
কোনো কাঁটাতার বা সীমারেখা তাঁর খ্যাতির পথে বাধা হতে পারেনি
‘শাহেনশাহ-ই-গজল’ (গজল সম্রাট), মেহেদি হাসান খান হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন, হাত-পা অসাড়। তাঁর কাছ থেকে সরে যাচ্ছে পৃথিবীর যাবতীয় স্মৃতি। তাঁর সুমধুর কণ্ঠও তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল তাঁর শরীরের মতো। একটা বড়সড় সেরিব্রাল স্ট্রোকে প্যারালাইজড উপমহাদেশের অন্যতম সেরা এই কন্ঠশিল্পী। থমথমে হাসপাতাল করিডোরের একঘেয়েমি ভেদ করে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হয় কেবিনের বাইরে। একজন লম্বা, অত্যন্ত সুন্দরী ভদ্রমহিলা রাজকীয়ভাবে কেবিনের দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁর আত্মবিশ্বাসী চলনভঙ্গি মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছিল সকলের। একটা মোহময় বাতাবরণ তৈরি হয় তাঁকে ঘিরে। তিনি কেবিনে প্রবেশ করেন এবং ব্যারিটোন আওয়াজ নিয়ে মেহেদি হাসানের সামনে এসে দাঁড়ান। হাসান তাঁর দিকে তাকান এবং সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে যায়। তিনি তত্ক্ষণাৎ চিনতে পেরেছিলেন কে এসেছেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এবং সেদিনের সেই সাক্ষাতে তাঁর উজ্জ্বল-হাসিখুশি চোখ যেটুকু বলার ছিল বলে দিয়েছিল।
মেহেদি হাসানের সঙ্গে হাসপাতালে দেখা করতে যাওয়া সেই অপরূপা ভদ্রমহিলাই এই উপমহাদেশের প্রথম সুপারস্টার- ঝর্ণা বসাক ওরফে 'শবনম'। ছোটবেলাতেই ১৮০ টি উর্দু এবং বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। ঝর্ণার জন্ম বাংলাদেশে। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানে চলে যান তাঁরা। সেখানেই তিনি ঝর্ণা থেকে শবনম হন এবং ৩১ বছর ধরে পাকিস্তান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে রাজত্ব করেন! দেবিকা রানি, কানন দেবী, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া চৌধুরী… ভারতীয় সিনেমার স্বর্ণযুগের বহু ‘সুপারস্টার’ অভিনেত্রীদের নিয়ে আমরা বিশেষ বিশেষ দিনে মাতামাতি করি, অথচ অদ্ভুতভাবে আমরা ঝর্ণা বসাককে কখনও মনে করি না, অথচ একসময় তিনি পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ, দুই দেশের চলচ্চিত্রজগত একাই শাসন করেছেন। কোনো কাঁটাতার বা সীমারেখা তাঁর খ্যাতির পথে বাধা হতে পারেনি।
১৯৪২ সালের ১৭ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তানের এক জমিদার বংশে ঝর্ণার জন্ম। তাঁর নিজের পরিবার তো নয়ই, এমনকি তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের মধ্যে কেউই কখনও অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁর বাবা নানু বসাক ছিলেন একজন ক্রীড়াবিদ এবং জনপ্রিয় ফুটবল রেফারি। তিনি গানবাজনা ভালোবাসতেন এবং তাঁর মেয়েদের সুরসাধনায় উত্সাহিত করেছিলেন তিনিই। চমৎকার কণ্ঠস্বর ছিল ঝর্ণার দিদির। সেসময়ের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীদের কাছ থেকে তালিম নিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে, ঝর্ণা ছোট থেকেই দুষ্টুমিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন এবং তাঁর মা প্রায়ই কেঁদে ভাসাতেন এই অবাধ্য, দুষ্টু মেয়ের কোথাও কোনো গতি হবে না সেই ভেবে।
