
এবছর সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতা দেন লরেন্স কার্ডিশ
২৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে টানা এক সপ্তাহ ধরে চললো মৃণাল সেন ও দেব আনন্দের শতবর্ষ উদযাপন। তবে, সত্যজিৎ রায়কে নিয়েও চর্চার কোনো খামতি থাকলো না কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে। এবছর চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সত্যজিৎ রায় স্মারক বক্তৃতা’ থেকে জানা গেল, কীভাবে লরেন্স কার্ডিশ প্রভাবিত হয়েছিলেন সত্যজিতের সিনেমা-দর্শন থেকে। বক্তা ছিলেন স্বয়ং লরেন্স কার্ডিশ। সিনেমাজগতে তাঁর পরিচিতি ‘ল্যারি’ নামে। এবছর KIFF-এর ‘ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন : ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস’ বিভাগের অন্যতম জুরিও ছিলেন তিনি।

মিউজিয়াম অফ মর্ডান আর্ট (MoMa) নিউ ইয়র্কের প্রাক্তন কিউরেটর ছিলেন লরেন্স কার্ডিশ। কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন মোমা-র সঙ্গে। বর্তমানে আমেরিকার জর্জিয়ার কলম্বিয়া কাউন্টিতে বার্ষিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনে সারা পৃথিবী ঘুরে ছবি খোঁজেন তিনি। হাজারের উপর ছবির প্রদর্শনী কিউরেট করেছেন। সত্যজিতের পথের পাঁচালির সঙ্গেও তাঁর সম্বন্ধ দীর্ঘদিনের। মানবতার এমন অনবদ্য দলিল দেখে বিশ্বসিনেমা সম্পর্কে তাঁর ধারণা বদলে যায়। তাঁর কথায়, “সত্যজিৎ রায় শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, বিংশ শতাব্দীর একজন মহান শিল্পী, যিনি ৮০০০ মাইল দূরে থেকেও আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।” গত শনিবার, ১০ ডিসেম্বর শিশির মঞ্চে সে কথা অকপটেই জানান তিনি।

এদিন উপস্থিত ছিলেন উৎসব কমিটির সদস্য পরিচালক অরিন্দম শীল, নন্দনের মুখ্য কার্য নির্বাহী আধিকারিক শর্মিষ্ঠা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও চিদানন্দ দাশগুপ্তের বন্ধু হিসেবে লরেন্সকে স্বাগত জানাতে এসেছিলেন প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক, অভিনেত্রী অপর্ণা সেন।
তাঁর কথায়, “সত্যজিৎ রায় শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, বিংশ শতাব্দীর একজন মহান শিল্পী, যিনি ৮০০০ মাইল দূরে থেকেও আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন।”

আমেরিকা মহাদেশের এক বিপুল আর্থিক মন্দার সময়েই পথ চলা শুরু হয় মোমা (মিউজিয়াম অব মর্ডান আর্ট)-র। সেটা ১৯২৯ সাল। পথের পাঁচালির সঙ্গে মোমা-র যোগাযোগ এর কিছু পরে। এডোয়ার্ড স্টেকেন নামের এক মোমা-র চিত্রগ্রাহকের প্রদর্শনীতে স্থিরচিত্র ছিল সুব্রত মিত্রের তোলা। সেসব ছবি দেখে এতটাই বিস্মিত হন তাঁরা, যে প্রদর্শনীর নাম বদলে রাখা হয় ‘দ্য স্টোরি অফ অপু এন্ড দুর্গা’। এরপর, বিখ্যাত পরিচালক জন হিউস্ট্যানের সূত্রেই জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের বোড়াল নামের এক গ্রামে শুটিং হচ্ছে অন্যধারার এক চলচ্চিত্রের। সেই চলচ্চিত্র অর্থাৎ পথের পাঁচালি তখন পরিচিত ছিল ‘অপু দুর্গার কাহিনি’ নামে। কানে দেখানোর আগেই সে ছবি সাবটাইটেল ছাড়াই দেখানো হয় মোমা-তে। ১৯৮১ সালে সত্যজিতের সমস্ত কাজকে ঘিরে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন তিনি। এই উপলক্ষেই উদ্ধার হয় সত্যজিতের সিকিম তথ্যচিত্রটি। সিকিম রাজপরিবারের সূত্রেই ছবিটি পান তিনি। তবে সত্যজিতের আরেক বন্ধু চিদানন্দ দাশগুপ্ত’র সঙ্গে মোমা-র সম্পর্ক ছিল অনেকদিনের। সেই সুবাদেই পিকু ও ভারতীয় ছবি সম্বন্ধে নিয়মিত খোঁজ পেয়েছেন তাঁরা। এই সুবাদেই তাঁর কথায় উঠে এলো চলচ্চিত্রের টেকনিশিয়ান শ্রীধর বাপট ও পরিচালক-নৃত্যশিল্পী শার্লি ক্লার্কর কথা। উদয় শংকরের বন্ধু শার্লি নৃত্যকে ঘিরে ছবিও নির্মান করেছেন অনেকগুলি। তাঁর স্মৃতিচারণে উঠে আসে সত্যজিতের সঙ্গী, বন্ধু তথা শিল্প নির্দেশক বংশী চন্দ্রগুপ্তের কথাও। লরেন্স আরও বলেন, মার্কিন দেশে যেমন লস এঞ্জেলেস আর নিউ ইয়র্ক, তেমনই ভারতে মুম্বই আর কলকাতার ফারাক। মার্কিন দেশের বর্তমান সিনেমা চর্চা নিয়েও কথা বলেন তিনি। জানান, সিনেমার সঙ্গে অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়েও নানাবিধ লেখা প্রকাশিত হচ্ছে এবং সিনেমাকে বহু স্তরীয় মাধ্যমের সাপেক্ষেও বিচার করা হচ্ছে। আরও জানান, বর্তমানে নতুনদের কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ছে।
