ভাইফোঁটার ছড়ায় কীভাবে জড়িয়ে গেলেন মৃত্যুদেবতা যম আর তার বোন যমুনা?

মৃত্যুদেবতার অনুষঙ্গ কীভাবে এল ভাইয়ের দীর্ঘজীবন চাওয়ার উৎসবে

যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা
আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা

সেই কবে থেকে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনার ব্রতে জড়িয়ে যাচ্ছেন মৃত্যুদেবতা যম। যে যম আর মৃত্যু সমার্থক, সেই যম আর তার বোন যমুনার কথাই বোনা হয়ে যাচ্ছে “ভাই যেন মরে না”-র আকুতির আগে। এমন বিরোধাভাস কেন? কীভাবে বাংলার ভাইফোঁটার ছড়ায় জড়িয়ে গেলেন যম আর যমুনা? নিছকই পৌরাণিক অনুষঙ্গ হিসেবে? সেক্ষেত্রে আরও কত ভাই-বোনের কথাই তো ছিল পুরাণে। বরং যম আর যমুনার সম্পর্ক ঠিক ‘আদর্শ’ ভাই-বোনের সম্পর্ক নয়। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে যমী ডাকছেন যমকে তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য। সেই বহু আলোচিত দ্বিরালাপের পরেও ভাইফোঁটার ছড়ায় যম-যমুনার কথা চিরস্থায়ী হয়ে গেল। বিস্ময়করই বটে। 

যমের অস্তিত্বও যেমন বেশ বিস্ময়ের। সূর্যের অপর নাম বিবস্বান। যম সূর্যপুত্র, তাই তিনি বৈবস্বত। যমের মা সংজ্ঞা। যমের স্পর্শে সংজ্ঞা চিরতরে লুপ্ত হয়, সূর্যের আলো মুছে যায় চোখ থেকে। অথচ, সেই সূর্য আর সংজ্ঞাই যমের পিতা-মাতা। পিতা-মাতার অস্তিত্বকেই যেন চ্যালেঞ্জ জানায় যমের অস্তিত্ব। ঋগ্বেদ অনুযায়ী, যমই প্রথম জন্মেছিলেন এবং প্রথম মৃত্যুবরণও করেছিলেন। জন্ম-মৃত্যুর অধীন বলে যমের দেবত্ব গোড়া থেকেই সংশয়ের। তিনি অজ বা শাশ্বত নন। ঋগ্বেদ অনুযায়ী তাঁর পরিচয় ‘মর্ত্য’। প্রথম মৃত হওয়ায় তিনি মৃত্যুপুরীর রাজা। কিন্তু দেবতা নন। আবার নেহাত মানুষও নন।

‘যম’-কে নিয়ে তাই অস্বস্তি কাটে না সহজে। যম কি প্রশ্নাতীতভাবেই পুরুষ? ঋগ্বেদ অনুযায়ী, নিজেরই ভিতর থেকে যম মানববংশ সৃষ্টি করেছিলেন। জীববিশ্বের সাধারণ নিয়ম বেদ-পুরাণে অচল। কিন্তু সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা আবার যুক্তিহীনও হতে চায় না। সূর্য আর সংজ্ঞার মিলনে যমের সঙ্গেই জন্ম যমীর। যম আর যমী মিলে কি অর্ধনারীশ্বর? তাই কি যম পারলেন নিজের ভিতর থেকেই মানববংশ সৃষ্টি করতে? আমাদের হয়তো মনে পড়ে যাবে, ‘যমজ’ শব্দটির মূলেও যম। আর, যমজ শব্দটি উভলিঙ্গবাচক।