‘টমবয়’ হলেও ছোট থেকেই প্রবল ছন্দ অনুভূতি ছিল ঝর্ণার। যেকারণে নাচে তালিম নিতে শুরু করেন তিনি। এক টানা কয়েক ঘন্টা ধরে চলত অনুশীলন। নাচের প্রতি আগ্রহ লক্ষ্য করে তাঁর বাবা 'বুলবুল ললিতকলা একাডেমি'তে ভর্তি করান তাঁকে। তার পাশাপাশি পড়াশোনা চলতে থাকে স্থানীয় বাংলা বাজার স্কুল-এ। ঝর্ণার বয়স যখন প্রায় ১৫, তখন তাঁর বাবার এক বন্ধু তাঁকে আবিষ্কার করেন এবং ‘এদেশ তোমার আমার’ নামে একটা ছবিতে একটা গানের দৃশ্যে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন।
পরের ছবি ‘রাজধানীর বুকে’। এই ছবিটা আরো বেশি কঠিন ছিল তাঁর কাছে। এই ছবিতেও একটি গানের দৃশ্যে অভিনয় তবে, তাঁর অভিনীত গানটি ছিল একজন বারাঙ্গনাকে নিয়ে। ব্যাপারটা নিয়ে তাঁর বাবা আপত্তি জানালেও পরিচালক ছিলেন নাছোড়বান্দা। শুধু তাই নয়, নৃত্য পরিচালক তাঁকে যা যা করতে বলেছিলেন ঝর্ণা ঠিক তাই তাই করেছিলেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পরে দর্শকরা কিশোরী ঝর্ণার মধ্যে উদীয়মান নায়িকাকে আবিষ্কার করেন। ভাগ্যের চাকা ঘুরতে থাকে। পরবর্তী ছবি ‘হারানো দিন’-এ মুখ্যভূমিকায় অভিনয়ের অফার আসে। ছবিটি সুপারহিট হয় সেইসঙ্গে ‘স্টার’ হয়ে ওঠেন ঝর্ণা বসাক।
১৯৫০-এর শেষের দিকে ঝর্ণার সঙ্গে দেখা হয় তাঁর ভাইয়ের বন্ধু রবিন ঘোষের, যিনি তখন ঢাকার 'রেডিও পাকিস্তান'-এ কর্মরত এবং সংগীত পরিচালক হিসাবে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার চেষ্টা করছেন। দুই তরুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিল্পীর মধ্যে রোম্যান্টিক সম্পর্কের সূত্রপাত হয়। ১৯৬৪-র ২৪ ডিসেম্বর ঝর্ণা বাসাক এবং রবিন ঘোষ গাঁটছড়া বাঁধেন। এরপর শুরু হয় নতুন অধ্যায়।
পরিচালক এহতেশাম তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উর্দু চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রের জন্য মনোনীত করেন ঝর্ণাকে। এহতেশাম বড়সড় বাজার ধরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, ঝর্ণা উর্দু বলতে পারতেন না। অতঃপর তাঁকে বাংলায় লেখা একটি উর্দু চিত্রনাট্য দেওয়া হয়। সেকারণে সিনেমার মহড়া ছয় মাস অবধি স্থগিতও রাখা হয়। এরপরে শুটিং শুরু হয় কক্সবাজারে।
১৯৬৮ সালে পাকিস্তানে চলে যান ঝর্ণা। ললিউড (লাহোর কেন্দ্রিক পাকিস্তানি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি)-এ অভিষেকের জন্যই তিনি প্রথম ‘শবনম’ নামটি ব্যবহার করেন। অনেকটা ভারতীয় চলচ্চিত্রে ইউসুফের ‘দিলীপ কুমার’ হয়ে ওঠার মতোই। নাম ব্যবহার করলেও তিনি কখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। রমনের সঙ্গে ‘চন্দা’ ছবিটির সিলভারজুবিলি উদযাপিত হয়। বাস্তবসম্মত অভিনয়, সুরম্য ব্যাকগ্রাউন্ড এবং দুর্দান্ত সংগীতের জন্য ছবিটি নান্দনিকভাবে দর্শকদের মন কেড়ে নেয়। পরের ছবি, ‘তালাশ’ আবার রহমানের সঙ্গে বক্স-অফিসে খুব ভালো ফল করে। রবিন ঘোষ দুর্দান্ত সংগীত পরিচালনা করেন ছবিটিতে। ‘তালাশ’-এর গোল্ডেনজুবিলি উদযাপিত হয়।
