সিনেমা বানানোর জন্য মায়ানমার থেকে বিতাড়িত বো থেট ঠোন-এর গল্প শুনল কলকাতা

KIFF 2023 : নয়জন পরিচালক মিলে তৈরি করেছেন Broken Dreams

মায়ানমারের পরিচালক বো থেট ঠোন (ছবি: নিজস্ব)

মায়ানমারের তরুণ পরিচালক বো থেট ঠোন (Bo Thet Htun) কলকাতায় এসেছেন নিজের সিনেমা নিয়ে। ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-এর নেটপ্যাক প্রতিযোগিতা বিভাগে (29th Kolkata International Film Festival NETPAC Award) দেখানো হল সেই ছবি। কলকাতার দর্শক এই তরুণ পরিচালককে অভ্যর্থনা জানালেন সিনেমা-শেষে স্ট্যান্ডিং-ওভেশনের মধ্যে দিয়ে। রবীন্দ্র সদনে ছিল সেদিন উপচে পড়া ভিড়। হাজার শব্দের করতালিতে মুখরিত প্রেক্ষাগৃহে সিনেমার শুরুতে মঞ্চে প্রবেশ করলেন মায়ানমারের ঐতিহ্যবাহী শার্ট আর লুঙ্গি পরিহিত বো থেট ঠোন। তিনি আদতে একজন তথ্যচিত্র নির্মাতা। তাঁর তথ্যচিত্রের প্রধান বিষয় মানবাধিকার (Human Rights)। মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থান-এর (Military Coup) বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণের সময় মিলিটারিরা হন্যে হয়ে তাঁকে খুঁজতে থাকে। সেই পরিস্থিতিতে দেশ ছেড়ে বো পালিয়ে যান থাইল্যান্ডে। থাইল্যান্ডে চলে যাবার ইয়াঙ্গুনে তাঁর বাড়িতে অভিযান চালায় মিলিটারিরা।

বো-এর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কয়েকদিন আগেই। ৬ ডিসেম্বর বুধবার নন্দন ১-এ অস্ট্রেলিয়ার একটি ছবি দেখতে গিয়ে বাংলাদেশের পরিচালক সৈয়দা নিগার বানু-র সূত্রে। তারপর বো-এর মুখেই শুনছিলাম তাঁর ভয়াবহ জীবন-অভিজ্ঞতার কথা। নিজের জীবন বাজি রেখে মনপ্রাণ ঢেলেছেন সিনেমায়। দেশছাড়া (মায়ানমার) হয়ে বর্তমানে থাইল্যান্ডের অস্থায়ী বাসিন্দা। নিজের বিষয়ে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশ করলেও পরিবারের বিষয়ে কিছুই বলতে নারাজ তিনি। কারণ সকলেই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। আটজন পরিচালক মিলে তৈরি করেছেন নয়টি ভিন্ন ছোটোছবি। সেসব জুড়েই তৈরি হয়েছে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি Broken Dreams Stories From The Myanmar Coup। মায়ানমারের বাঁচামরা নিয়ে কথা বলেছে এই ছবির প্রত্যেকটি গল্প। আশ্চর্যের বিষয়, এই ছবিতে বো-এর অংশটির আশি ভাগ শুট হয়েছে ফোন ক্যামেরায় (Xiao Mi 11 Pro)। গত ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে ভয়ানক সেই জীবনের গল্প দেখল কলকাতা। তার আগেই বঙ্গদর্শন.কম-এর মুখোমুখি হয়ে মায়ানমারের পরিচালক (Myanmar Filmmaker) বো থেট ঠোনের এই বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার রচিত হল। যা ভাবাবে, যা বিপ্লবের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। নিজের দেশ ও দেশ থেকে বিতাড়িত নিয়ে অকপট বো থেট ঠোন।

মোবাইল ক্যামেরায় শ্যুট করছেন পরিচালক

_________
প্রশ্ন: ২৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান সিলেক্ট NETPAC প্রতিযোগিতায় ছিল আপনার ছবি, বলা ভালো আপনাদের ছবি। এই প্রথমবার কলকাতায় এসে কেমন লাগছে? উৎসবের পরিবেশ, এখানকার মানুষজন সবমিলিয়ে কেমন উপভোগ করলেন কয়েকটা দিন?

