বইমেলা উদ্বোধন করলেন সাহিত্যিক অমর মিত্র। মূল মঞ্চের নাম অমিয়ভূষণ মজুমদার মঞ্চ…
বয়েসের হিসেবে কাটোয়া বইমেলা আমার সমবয়সী। মাননীয় সাংসদ শ্রী হরমোহন সিংহ এবং কাটোয়ার বিশিষ্ট সাহিত্যপ্রেমী শ্রী শশাঙ্কশেখর চট্টোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে কাটোয়া বইমেলা যাত্রা শুরু হয় ১৯৯১ সালে। ভাগীরথী তীরস্থ কাটোয়া মহকুমার সাহিত্যের ইতিহাস সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই সমৃদ্ধ, তাই এখানে বই-সংস্কৃতিকে আলাদা চোখে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মহুকুমা বইমেলা হিসাবে কাটোয়া, আশেপাশের মহুকুমাগুলোর চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয়, কারণ এর স্থানমাহাত্ম্য এবং অবস্থান। পূর্ব বর্ধমান-নদিয়া-মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমের সংযোগস্থলে কাটোয়া শহর। মেলা কমিটির উদ্যোগে এই মেলা আয়োজন করা কাটোয়া কেডিআই স্কুল প্রাঙ্গণে। কিন্তু অতীতে তা কখনো-সখনো বেসিক ট্রেনিং কলেজ মাঠে হয়েছে। ২৭ বছরে পা দেওয়া এই বইমেলা প্রথমেই এমন সমৃদ্ধি লাভ করেনি, অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের ভিতর দিয়ে তাকে যেতে হয়েছে। তাই প্রথম দিকের মেলায় প্রকাশকদের বেশ নিরাশ হতে হয়েছে, কারণ সাহিত্যপ্রেমী মানুষরা তখন বইমেলার সংস্কৃতির সঙ্গে রপ্ত হতে পারেননি। কাটোয়ার বইপ্রেমীদের কাছ থেকে পরে পরে সেই সাহচর্য পেয়ে বর্তমান কলকাতার নামী দামি প্রকাশকেরা কাটোয়া বইমেলাতে ভিড় করে আসেন, যেমন আনন্দ, দে’জ, সাহিত্যম, এবং মুশায়েরা, রেডিক্যাল ইম্প্রেশন, তপতী, অভিযান, করুণা প্রভৃতি। তার পাশাপাশি থাকে গীতা প্রেস, নিখিল ভারতীয় বিবেকানন্দ যুব মহামণ্ডলের মতো আধ্যাত্বিক প্রকাশনীর স্টল। স্থানীয় ইতিহাস এবং কাটোয়া সংস্কৃতির ওপর দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা স্টলগুলি যেমন অজয়, দীপ্রকলমের মতো স্টলও দেখা যায়।

বর্তমান বইমেলার সম্পাদক তুষার পণ্ডিতের নেতৃত্বে প্রায় এক মাস ধরে এই বইমেলার বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয় বইমেলার সমৃদ্ধিকে তুলে ধরতে। এই কয়েকদিন কেডি’র মাঠকে গড়ে তোলা হয় এক মায়াকানন হিসেবে। এই বইমেলার অন্য বইমেলার মতোই প্লাস্টিক বর্জিত পরিবেশবান্ধব একটি বইমেলা। এখানে উল্লেখ্য যে, মেলা কমিটির উদ্যোগে কাটোয়া বইমেলা অছি পরিষদ গঠিত হয়েছে, এখান থেকে কাটোয়ার বিশিষ্টজনদের উল্লেখযোগ্য কিছু বই প্রকাশ করা হয়েছে, যেমন প্রয়াত কবি মহরম আলীর কবিতার বই, সাহিত্যিক মানসী মণ্ডলের গদ্যের বই, প্রয়াত কবি দীপঙ্কর ঘোষের উল্লেখযোগ্য একটি বই গহনার নৌকা এবং কবি অসীম বিশ্বাসের কবিতার বই। শুধু তাই নয়, অছি পরিষদের উদ্যোগে কাটোয়া বইমেলা কমিটি একটি লাইব্রেরি ও আর্কাইভ তৈরি করেছে, তাতে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং উল্লেখযোগ্য বইগুলিকে সংরক্ষণ করা হয়। এখানে বইমেলা কমিটির অফিসের নাম ভাষা সদন, যেটি কাটোয়া কেডিআই স্কুলের কাছেই তৈরি করা হয়েছে।

২০১৮ সালের বইমেলা উদ্বোধন করেন সাহিত্যিক অমর মিত্র। এবার বইমেলার মূল মঞ্চকে উৎসর্গ করা হয়েছে সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদারের নামে। এবছর বইমেলার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল চারটি লিটল ম্যাগাজিন তাঁদের বইয়ের সম্ভার নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন কাটোয়া বইমেলায়। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিকদের বই নিয়ে তবুও প্রয়াস, বিনয় মজুমদার অপ্রকাশিত ডাইরি গ্রন্থ এবং তরুণ কবিদের বইয়ের সম্ভার নিয়ে ইতিকথা প্রকাশন এবং স্বপন ঠাকুরের লেখা বাংলার লোক ইতিহাস, কবি গৌতম সাহা সম্পাদনায় প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগের কবিদের নিয়ে কাটোয়ার কবিতা সংকলন ও তরুণ কবিদের কবিতার বই নিয়ে বীরুৎজাতীয় প্রকাশন, শান্তিনিকেতনের ও কাটোয়ার তরুণ প্রকাশকের উদ্যোগে ২৬ জন কবির এক ফর্মা কবিতার বইয়ের সিরিজ নিয়ে আলোপৃথিবী প্রকাশন।
আশা করি কাটোয়া বইমেলা আরও অনেক দূর এগিয়ে যাবে। বছরের পর বছর তার সংস্কৃতির ধারা বজায় রাখবে। কাটোয়ার বইপ্রেমী মানুষের সামনে আবার নতুন করে বইমেলাকে তুলে ধরবে, এই কামনা করি।
ছবি ঋণ- কাটোয়া ভাষাসদন