
উত্তরপাড়াকে মাঝ রাত অবধি জাগিয়ে রাখে এই ‘কাকুর চায়ের দোকান’
উত্তরপাড়া আদপে হুগলির বিছানায় শোয়া এক ঘুমন্ত শিশু, যার মা একদিকে গঙ্গা আর একদিকে রেললাইনের পাশবালিশ ঠেকনো দিয়ে রান্নাঘরে জল ফোটাতে গিয়ে ফিরে আসেননি আর। সেই থেকে এভাবেই শুয়ে রয়েছে এ শহর। নয় নয় করে কম বয়স হলো না তারও। আসা যাক কাজের কথায়, উত্তরপাড়া যাঁরা চেনেন অল্পবিস্তর, তাঁরা কাঁঠালবাগান বাজারের নামও শুনেছেন। এ বাজারে মানুষের আলো নেভে না সচরাচর। সকালের সব্জিওলা বাড়ি ফিরতে ফিরতে এসে যায় বিকেলের বাজার; বিকেলের বাজার গোটাতে গোটাতে ভোরের সব্জির লরি ঢুকে যায়। চলতে থাকে রিলে রেস। আর এই আংশিক মফস্সলকে রাত সাড়ে এগারোটা অবধি জোয়ান রাখে ‘কাকুর চায়ের দোকান’। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে যেখানে উনুন নেভে না রাত গাঢ় হওয়া অবধি। সাল ১৯৫৪-৫৫ হবে খুব জোর; পূর্ববঙ্গ থেকে এসে নবদ্বীপে কিছুদিন কাটিয়ে উত্তরপাড়ায় ঘাঁটি গাড়লেন মণীন্দ্রচন্দ্র দে। প্রথমে টেলারিং-এ কিছুদিন কাজ করে খুলে বসলেন তাঁর চায়ের দোকান। আশেপাশেই বাস তাঁর দাদা ভাইপোদের, আর তাদের ডাকেই মণীন্দ্রবাবুর বেনামী দোকান খুব তাড়াতাড়ি হয়ে ওঠে কাকুর চায়ের দোকান। শোনা যায় উত্তরপাড়ায় সে যুগে ভীষণ দাপট ছিনতাইবাজ-দের। তল্লাটে বেকারির গাড়ি ঢুকলে লুট হয়ে যায় মালপত্র-টাকাপয়সা সব। কিন্তু চায়ের সঙ্গে বিস্কুটের যে অটুট বন্ধন তা ভাঙতে রাজি নন মণীন্দ্রবাবু। বেকারির ছেলেটিকে ডেকে তিনি জানান ‘তুমি নিয়ে এসো ভ্যান, কে লুট করে দেখে নেব আমি!’। এরকম একরোখা এক মানুষ তাঁর সাদা গেঞ্জি আর নীল লুঙ্গির পোশাকে মৃদুভাষ্যে সেবা চালিয়ে গেলেন উত্তরপাড়ার। ধীরে ধীরে ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠল কাকুর চায়ের দোকান। সারাদিনে ৬টাকা রোজকার হচ্ছে তখন, তাই দোকানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা রইল না আর।

এরপর সময় বদলেছে, দিনকাল, বদলেছে মানুষ, প্রজন্ম বদলে গেছে চায়ের চুমুকে। ভাঁড়ের পর ভাঁড় মাটির পর মাটি মিশে গেছে সময়ের অতলে। তিন ছেলে এসে দায়িত্ব নিয়েছেন দোকানের। বড় ভাই কেশব দে (ওরফে বাবুদা) ও মেজভাই কমলেশ দে ১৫ দিনের পালায় চালিয়ে যাচ্ছেন দোকান। ছোটোভাই তাপস দে দুই দাদাকেই দিনের বাধা সময়ে ফুরসৎ দিতে উপস্থিত হন রোজ। পারিবারিক ব্যবসা এখন উত্তরাধিকারের দায়িত্বও বটে। ভোর ৫:৩০ থেকে ১১টা অবধি চলে এই দোকান। মূলত চা-কফি ছাড়া, বিভিন্ন বিস্কুট এবং বিড়ি সিগারেট পাওয়া যায় এখানে, সঙ্গে পাওয়া যায় দারুণ এক জমায়েত; বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। শুধু এটুকুই নয়, শহরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পোস্টার পরে বাইরের দেওয়ালে। একঘণ্টা কান পেতে বসলে দিনের সমস্ত খবর পাওয়া যায় সংবাদপত্র ছাড়াই।
আরও পড়ুন
ডুব দে রে মন রামপ্রসাদের শরবতে
কাকুর চায়ের দোকান কেবল সামান্য চায়ের দোকান নয়। দিনে ৭ কিলোগ্রাম চা-পাতা লাগে এখানে। লাগে ৪ বস্তা চিনি, প্রায় ৬০ লিটার দুধ আসে দোকানে প্রতিদিন। মণীন্দ্রবাবুর আশীর্বাদ, তাঁর আন্তরিকতা ছাড়াও রয়ে গেছে শুরুর সময়ের একটি দুধ মাপার চামচ। ছেলেরা প্রথম ক্যাশবাক্সটিও বহুদিন চালিয়েছেন যত্নে, তবে বদলে ফেলতে হয়েছে ভেঙে আসায়। এছাড়া যাঁদের কথা না বললেই নয়, সারাদিন এই কাঁঠালবাগান যাঁরা নখদর্পনে রেখেছেন, চরকি দিয়ে ঘুরে চা খাওয়াচ্ছেন গোটা বাজারকে আর মনে রেখে ফিরিয়ে আনছেন কোথায় কটা গ্লাস, তাঁরা হলেন চিমা, গোপাল, রতন ও গুপি। এঁরা কেউ বর্ধমান কেউ মেদিনীপুরের ছেলে। বাড়িঘর ছেড়ে দিনের পর দিন জড়িয়ে রয়েছে ৬৩ বছরের এই ঐতিহ্যে।

দিনে ৬ টাকার রোজকারে দাঁড়ানো এই দোকানে এখন বড়ো এক ভাঁড় লাল চা-এর দাম ছ’টাকা। সময়ের এই দীর্ঘ স্রোতকে ৪০০ শব্দে বাঁধা না গেলেও কয়েক চুমুকে এর স্বাদ নেওয়া যেতে পারে যে-কোনও দিন। উত্তরপাড়া স্টেশন থেকে এক মিনিটের দূরত্বে এই প্রতিষ্ঠানে এলে আপনি অনুভব করতে পারবেন, সমাজ বলে কিছু এখনও আছে, অভিধানের বাইরেও আছে।