উত্তর: KIFF-এর মতো ভারতের অন্যতম বৃহৎ চলচ্চিত্র উৎসবের অংশ হতে পেরে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। আমাদের ছবি ‘ব্রোকেন ড্রিমস’ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দর্শক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। তাঁদের দেখাতে পেরে সত্যিই খুব খুশি। এবছর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের থিম এবং নানাবিধ কার্যক্রম দেখে আমি আনন্দে আত্মহারা। কলকাতার দর্শক সিনেমাকে সম্মান করেন।

প্রশ্ন: ‘ব্রোকেন ড্রিমস’ (Broken Dreams Stories From The Myanmar Coup) আপনারা আটজন পরিচালক মিলে তৈরি করেছেন আলাদা আলাদা গল্পের মাধ্যমে। আপনিও তাঁদের একজন। ছবির মূল গল্প সংক্ষেপে জানতে চাইছি।

উত্তর: ‘ব্রোকেন ড্রিমস’ হল একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের সংকলন চলচ্চিত্র, যেটা ৯টা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি নিয়ে নির্মিত। এই ছবি মায়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রভাবকে চিত্রিত করে। প্রিয়জন হারানো থেকে নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করার মধ্যে ব্যক্তি মানুষ প্রতিনিয়ত যে অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, সেসব কথাই আমরা বলার বা দেখানোর চেষ্টা করেছি। প্রতিটি গল্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে। আমরা আটজন পরিচালক চেয়েছিলাম মায়ানমারের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে একটা সিনেমা বানাব। খুবই অনুকূল পরিস্থিতির মধ্যে আমরা শুটিং করেছি। ব্রোকেন ড্রিমস চলচ্চিত্র সমালোচকদের নজর কেড়েছে। এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃতও হয়েছে। এই ছবি আমাদের পূর্বসূরীদের কথা বলে, গণ অভ্যুত্থানের মানবিক চেতনার দিকে ফিরে তাকানোর কথা বলে। এই ছবির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, ছবির বেশিরভাগ পরিচালক, অভিনেতা কলাকুশলীই বিপ্লবে অংশগ্রহণ করার জন্য মায়ানমার থেকে নির্বাসিত।

মানুষের নির্বাসন, শোকসভা এবং প্লেন বোম্বিং-এর সত্যিকারের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে ছবিতে। আমি শরণার্থীদের সঙ্গে থেকেছি, একসঙ্গে ঘুমিয়েছি, খেয়েছি… সেকারণেই আমার মনে হয় ওঁদের জীবন আর আবেগকে এত ভালোভাবে ধরতে পেরেছি।

ব্রোকেন ড্রিমস-এর পোস্টার (বাঁদিকে), নিজের দেশের পোশাক পরিহিত পরিচালক (ডানদিকে) 

প্রশ্ন: মায়ানমারের যে সংকট বা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করার কথা আপনি বললেন, তা বিশদে ব্যাখ্যা করবেন? পরিস্থিতি যদি সত্যিই ভয়ানক হয়, কীভাবে আপনারা একত্রে কাজ করছেন?

উত্তর: ২০২১ সালের নভেম্বরে আমি দেশ ছেড়েছি। সামরিক জুন্টা বিরোধী বিপ্লবীদের সংশয়, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব অকপটে তুলে ধরেছি। একটা তথ্য দিই আপনাকে, রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব বলছে মায়ানমারে কুড়ি লক্ষেরও বেশি বাসিন্দা দেশছাড়া। জুন্টার সেনাবাহিনীর অনেকেই ক্রমশ বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। ওরাও একনায়কতন্ত্র নিতে পারছে না। ব্রোকেন ড্রিমস মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের দুই বছর পর মানুষের তীব্র যন্ত্রণাকে উপস্থাপন করেছে। এই ছবি আসলে সামরিক অভ্যুত্থানের পরে কিছু মানুষের ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন। আপনাকে কিছু পয়েন্ট আকারে বলি, বুঝতে সুবিধা হবে – এই ছবিটার মধ্যে রয়েছে নিপীড়ন এবং বিপ্লবের চক্র, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের প্রভাব (PTSD), নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যক্তি মানুষের সংগ্রাম, আঘাতের পর আঘাত – ও তার পরবর্তী অভিজ্ঞতা, সামরিক নিপীড়নের ফলে পরিবারের মধ্যে ভাঙন, একনায়কের নৃশংসতা, উদ্বাস্তুদের দুর্দশা – এই সমস্ত ইস্যুগুলিই আমাদের ছবিতে উঠে এসেছে। গণতন্ত্রের জন্য আমরা লড়াই করছি। আমাদের সেই লড়াইয়ের মাধ্যম সিনেমা। আমি চাই, ছবিটি আরও অনেক মানুষ দেখুন।

প্রশ্ন: মায়ানমারের চলচ্চিত্র শিল্প এই মুহূর্তে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? সেখানে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকাররা কী ভাবছেন এখন?