শুরুর দিকে, পাকিস্তানে তাঁর সহকর্মীদের কঠোর মনোভাবের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। ললিউডের সব নায়িকা তাঁকে মেনে নিতে পারেননি। এমনকি তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মন্তব্য করেছিলেন ঝর্ণার মতো ‘রোগা’ অভিনেত্রীর সিনেমায় কোনো ভবিষৎ নেই। একজন বাঙালি হিসেবে তিনি তাঁর সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠেছিলেন।
তাঁর ‘দোস্তি’ ছবিটিও খুব জনপ্রিয় হয়। ‘আখরি স্টেশন’-এ ঝর্ণা ওরফে শবনম একজন মানসিক ভারসাম্যহীনের ভূমিকায় অভিনয় করে সাড়া ফেলে দেন। এভাবেই একটার পর একটা কাজ করে যেতে থাকেন অভিনেত্রী। এমন একটা সময় আসে যখন তাঁকে দিনে কমপক্ষে চারটি সিনেমার শুটিং একসঙ্গে করতে হত। পাকিস্তানে বছরে তাঁর ১৮ থেকে ১৯ টা ছবি মুক্তি পেত।
কয়েক ডজন সুপার-হিট ছবিতে অভিনয় করার পরে, ১৯৭০-এর গোড়ার দিকে পাকিস্তানের এক নম্বর অভিনেত্রীর শিরোপা পান ঝর্ণা। ১৯৮০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত, অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্তের পরেও সেই জায়গাটি ধরে রেখেছিলেন তিনি। তিনিই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র চলচ্চিত্র অভিনেত্রী যিনি প্রায় তিন দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এবং সাফল্যের সঙ্গে মুখ্যভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ঝর্ণা পাকিস্তান এবং সেখানকার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে চলে যান। পুরোপুরি অবসর নিয়ে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে চলে আসেন। ঢাকায় ফিরে দু’বছর বিরতি দেওয়ার পরে ঝর্ণা কাজী হায়াত পরিচালিত 'আম্মাজান' ছবিতে অভিনয় করেন। ছবিটি ১৯৯৯ সালে মুক্তি পায়। ছবিটি সুপারহিট হয় এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম সফল সিনেমা হিসেবে জায়গা করে নেয়।
২০১২ সালে, ঝর্ণা তার স্বামীর সঙ্গে ১৩ বছর পর পাকিস্তান সফরে যান, সেখানে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক পাকিস্তানি শীর্ষস্থানীয় সদস্যগণ, বিশেষত পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির অংশগ্রহণে তাঁদের হাতে আজীবন কৃতিত্বের (লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট) পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
ললিউডে ‘ডায়মন্ড জুবিলি’ উদযাপন করা ২৩ টি উর্দু সিনেমার নায়িকা ছিলেন ঝর্ণা ওরফে শবনম। সেরা অভিনেত্রীর জন্য ১৩ বার নিগার পুরষ্কার জিতে নেন, যে রেকর্ড আজ অবধি কেউ ভাঙতে পারেনি।
২০১৩ সালে, টেলিভিশন সিরিজ 'মোহিনী ম্যানশন কি সিন্ডারলায়েন'-এর মাধ্যমে পাকিস্তানি বিনোদন জগতে ফিরবেন বলে ঘোষণা করেছিলেন ঝর্ণা। সৈয়দ নূর পরিচালিত আইনা-র সিক্যুয়েল আইনা ২-তে অভিনয় করতেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। করাচি সাহিত্য উৎসবে যোগ দিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তান তার দ্বিতীয় বাড়ি এবং পাকিস্তানি চলচ্চিত্রকে পুনরুদ্ধারে যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন তিনি। ঢাকাতেই ঝর্ণা বসাকের আজীবন সঙ্গী রবিন ঘোষ ২০১৬ সালে শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত জটিলতায় মারা যান। একমাত্র পুত্র রনি ঘোষ জীবিত। বর্তমানে ঢাকায় শান্ত, অবসর জীবন যাপন করছেন এই উপমহাদেশের প্রথম 'সুপারস্টার' ঝর্ণা বসাক।
