শৈল্পিক টানে বাংলার ঘরে ঘরে পা রাখেন মা লক্ষ্মী

সৌভাগ্য, সম্পদ কামনার আড়ালে আশ্বিনপূর্ণিমায় রঙে, রেখায় শিল্প-সমৃদ্ধি ঘটান দেবী

শ্বিনপূর্ণিমায় ঘরে আসবে হৈমন্তিক শস্য। ঘরে আসবেন লক্ষ্মী। তিনি সম্পদ, সৌন্দর্যের সমৃদ্ধি ঘটাতে ঘরে প্রবেশ করবেন, তার একটা প্রমাণ থাকবে না! মানুষ মগজাস্ত্রে শান দিয়ে আবিষ্কার করেছিল এর উপায়। সেই উপায়ই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে শিল্পে। স্টিকার-ফিকার না; চালের গুঁড়ো, খড়িমাটি, চক এমনকী ময়দা – নানা উপাদান দিয়ে শৈল্পিক ভাবধারায় গৃহপ্রবেশের ‘প্রমাণ’ ওরফে পদচিহ্ন রেখে যান দেবী। সৌভাগ্য, ধনসম্পদ আকাঙ্খার আড়ালে কোজাগরী আলোয় রঙে ও রেখায় ঘটে শিল্প-সমৃদ্ধি।

সন্ধেবেলা লক্ষ্মীপুজো। তার অনেক আগেই, সকাল থেকেই শুরু হত তোড়জোড়। লক্ষ্মীপুজো না দক্ষযজ্ঞ তফাৎ বোঝা যেত না। বাড়িতে দেখেছি, হাত মুঠো করে নিচের দিকটা চালগুঁড়ো গোলায় ডুবিয়ে ছাপ দেওয়া হত মাটিতে, তৈরি হত পায়ের পাতা, তারপর হাতের আঙুলের ডগা গোলায় চুবিয়ে পাঁচটা ডট, তৈরি হত পায়ের আঙুল। ব্যাস, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ রেডি! 

এভাবেই বছরের পর বছর মা লক্ষ্মী ঢুঁ দিতেন ঘরে ঘরে। বড়োদের পাশাপাশি বাড়ির ছোটোরাও ভিড়ে যেত লক্ষ্মীর পদচিহ্ন, চৌকাঠে আলপনা দেওয়ার কাছে। বড়োরা ভয় দেখানোর সুরে বলতো, যেমন-তেমন হলে চলবে না, নিষ্ঠা ভরে করলে তবেই প্রসন্ন হয়ে পদচিহ্নে পা মেলাবেন দেবী। ছোটোরা চিন্তায় পড়ে যেতাম কিন্তু সাহস করে পদচিহ্নটা ঠিকঠাক আঁকার চেষ্টা করতাম। ওটাই ছিল আসল মজা। দেবী লক্ষ্মীকে সন্তুষ্ট করার মতলবের মধ্যে সেই আলপনা, পদচিহ্ন আসলে শিশুমনে শৈল্পিক ছাপ ফেলে যেত।মূর্তি নয়, শুরুতে পূজিত হত শুধুমাত্র পদচিহ্নই; ক্রমশ যা আলপনা-শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছে। শিল্প ছুঁয়ে যায় মননকে, মানবিকতাকে। তাই শত অশান্তির শেষে বারবার প্রতিভূ হয়ে ফিরে আসে শান্তি। এই প্রসঙ্গেই বলি, লক্ষ্মী পুজোর দিন সোশাল মিডিয়ায় অনেকেই দেখে থাকবেন, ভাইরাল একটি ছবি। ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, কোনও এক গ্রামের মহিলা তাঁর ক্যানভাসের মতো, মাটির ছড়ানো উঠোনে একমনে আলপনা দিচ্ছেন। শিল্পের সঙ্গে ধর্মের প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ নেই, তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই ছবি। সমস্ত বর্ণ, ধর্ম, বয়সের মানুষকে ছুঁয়ে যেতে পেরেছে ছবিটির প্রাকৃতিক শৈল্পিক সৌন্দর্য।

ভাইরাল-ছবিটি

বাংলার আর্বান জীবন পেরিয়ে আরও ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে বহু জেলার বহু গ্রামেই যেকোনও ছোটোখাটো পুজো, আচারনুষ্ঠানে আলপনা দেওয়ার রীতি এখনও অব্যাহত। লক্ষ্মী পুজো যে নিছক লোকাচার নয়, এর গুরুত্বপূর্ণ শৈল্পিক বৈশিষ্ট রয়েছে, তা নিয়ে অবন ঠাকুর বাংলার ব্রত-তে বিস্তারিত লিখেছিলেন।

তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুজোয় সকাল থেকে বাড়ির মেয়েরা ঘরদোর আলপনায় বিচিত্র পদ্ম, লতাপাতা, এঁকে সাজিয়ে তুলতো। লক্ষ্মীর পদচিহ্ন, লক্ষ্মীপেঁচা এবং ধানছড়া হল আলপনার প্রধান অঙ্গ। বড়ো ঘর, যেখানে ধানচাল, জিনিসপত্র রাখা হয়, সেই ঘরের মাঝের খুঁটির—মধুম খামের গোড়ায় নানা আলপনা-দেওয়া লক্ষ্মীর চৌকি পাতা ছিল রীতি। আলপনায় নানা অলংকার, এবং চৌকিতে, লক্ষ্মীর সম্পূর্ণ মূর্তি নয়, মুকুট আর দুখানি পা কিংবা পদ্মের উপরে পা—এমনি নানারকম আঁকা হতো। খুঁটির গায়ে লক্ষীনারায়ণ আর লক্ষীপেঁচা বা পদ্ম, ধানছড়া, কলমিলতা, দোপাটিলতা, লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকা থাকতো। চৌকির উপরে ডালা ও বেড় বা বিঁড়ে। বিঁড়ের মধ্যে শুয়োরের দাঁত ও সিঁদুরের কৌট এবং তার উপরে নানারকম ফল ইত্যাদিতে পূর্ণ রচনার পাতিল বা ভাঁড় রাখা হতো। লক্ষ্মীর সরার পিঠে লাল নীল সবুজ হলদে কালো এই কয় রঙে লক্ষ্মীনারায়ণ, লক্ষ্মীপেঁচা ইত্যাদির আলপনা। লক্ষ্মীর কাপড়ে সবুজ রঙ, গায়ে হলুদবর্ণ, কালির পরিরেখ, এবং অধর ও পায়ের এবং করতলের জন্য লাল; নীলবর্ণ পটভূমিকার কারুকার্যে দেওয়া হতো।

আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ/ বাতাসে ঘুঘুর ডাক—অশত্থে ঘুঘুর ডাক—হৃদয়ে ঘুঘু যে ডাকে—নরম ঘুঘুর ডাক আজ/ তুমি যে রয়েছ কাছে—ঘাসে যে তোমার ছায়া—তোমার হাতের ছায়া—তোমার শাড়ির ছায়া ঘাসে/ আকাশে চাঁদের আলো—উঠোনে চাঁদের আলো—নীলাভ চাঁদের আলো—এমন চাঁদের আলো আজ

শিল্পের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্কও নিবিড়, সন্ধ্যাকাশে ওমন প্রমাণ সাইজের চাঁদ দেখে কার না কাব্য করতে ইচ্ছে করবে! তাই প্রতিবারই মনে হয় কোজাগরী আলোয় দেবী জাগ্রত হয়ে ওঠে জীবনানন্দের উল্লিখিত কবিতাটির মতোই।

 

Developed by DXDasia