে রাত্তিরে জাহাজের ডেকে বসে আমার সাথে সুখ দুঃখের গল্প করে।
জাহাজে ছাত্রীদের আর রাঁধুনিদের বাদ দিলে আমাকে নিয়ে মাত্র গুটিচারেক মেয়ে… অন্য দুজন বেশ কাঠখোট্টা ডাকাবুকো মেরিন ইঞ্জিনিয়ার… তাদের সাথে তেমন কথাবার্তা জমে না… অতএব জেনিফারের সবে ধন নীলমণি হলো মধুবাণী। সে আমার সাথে খটখটে রোদে নৈশভোজ সারে…
বিয়ে করেনি জেনিফার। কারণ জানতে চাইনি। এমনিতেই আমার কৌতূহল অল্প। জেনিফার যা নিজের থেকে বলতে চায় কেবল সেইটুকুই শুনি। এক রাতে জাহাজের ডেকে বসে ঢেউয়ের দিকে চেয়ে বললে সে একজনকে ভালবাসে… ভদ্রলোক নৌকো তৈরি আর সারাইয়ের কাজ করেন। তাকে ছেড়ে মাঝসমুদ্রের এই দোলাচল জেনিফারকে কষ্ট দেয় খুব। জ্যোৎস্নায় জেনিফারের চোখদুটো চিকচিকোচ্ছিল। আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম।
দিন যায়… রাত যায়… ভাসতে ভাসতে একদিন আমরা এসে পৌঁছলাম পুয়ের্তো রিকোর সান জুয়ান বন্দরে। এখানকার মানুষজনেরা বলে সান হুয়ান। ভূগোলের ম্যাপে দেখেছিলাম যে পুয়ের্তো রিকোর দক্ষিণ পূর্ব কোনে এক ক্ষুদে দ্বীপ রয়েছে… তার নাম কুলেব্রা। নামের মধ্যে কেমন একটা দখিনা বাতাস… দীঘল বেনীর ভাব রয়েছে যেন।
সান জুয়ান
“বুঝলে জেনিফার… আমার খুব কুলেব্রা যেতে ইচ্ছে করছে… তুমি আমার সঙ্গে যাবে?”
এমনিতে আমি সব জায়গায় হুট করে একাই চলে যাই… অন্য মানুষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, ছক কষে, হিসেব নিকেশ করে চলার অভ্যেস নেই আজ বহুদিন হল। জাহাজে জেনিফারের তেমন বন্ধু নেই… এছাড়া বন্দরে এসে বিরহী যক্ষের মতো ম্রিয়মান হয়ে কেবিনে আটকা থাকার মতো বাজে জিনিস আর দুটো নেই। জেনিফার ফোন, ইমেল, টেক্সটের জটে ‘যাও পাখি বলো তারে… সে যেন ভোলে না মোরে’ সামসুঙ্গে শ্যামসঙ্গ ভজনা করে যাবে অহর্নিশি আর কালবৈশাখী মার্কা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। এ হতে দেওয়া যায় না।

কুলেব্রা ম্যাপ
“কুলেব্রা? সেটা আবার কোথায়? কেমন করে যেতে হয়?”
“কুলেব্রা একটা দ্বীপ জেনিফার… এই শহর, চেনা গণ্ডির বাইরে… সেখানে কেমন করে যেতে হয় তা আমার জানা নেই৷ তবে রোসো… খোঁজ নিছি।”
বন্দরের গেটের বাইরে পুয়ের্তো রিকোর পর্যটন দপ্তরের আপিস। সেখানে গেলাম দিশার সন্ধানে। খুব লম্বা নখ আর হেয়ার জেল ঢালা বজ্রকঠিন চুল, কাউন্টারের ওপাশ থেকে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। জানা গেল যে সস্তায় গন্ডায় যাবার উপায় বেশ কঠিন। প্রথমে সান হুয়ান বন্দরের বাস গুমটি থেকে এম-৩ বাসে চেপে যেতে হবে সাগার্দ কোরাজোন রেল স্টেশনে। সেখান থেকে রেলে করে যেতে হবে রিও পিয়েদ্রা স্টেশন। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বা অন্য কোনো অজানা উপায়ে যেতে হবে ফাহার্দ ফেরীঘাট। সেখান থেকে ফেরী করে যেতে হবে কুলেব্রা দ্বীপ। এসব করতে খরচ পরবে ১৫ ডলার তবে একটা গোটা দিন লেগে যাওয়া অসম্ভব নয়। ফেরী ফেল করবার সম্ভাবনাও রয়েছে। বিকেলের ফেরী না ধরতে পারলে ফাহার্দ ফেরীঘাটেই রাত কাটাতে হবে। নয়তো আমরা ট্যাক্সি ধরে ফাহার্দ ফেরীঘাটে যেতে পারি… চালকের সঙ্গে দরদস্তুর করতে হবে… খরচ পরবে ১০০ ডলার মতো। এইসব বলে লম্বা নখ আমার হাতে কুলেব্রার হোটেলের প্যামফ্লেট, বাস আর ট্রেনের রুট ম্যাপ ধরিয়ে দিয়ে অন্য পর্যটকের সাথে কথা কইতে লাগলেন।

জাহাজী
কাগজপত্র বগলদাবা করে রোদ্দুর বিছানো সান জুয়ানের পথ দিয়ে এগোলাম জেনিফারের সঙ্গে দেখা করতে। সেই দখিনা বাতাস… দীঘল বেনীর মতো যার নাম, তার কাছে পৌঁছবার সময় এসেছে।
চলবে…
*বাণিজ্যিক নৌ-শিক্ষণের সূত্রে সাতশোর উপর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাগরে ভাসা ও নিত্য নতুন বন্দরে ভ্রমণ করেছেন আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh)। অবিশ্বাস্য সেই ভ্রমণ কাহিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতি সোমবার বেলা ১২টায় প্রকাশিত হচ্ছে বঙ্গদর্শনে। আগের পর্বগুলি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন।