উত্তর: ২০২১ সালের পর মায়ানমার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একদল রয়েছেন যারা স্বাধীনভাবে সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রকাশ করে। যেমন সাহসিকতার সঙ্গে অভিনয় করছেন, তেমনি সামাজিক দিক থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁরা রয়েছেন। আরেক দল সামরিক একনায়কত্বের অধীনে প্রচারমূলক চলচ্চিত্র তৈরি করছেন, এবং কয়েকজন রয়েছেন যারা কঠোর সেন্সরশিপ ব্যবস্থার অধীনে কাজ করেন মুখ বন্ধ করে। এখন বার্মিজ সামরিক বাহিনী-র নাগালের বাইরে একটি মুক্ত এবং নিরবচ্ছিন্ন চলচ্চিত্র শিল্প শুরু করার জন্য, মূলধারার চলচ্চিত্র নির্মাতারা এবং ইন্ডি চলচ্চিত্র নির্মাতারা কিছুক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করছেন। ‘ব্রোকেন ড্রিমস’ সেই প্রজেক্টগুলির মধ্যে একটি, যেখানে অনেক বিখ্যাত/প্রতিষ্ঠিত মায়ানমারের শিল্পী অভিনয় করেছেন, যাঁরা এই বিপ্লবকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন।

ডান্সিং ইন দ্য ডার্ক ছবির দৃশ্য

রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাব বলছে মায়ানমারে কুড়ি লক্ষেরও বেশি বাসিন্দা দেশছাড়া। জুন্টার সেনাবাহিনীর অনেকেই ক্রমশ বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। ওরাও একনায়কতন্ত্র নিতে পারছে না। ব্রোকেন ড্রিমস মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের দুই বছর পর মানুষের তীব্র যন্ত্রণাকে উপস্থাপন করেছে।

প্রশ্ন: এই ছবিতে আপনি যে অংশটি পরিচালনা করেছেন তার নাম ‘ডান্সিং ইন দ্য ডার্ক’ (Dancing In The Dark)। আইডিপি ক্যাম্প-এর (Internally Displaced Person) দুই প্রকৃত মহিলা শরণার্থী আপনার ছবিতে অভিনয় করেছেন। তাঁদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? কেনই বা আপনি উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করলেন?

উত্তর: আমার স্ত্রী-র সঙ্গে একটি তথ্যচিত্রের শুটিং করতে শরণার্থী শিবিরে ছিলাম বেশ কয়েকদিন। তখনই যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এক মহিলার গল্প শুনেছিলাম তাঁরই মুখে। এই বিষয়বস্তুটাই আসলে ‘ডান্সিং ইন দ্য ডার্ক’ বানানোর অনুপ্রেরণা। প্রায় চার মাস আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। একজন পেশাদার অভিনেতাকে দিয়ে রাস্তায় হাঁটানো বা অভিনয় করানো মোটেই সুবিধাজনক ছিল না। তাই সত্যিকারের উদ্বাস্তুদের নিয়েই কাজটা করলাম। এটা আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয় যে শরণার্থী শিবিরের বহু মানুষ সিনেমা-প্রেমী ছিলেন। মানুষের নির্বাসন, শোকসভা এবং প্লেন বোম্বিং-এর সত্যিকারের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে ছবিতে। আমি ওঁদের সঙ্গে থেকেছি, একসঙ্গে ঘুমিয়েছি, খেয়েছি… সেকারণেই আমার মনে হয় ওঁদের জীবন আর আবেগকে এত ভালোভাবে ধরতে পেরেছি।

বঙ্গদর্শন.কম-এর প্রতিনিধি সুমন সাধু-র সঙ্গে বো থেট ঠোন, কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে

প্রশ্ন: বিশ্ব-চলচ্চিত্রে আপনার প্রিয় পরিচালক কে? বাংলা বা ভারতীয় ছবি দেখার সুযোগ হয়েছে কখনও?

উত্তর: প্রিয় পরিচালক নির্বাচন করা আমার জন্য খুবই কঠিন। এরকম বহু পরিচালক আছেন, যাঁদের কাজ ভালো লাগে, বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। আর প্রচুর ভারতীয় ছবি আমি দেখেছি। তবে কোনো বাংলা ছবি আমার দেখা হয়নি, কারণ সম্প্রতি বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে জেনেছি। আমি জানি যে, আপনাদের গর্ব করার মতো সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, তপন সিনহা আছেন। আরও অনেকেই আছেন, যাঁরা ভারতীয় চলচ্চিত্রকে বিশ্বের মানচিত্রে নিয়ে গিয়েছেন।
_________
ব্রোকেন ড্রিমস-এর দ্বিতীয় প্রদর্শন আছে ১২ ডিসেম্বর বিকেল ৫টায়, নজরুল তীর্থ ২-এ।

Developed by DXDasia