এরপর, বৈদিক যম আর যমী ক্রমে পরিণত হলেন পুরাণের যম আর যমুনায়। এই যমই ‘কাল’, কালের যমজ ‘কালিন্দী’। যম নীলাভ শ্যাম, যমুনার রঙও কালচে নীল। কালিন্দীর জলও কালো। যম মৃত্যুপুরীর রাজা, প্রথাগত দেবতা না হয়েও মৃত্যুর দেবতা আর যমুনা প্রেমপ্রবাহিণী। প্রেম আর মৃত্যু বারবার সমাপতিত আমিত্বের বিনাশে। মৃত্যুতে ‘আমি’-র অবসান। আর প্রেমের চিরকালীন চাওয়া–  ‘আরও প্রেমে আরও প্রেমে মোর আমি ডুবে যাক নেমে’। যম আর যমুনার সম্পর্কের অনুষঙ্গে স্থায়ী এই মৃত্যু আর প্রেম। 

অথচ ভাইফোঁটায় মৃত্যু নয়, ভাইয়ের দীর্ঘজীবনের আকাঙ্ক্ষা, প্রেম নয় নিষ্কাম স্নেহ। এবং সেই অনুষঙ্গেও চলে আসেন যম আর যমুনা। ভাতৃ দ্বিতীয়ায় বাংলার ঘরে ঘরে বোনেরা ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেয় তাদের স্মরণ করে। যে সম্পর্কের ভাষ্যে লেপ্টে মৃত্যু আর প্রেম, ভাইবোনের চেনা সম্পর্কের বাইরে বিপজ্জনক সব বাঁক যেখানে উপস্থিত, সেই যম-যমুনা বাংলার ভাইবোনের চেনা ঘরোয়া বয়ানে ঢুকে পড়েন দিব্বি। নাকি, তাদের একরকম জোর করেই জড়িয়ে নেওয়া হয়! আপাত বিপজ্জনক আখ্যানকে এভাবেই ভরে নেওয়া হয় সামাজিক নিয়মের চৌহদ্দিতে! যম-যমুনার বৈদিক আখ্যানকে ভুলিয়ে দিয়ে এরপর ক্রমশ স্থায়ী হয়ে উঠতে থাকে ভাইবোনের চেনা, নিটোল রূপকল্প। ‘কাঁটা যেন নড়ে না’-র আবেদনকে তাই কখনো-কখনো প্রতীকি নির্দেশ বলেও মনে হয়।

অবশ্য এইসবই নিপাতনে সিদ্ধ কল্পনা মাত্র। কেন ও কীভাবে যম-যমুনা ভাইফোঁটার সঙ্গে মিলে গেলেন তারও পৌরাণিক ব্যাখ্যা দেখতে পাই। বলরামের সঙ্গে বিয়ে হল যমুনার। বিয়ের তিথি কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া। বিয়ের আগে যমের কপালে ফোঁটা দিয়ে তার মঙ্গলকামনা করেছিলেন যমুনা। সেই সুতো ধরেই নাকি ভাইফোঁটার ছড়ায় আজো তারা ফিরে ফিরে আসছেন। এই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করা-না করায় কিচ্ছু যায় আসে না ব্রতাচার কিংবা পুরাণের। যেভাবে যম-যমীর সম্পর্কের বৈদিক আখ্যানও সামান্য ব্যাঘাত ঘটায় না ভাইফোঁটার সময়। যম-যমুনা তাদের বৈদিক ও পৌরাণিক ইতিহাসের যাবতীয় রহস্যকে সরিয়ে রেখেই এসে বসেন ব্রতের ছড়ায়। মৃত্যুর দেবতা যমের দীর্ঘজীবন চেয়ে তাকে ফোঁটা দেন যমুনা। যমের অস্তিত্বের সঙ্গে লেপ্টে বৈপরীত্য, ভাইফোঁটার পাব্বনেও তার ব্যতিক্রম নেই। 

বিশেষ ঋণ: তপোব্রত ঘোষ, রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি রূপকল্প: বিষয় মৃত্যু, ধ্রুবপদ, বার্ষিক সংকলন ৮, ২০০৪। 

Developed by DXDasia